১৭ আগস্ট ২০২৬, ২১:৩৩

শ্রেণিকক্ষ থেকে বিশ্বমঞ্চ: আধুনিক শিক্ষা সংস্কারে বদলে যাবে বাংলাদেশ

মাহবুব নাহিদ   © টিডিসি সম্পাদিত

ইতিহাস সাক্ষী, কোনো জাতি যদি বিশ্বমঞ্চে বিজয়ের পতাকা ওড়াতে চায়, তবে তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো যুগোপযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর ও বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা। মুখস্থবিদ্যার অন্ধকার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যেসব রাষ্ট্র তাদের তরুণ সমাজকে উদ্ভাবন, দক্ষতা ও বৈশ্বিক যোগাযোগে পারদর্শী করে তুলতে পেরেছে, তারাই আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাই নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে রাষ্ট্রীয় দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল ও কাঠামোগত রূপান্তর। গতানুগতিকতার শেকল ভেঙে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সামাজিক সুরক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানের সরাসরি সেতু তৈরি করে দেশের শিক্ষাঙ্গনে বয়ে আনা হয়েছে এক নতুন দিগন্ত।

শিক্ষায় যুগোপযোগী রূপান্তরের প্রথম শর্ত হলো শিক্ষকের মর্যাদা ও মানসিক স্বস্তি সুনিশ্চিত করা। দীর্ঘ চার বছর ধরে বঞ্চনার শিকার অবসরপ্রাপ্ত এমপিও শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের লোপাট হওয়া অর্থ ফেরত দিতে বর্তমান সরকার তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ২,০০০ কোটি টাকার তহবিল ছাড় করে শিক্ষকদের হাতে তাঁদের প্রাপ্য অর্থ তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, যা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিতকে পুনর্বার শ্রদ্ধার আসনে বসিয়েছে। এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ও শিক্ষা খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চূড়ান্তকরণের কাজ শেষ পর্যায়ে আনা হয়েছে, যা কর্মক্ষেত্রে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে।

শিক্ষাকে টেকসই ও মানবিক করতে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রয়োজনে ১ লক্ষ টাকা করে সরাসরি সরকারি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়নে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পাঠ্যপুস্তকে নতুন চারটি বিষয় বা বই যুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে চতুর্থ শ্রেণিতে দুটি ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি নতুন আধুনিক পাঠ্যবই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি শিশুরা যুগোপযোগী জ্ঞানার্জনের সুযোগ পাবে।

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক ভীতি দূর করা ও ঝরে পড়া রোধে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে গ্রহণ করা হয়েছে চমৎকার সব সামাজিক উদ্যোগ। ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস ও মানসম্মত স্কুল ব্যাগ পৌঁছে দেওয়ার কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়নে দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারি অর্থায়নে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা চালুর পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগ সুনিশ্চিত করা হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের শারীরিক গঠন ও দেশীয় ক্রীড়া সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনে প্রবর্তন করা হয় 'প্রাথমিক গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট'। দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ২২ লক্ষ শিক্ষার্থী (১১ লক্ষ ছাত্র ও ১১ লক্ষ ছাত্রী) এতে বিপুল উৎসাহে অংশ নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছে।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম: সম্ভাবনা, সংকট ও আগামীর রাষ্ট্রচিন্তা

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি) শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিনির্ভর মেধা বিকাশে দেশজুড়ে আয়োজিত হয়েছে 'ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং কম্পিটিশন'। শিক্ষার্থীরা যেন নতুন নতুন উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শন করতে পারে, সেজন্য বিদ্যালয় পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতা বিশেষ উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। নারী শিক্ষার প্রসারে সরকার নিয়েছে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ—মেয়েদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা সম্পূর্ণ সুনিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের সকল প্রকার টিউশন ফি মওকুফ করা হয়েছে। ঝরে পড়া রোধ ও পুষ্টি মান নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চালু করা হচ্ছে ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার ও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। যেসব বিদেশগামী শিক্ষার্থীর তৃতীয় ভাষায় পারদর্শিতা রয়েছে, তাঁদের ব্যাংকিং জটিলতামুক্ত সুবিধা দিতে ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিশেষ ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদানের নিয়ম চালু করা হয়েছে। তরুণদের চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ স্টার্ট-আপ ফান্ড গঠন করা হয়েছে, যেখান থেকে ৪% সুদে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জামানতহীন ঋণ মিলছে।

সর্বস্তরে সুশাসন ও সাম্যের নীতি প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাঙ্গন থেকে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা হয়েছে। সরকারের এই ১৮০ দিনের গতিশীল ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে খুব অল্প সময়েও একটি ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের মেধাভিত্তিক কাঠামোয় রূপান্তর করা সম্ভব। শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হওয়া এই রূপান্তরই আগামী দিনে বিশ্বমঞ্চে এক আত্মনির্ভরশীল ও মেধাভিত্তিক নতুন বাংলাদেশের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক