০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৫৯

ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম শিক্ষা ব্যবস্থাকে পাল্টে দিতে পারে

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান   © টিডিসি ছবি

একদিকে সাগরের বিস্তৃত নীল জলরাশি আর অন্যদিকে সবুজ বনানিতে আচ্ছাদিত পাহাড়ের সারি। প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। প্রাচ্যের রানিখ্যাত চট্টগ্রাম-এর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)।

বাংলাদেশে সাধারণ, কারিগরি ও কৃষি বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্স বিষয়ক কোনো বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেনি। অথচ দেশের কৃষি খাতের বিশাল জায়গা দখল করে আছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সেক্টর। এই সেক্টরের জনবলের বিশাল চাহিদা পূরণে তখন বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়। যুগের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ  চাহিদা মেটাতে তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান উদ্যোগ এ সেক্টরে আশার সঞ্চার করে। 

দক্ষ ও যুগোপযোগী ভেটেরিনারিয়ান তৈরির লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালের ২৮শে নভেম্বর তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ’ নামে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। যুগের চাহিদা পূরণে ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল হাজবেন্ড্রি-কে একীভূত করে স্বতন্ত্র ও সমন্বিত ‘ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন’ ডিগ্রি প্রদানই ছিল এর মূল লক্ষ্য। তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান-সহ কিছু মানুষের নির্মোহ প্রচেষ্টায় ১৯৯৫-১৯৯৬ শিক্ষাবর্ষে পাহাড়তলী আঞ্চলিক মুরগী খামারের একটি একতল ভবনে মাত্র ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান।

শুরুতে এটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে থেকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। পরবর্তীতে কলেজটি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদে রূপান্তরিত হয়।

শিক্ষার গুণগতমান, গবেষণা কার্যক্রম এবং দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তররের দাবি উত্থাপিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি বাস্তবায়নে চট্টগ্রামের শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, পেশাজীবী, খামারী এবং সর্বস্তরের জনগণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেন। আন্দোলন ও গণমাধ্যমে লেখালেখির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

তৎপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলক উন্মোচন করেন। এসময় তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান এবং তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ.ন.ম. এহছানুল হক মিলন উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ৭ই আগস্ট জাতীয় সংসদে আইন পাশের মাধ্যমে সরকার তৎকালীন চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করে। 
    
‘শিক্ষা, গবেষণা ও সেবা’-এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে চারটি অনুষদের অধীনে ২৩টি বিভাগ, একটি রিসার্চ অ্যান্ড ফার্ম বেইসড ক্যাম্পাস, দুটি ইনস্টিটিউট, তিনটি গবেষণাকেন্দ্র এবং একটি গবেষণা তরী রয়েছে।

ইতোপূর্বে দেশের ভেটেরিনারি শিক্ষায় কোন ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম ছিল না। সর্বপ্রথম এক বছরের ইন্টার্নশিপ চালু করা হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন প্রাণী হাসপাতাল, সরকারি- বেসরকারি পোল্ট্রি ও ডেইরি ফার্ম, ফিড মিল, ব্রিডার ও হ্যাচারি ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করে থাকে।

শুধু দেশে নয়, কলেজের প্রথম ব্যাচ থেকেই ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থীরা বিদেশে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পেয়ে আসছে। শুরুতেই ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পায় মাদ্রাজ ভেটেরিনারি কলেজে। এটি তামিলনাডু ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। প্রায় দেড় মাসব্যাপী ইন্টার্নিশিপে আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো ফিডব্যাক পেতে শুরু করে এবং প্রতিবছর যথারীতি এই প্রোগ্রাম চলতে থাকে। 

এরপর কর্তৃপক্ষ ইউরোপ-আমেরিকায় ইন্টার্নিশিপের সুযোগ খুৃঁজতে লাগলো। ইংল্যান্ড (রয়েল ভেটেরিনারি কলেজ), ডেনমার্ক, সুইডেনসহ নানা দেশে বিস্তৃত হলো এই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক। আমেরিকার টাফ্টস ইউনিভার্সিটি সুযোগ দিলো সীমিত শিক্ষার্থীকে এক্সটার্নশিপ করার। একইসাথে শিক্ষকদের জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি। টাফ্টস ইউনিভার্সিটির কিছু শিক্ষার্থীও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলো এক্সটার্নশিপ করতে।

এরপর ইন্টার্নশিপের সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে মালয়েশিয়া থেকে। সেখানে ইন্টার্নশিপ করবে ফিশারিজ অনুষদ এবং ফুড সায়েন্স ও টেকনোলজি অনুষদের শিক্ষার্থীরা।

মালয়েশিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া তেরেঙ্গানু’, ‘ইউনিভার্সিটি অব কেলানতান’, ‘ইউনিভার্সিটি পুত্রা মালয়েশিয়া’, ‘ইউনিভার্সিটি মালায়া’ ইত্যাদি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেটেরিনারি অনুষদ, ফুড সায়েন্স ও টেকনোলজি অনুষদ এবং ফিশারিজ অনুষদের প্রত্যেক ব্যাচের সকল ছাত্রছাত্রীরা ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পেয়ে আসছে। 

এছাড়া থাইল্যান্ডের খনকিন ইউনিভার্সিটি, জাপানের কাগোশিমা ইউনিভার্সিটি, নিগাতা ইউনিভার্সিটিতেও ইন্টার্নিশিপ করার সুযোগ পাওয়া যায়, তবে বর্তমানে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। 

সম্প্রতি বিদেশে ইন্টার্নশিপের সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া থেকে।

পাকিস্তানের লাহোরের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সাইন্সেস (ইউভিএএস)-এর সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে সিভাসুর ১৯ জন ছাত্রছাত্রী প্রায় দেড় মাস উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। চুক্তি অনুযায়ী এটি প্রতিবছরই চলবে। চুক্তির আওতায় উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্ন করতে আসবে। 

‘ইউনিভার্সিটি অব গাদজাহ মাদা’ ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন এবং বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

২০২৫ সালের ৭ই নভেম্বর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির আওতায় প্রতিবছর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেটেরিনারির ১৫ জন শিক্ষার্থী সেখানে ইন্টার্নশিপ করবে আবার তাদের ১০ জন শিক্ষার্থী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্ন করতে আসবে। ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের সময়কাল হবে এক মাসব্যাপী। ভবিষ্যতে বিদেশি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে এমওইউ স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই কর্মসূচিকে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। 

আমি আগেই উল্লেখ করেছি, একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি হাতেকলমে প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ভেটেরিনারি শিক্ষায় সর্বপ্রথম ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি চালু করে এ বিশ্ববিদ্যালয়। এটি বাংলাদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়-যার শতভাগ শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পাচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়ের মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে পাল্টে দিতে পারে। 

জয়েন্ট কোলাবোরেশনস-এর অংশ হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেমন বিদেশে যাচ্ছেন তেমনি বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন। প্রতিষ্ঠলগ্ন থেকে অদ্যাবধি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে গবেষণা কাজ পরিচালনার মাধ্যমে এটি একটি আন্তর্জাতিকমানের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠছে।

লেখক: 
উপাচার্য, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)।