১১ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৫২

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে ম্যানেজিং কমিটি বনাম এনটিআরসিএ

এম এ মতিন  © টিডিসি সম্পাদিত

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষা সচিব জনাব এম এ খালেকের সভাপতিত্বে গত ৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন উপস্থিত ছিলেন। সভায় এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, এখন থেকে এনটিআরসিএ শিক্ষকদের শুধুমাত্র নিবন্ধন প্রদান করবেন– নিয়োগ করবেন না। নিয়োগের দায়িত্ব পালন করবেন স্থানীয় কমিটি। তবে প্রস্তাবিত কমিটি কাদের নিয়ে গঠিত হবে সে সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। 

এই খবর সারা দেশে চাউর হওয়া ও সভার কার্যবিবরণী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ার পর চতুর্দিকে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বলা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক, বৈষম্যমূলক, মেধার প্রতি অসম্মানজনক, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভ্রান্ত– তাই সমন্বিতভাবে অগ্রহণযোগ্য। এর প্রতিবাদে পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই শুধু নয় পথসভা, গণমিছিল ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং হচ্ছে। আসলে বিষয়টি কী? একটু খতিয়ে দেখা যাক। 

২০০৫ সালে এনটিআরসিএ গঠনের পূর্ব পর্যন্ত স্থানীয় কমিটি কর্তৃক এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষক নিয়োগ করা হতো। ঐ কমিটিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য সভাপতি থাকতেন। ঐ কমিটির বিরুদ্ধে মেধার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে দলীয় লোক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিকট থেকে উৎকোচ নেয়ার অভিযোগও রয়েছে প্রচুর। এ অবস্থায় শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় স্বচ্ছভাবে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের জন্যে তদানীন্তন বিএনপি সরকার ২০০৫ সালে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) গঠন করে। এই কর্তৃপক্ষ দৃশ্যত অনেক শক্তিশালী। এতে নিম্নোল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ অন্তর্ভুক্ত- 
• চেয়ারম্যান (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব);
• সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ);
• সদস্য (মূল্যায়ন/পরীক্ষা প্রত্যয়ন);
• সদস্য (শিক্ষা তত্ত্ব/শিক্ষা মান),
• মহাপরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর;
• মহাপরিচালক, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর;
• চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড;
• শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি;
• অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি;
• জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক মনোনীত সরকারি কলেজের একজন অধ্যক্ষ;
• ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক মনোনীত শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক।

এনটিআরসিএ শিক্ষক নিয়োগদানের লক্ষ্যে নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ করে ও উত্তীর্ণ প্রার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহে নিয়োগ এবং পদায়নের সুপারিশ করে থাকে। নিবন্ধন পরীক্ষা তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে, এক ঘণ্টার ১০০ নম্বরের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে, প্রথম ধাপে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের অনলাইনে পূরণ করা আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি ও সাথে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদসহ অন্যান্য কাগজপত্র এনটিআরসিএতে জমা দেওয়ার পর সনদপত্র যাচাই-বাছাইপূর্বক যোগ্য প্রার্থীদের লিখিত পরীক্ষা হয়। তৃতীয় ধাপে, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক বা ভাইভা পরীক্ষা হয়। ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এনটিআরসিএ স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ করেছে। কিন্তু এনটিআরসিএর বিরুদ্ধে গুরুতর কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হতে শোনা যায়নি। তাহলে এখন এমন কী ঘটেছে যে একটি সংবিধিবদ্ধ শক্তিশালী কর্তৃপক্ষকে বাদ দিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ স্থানীয় কমিটির নিকট এমন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করতে হবে? 

মনে রাখা দরকার, শিক্ষাখাত দেশে সর্ববৃহৎ খাত। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবকসহ যে বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োজিত তার সংখ্যা ৪ কোটিরও বেশি (প্রাথমিক ২.১০ কোটি, মাধ্যমিক ১.২০ কোটি, উচ্চমাধ্যমিক ৩০–৪০ লাখ, ডিগ্রি (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়) ২০ – ২৫ লাখ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫.৮ লাখ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৪.৫ লাখ, কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ১০.০ লখ) [ব্যানবেইস রিপোর্ট ২০২৩] ।  

স্বাধীনতা অর্জনের পর বিগত ৫০ বছরে আমরা শিক্ষাখাতকে ঈপ্সিত পর্যায়ে উন্নীত করতে সক্ষম হই নাই। যদিও বিভিন্ন সরকার শিক্ষাখাত উন্নয়নের লক্ষে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। এ সকল কার্যক্রমের মধ্যে এ যাবৎ দেশে অন্তত ৯টি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে প্রতিটি সরকার কিছু না কিছু কাজ করেছে। কিন্তু শিক্ষা সংস্কারের কাজ কতটা সফল হয়েছে? গুণগত শিক্ষা প্রদানে আমরা কতটা সফলতা অর্জন করতে পেরেছি? শিক্ষায় অনুদান প্রদানকারী প্রথম সারির উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে পরিচিত বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফ–এর মূল্যায়নে দেখা যায় বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে খারাপ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৫ম শ্রেণি পাশ একজন ছাত্র বিজ্ঞান, গণিত ও ভাষা বিষয়ে যা জানে– শ্রীলঙ্কা কিংবা ভারতের ৩য় শ্রেণির ছাত্র ছাত্রীরা তার চেয়ে ভালো জানে। 

আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের যে পরাকাষ্ঠা তা আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেখেই অনুমান করতে পারি যেখানে শতকরা মাত্র ১০ জন পাশ করে ও ৯০ জন ফেল করে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আজ অবধি বৈশ্বিক ৫০০ উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নাম লেখাতে পারেনি। এই বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না আসতে পারাকে উচ্চশিক্ষার বিরাট ঘাটতি বলে অনেকে মনে করেন। যদিও দক্ষিণ এশীয় দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় উল্লিখিত বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিং তালিকায় প্রতি বছর স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়। 

উপর্যুক্ত অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিএনপি দীর্ঘ সতের বছর পর ভূমিধস বিজয় অর্জন করে সদ্য ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে বি এন পি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে অভিজ্ঞ ড. এহছানুল হক মিলন শিক্ষামন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি গত ৯ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন। 

মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী ও সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করব। দেশের জনসংখ্যাগত সুবিধা তথা ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ড এবং ভবিষ্যতের লংজিভিটি ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সুস্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। বিএনপির শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্য হবে জীবনমুখী, কর্মমুখী ও উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে (বর্তমান ব্যয় জিডিপি’র মাত্র ১.৮৩%)। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালু করা, সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা এবং শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষায় সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। 

পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা, পর্যায়ক্রমে মিড-ডে মিল চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা, সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল এডু-আইডি চালুর বিষয়েও সভায় আলোচনা করা হয়। এছাড়া মাদ্রাসাশিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে আইটি, বিজ্ঞান ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। শিক্ষাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে এনে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও বাস্তব দক্ষতা উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংস্কার গ্রহণ করা হবে’ (দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, ১০ মার্চ ২০২৬)।

শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষাসংস্কার বিষয়ক এই বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সকলকে যারপরনাই অনুপ্রাণিত করেছে। শিক্ষা নিয়ে হতাশ ব্যক্তিদের মনে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে। কিন্তু এরই মধ্যে আর একটি সংবাদ সমভাবে সকলকে হতাশ ব্যথিত করেছে। সেটি হলো স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় এনটিআরসিএ’র পরিবর্তে স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব অর্পণ করা। উপরে উল্লেখিত শিক্ষামন্ত্রীর ঐতিহাসিক ঘোষণার পর এই সিদ্ধান্ত গোটা জাতিকে যারপরনাই হতাশ করেছে। সরকারের উচিত হবে, অনতিবিলম্বে এর ব্যাখ্যা প্রদান করা এবং পূর্ববৎ এনটিআরসিএ’র হাতে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব বহাল রাখা। 

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্কুল প্রায় ১৮ হাজার, স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রায় দেড় হাজার, কলেজ ৩ হাজার ৩৪১টি, মাদ্রাসা (দাখিল-কামিল পর্যায়) ৯ হাজার ২৫৯টি এবং কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৩৯৫টি। এ সকল প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হয় ম্যানেজিং কমিটি অথবা গভর্নিং বডির মাধ্যমে। ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪’ অনুযায়ী পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এই ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি গঠনের নির্দেশনা জারি করা হয়। 

সরকারের উচিত হবে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা এই ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডি কে শক্তিশালী করে তাদের মাধ্যমে নিবিড় পরিবীক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তাদেরকে শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত কোনো কাজের সাথে সম্পৃক্ত না করা। নিচে শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির গুরুত্ব ও কাজের একটি বিবরণ তুলে ধরা হলোঃ  
ম্যানেজিং কমিটি/গভর্নিং বডির কাজ হবেঃ  
- স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করা
- স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার বাজেট ও ব্যয় তদারকি করা
- স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও মানোন্নয়ন নজরদারি করা
- শিক্ষক এবং স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা
- অভিভাবক এবং স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার মধ্যে সেতু তৈরি করা

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণ হয় শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মাধ্যমে নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত থাকে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, নীতিনিষ্ঠতা এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষকেরা পাঠদান করেন, কিন্তু সেই শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে মূলত পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। শিক্ষকেরা কতটা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে কাজ করবেন, শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে পড়াশোনা করবে, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কতটা স্বচ্ছ থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশে নির্ভর করে পরিচালনা কমিটির ওপর।

বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি পরিচালনা কমিটির হাতে না থাকলেও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, পদোন্নতি–সংক্রান্ত সুপারিশ, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ, পুরস্কার প্রদান কিংবা প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখনো পরিচালনা কমিটির অধীনেই রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়ভারও মূলত এই কমিটির ওপর বর্তায়। ফলে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের যোগ্যতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

বর্তমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। শিক্ষা এখন আর শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, সৃজনশীলতা বিকাশ, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাচর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠন। নতুন কারিকুলাম, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য শুধু নীতিনির্ধারণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে সচেতন ও দক্ষ নেতৃত্ব।

সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিনির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু সেই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির ওপর। ফলে এই কমিটির নেতৃত্ব কতটা সৎ, শিক্ষিত, সচেতন ও দূরদর্শী, তা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেজন্যে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিও সরকারকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। কেননা সভাপতি ও সদস্যবৃন্দ যথেষ্ট যোগ্য না হলে তারা -  
১। শিক্ষাব্যবস্থার কারিগরি দিকগুলো যথাযথ অনুধাবনে সক্ষম হবেন না। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বোঝার জন্য একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত ভিত্তি প্রয়োজন। 
২। শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বর্তমানে শিক্ষা খাতে নানা ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের সফল বাস্তবায়নের জন্য পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্ব যদি এসব বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না হয়, তবে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা বা তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৩। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অযৌক্তিকতা বা আবেগপ্রবণতা দেখা দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনেক সিদ্ধান্ত সূক্ষ্ম ও বিশ্লেষণনির্ভর। পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা না থাকলে অনেক সময় সিদ্ধান্তগুলো যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্থানীয় প্রভাব বা আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়, এবং
৪। প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার ঝুঁকি বাড়ে। পরিচালনা কমিটি প্রতিষ্ঠানের অর্থব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করে। এক্ষেত্রে অনেকেই স্বেচ্ছাসেবী না হয়ে স্বেচ্ছাচারী ও স্বার্থবাদী হয়ে ওঠে। তাঁরা লাভজনক মনে করেই কমিটিতে থাকার জন্য মরিয়া হন! সৎ, দক্ষ, সুশিক্ষিত ও সচেতন নেতৃত্ব না থাকলে এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন সুযোগ আছে বলেই কমিটির পদ নেওয়ার এত প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাব বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়। তাঁরা অনেকেই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে থাকেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকলে এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায় এবং শিক্ষার পরিবেশ চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। এমন অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যেই রয়েছে।

মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তিরা নেতৃত্বে থাকেন, তখন শিক্ষকসমাজ অনেক সময় অস্বস্তি বোধ করেন এবং নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করেন।

অন্যদিকে পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে সৎ, শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিরা থাকলে সাধারণত একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়। তাঁরা শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকেন এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষিত নেতৃত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও তুলনামূলক সহজ হয়। আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে সচেতন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর সুশৃঙ্খল করতে পারে। ফলে শিক্ষকেরা পেশাগত মর্যাদা অনুভব করেন এবং শিক্ষার্থীরাও একটি স্বাস্থ্যকর শিক্ষা পরিবেশ পায়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া এবং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়া একই বিষয় নয়। প্রথমটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়, দ্বিতীয়টি মূলত প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে একটি প্রজন্মের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপর। তাই এ ধরনের দায়িত্বে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি সেই নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

তাই পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড বজায় রাখা কেবল প্রশাসনিক শর্ত নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আর সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি দুর্বল হয়, তবে শক্ত ভিত্তির ওপর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের সততা, ভদ্রতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, দূরদর্শিতা এবং উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যাবশ্যক।

আমাদের সমাজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটাই প্রধানতম উদ্দেশ্য থাকা উচিত আর তা হলো - জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। এজন্য প্রয়োজন যথোপযুক্ত ও আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানব সমাজকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রকৃত দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যে প্রতিষ্ঠান হবে সমাজ ও জাতির অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অপসংস্কৃতি, অন্যায্যতা, অনধিকার, অনগ্রসরতার ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে শিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে অত্যুজ্জ্বল প্রভার জ্যোতি বিচ্ছুরণ করা এবং ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড-’ হিসেবে সমাজকে তার প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে জাতিকে উন্নয়নের শিখরে প্রতিষ্ঠিত করার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। আর এই আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চালিকা শক্তিই হচ্ছেন আদর্শ শিক্ষক। আদর্শ শিক্ষকই জাতিকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারেন। আর এই শিক্ষক নিয়োগ যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় তা হলে শিক্ষার ঈপ্সিত মান কখনোই অর্জিত হবে না। সেজন্যে শিক্ষক নিয়োগের যে দায়িত্ব অতীতের বিএনপি সরকার এনটিআরসিএ’র হাতে তুলে দিয়েছিল তাই যেন বর্তমান সরকার বজায় রাখে। এই নিবেদন করি।

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
ই-মেইল: amatin@aub.ac.bd