বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম: সম্ভাবনা, সংকট ও আগামীর রাষ্ট্রচিন্তা
বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত বিস্তার ও বৈশ্বিক সংযোগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে; অন্যদিকে সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব, মূল্যবোধের সংকট ও রাজনৈতিক বিভাজনও ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। কারণ একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার তরুণদের চিন্তা, চরিত্র, নেতৃত্ব ও কর্মক্ষমতার মাধ্যমে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আজ তার বিশাল যুবসমাজ। এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি উন্নত, মানবিক ও নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। আর ব্যর্থ হলে এই সম্ভাবনাই একসময় হতাশা, অস্থিরতা ও সামাজিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই জনমিতিক বাস্তবতা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমান বিশ্বে যে দেশগুলো অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়েছে, তারা তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগাতে পেরেছে। বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও সেই সম্ভাবনার ঘাটতি নেই। আজ দেশের অসংখ্য তরুণ তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, গবেষণা, চিকিৎসা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম, সামাজিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিজেদের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখছে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াড, গবেষণা প্রতিযোগিতা, স্টার্টআপ কিংবা প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বাংলাদেশের তরুণদের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আজ বাংলাদেশি তরুণরা দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে সম্মান অর্জন করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজ কি রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ দিকনির্দেশনা ও সুযোগ পাচ্ছে?
বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ এক জটিল দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে তারা ডিজিটাল যুগের সুযোগ পাচ্ছে, অন্যদিকে হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও বসবাস করছে। শিক্ষিত বেকারত্ব বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করলেও তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। কারণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো অনেকাংশে সনদনির্ভর, দক্ষতাভিত্তিক নয়। চাকরির বাজারের চাহিদা এবং শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফলে তরুণরা ডিগ্রি অর্জন করলেও বাস্তব দক্ষতায় পিছিয়ে থাকছে।
এর ফলে তৈরি হচ্ছে হতাশা, মানসিক চাপ এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট। অনেক তরুণ মনে করছে রাষ্ট্র তাদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই হতাশা থেকেই কেউ বিদেশমুখী হচ্ছে, কেউ চরমপন্থী চিন্তায় জড়িয়ে পড়ছে, আবার কেউ সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে। “Brain Drain” বা মেধা পাচার আজ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বাস্তবতা। দেশের মেধাবী তরুণদের একটি অংশ উন্নত জীবন ও গবেষণার সুযোগের জন্য বিদেশে স্থায়ী হচ্ছে। এটি শুধু জনশক্তি হারানো নয়; বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্যও একটি বড় ক্ষতি।
বর্তমান সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তরুণদের চিন্তা ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলছে। প্রযুক্তি যেমন জ্ঞান ও বিশ্বসংযোগের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি অপতথ্য, বিভ্রান্তি, অসহিষ্ণুতা ও কৃত্রিম জনপ্রিয়তার সংস্কৃতিও তৈরি করেছে। আজকের তরুণদের একটি অংশ বাস্তব দক্ষতা উন্নয়নের চেয়ে ভার্চুয়াল পরিচিতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক আবেগ ও বিভাজনমূলক প্রচারণা তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।
তবে এই তরুণ সমাজই আবার দেশের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের শক্তি। বাংলাদেশের ইতিহাসে যত বড় গণআন্দোলন ও জাতীয় সংকট এসেছে, তার প্রতিটি পর্যায়ে তরুণরাই নেতৃত্ব দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক বিভিন্ন সামাজিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। কারণ তারুণ্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা।
কিন্তু সেই শক্তিকে কোন পথে পরিচালিত করা হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যদি তরুণদের শুধু রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা দলীয় বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে তাদের সৃজনশীল শক্তি ধ্বংস হবে। রাষ্ট্রের উচিত তরুণদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলা, কিন্তু অন্ধ বিভাজনের অংশ বানানো নয়। প্রয়োজন জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব, নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মত প্রকাশের স্বাধীন পরিবেশ।
বাংলাদেশের তরুণদের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যবোধের সংকট। প্রতিযোগিতামূলক এই সময়ে অনেক তরুণ দ্রুত সফল হওয়ার প্রবণতায় নৈতিকতা ও মানবিকতার জায়গা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সমাজে যখন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়, তখন তরুণদের মধ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অথচ একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্য শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানবিক, সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।
রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও এই দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার ফলাফলনির্ভর প্রতিযোগিতায় ঠেলে না দিয়ে তাদের মধ্যে নেতৃত্ব, নৈতিকতা, গবেষণা, বিতর্ক, সাহিত্য ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ একজন দক্ষ তরুণ শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়; সে হতে পারে একজন উদ্যোক্তা, গবেষক, নীতিনির্ধারক কিংবা সমাজ পরিবর্তনের কারিগর।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের তরুণদেরও নিজেদের নতুনভাবে প্রস্তুত করতে হবে। শুধু প্রচলিত শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রয়োজন প্রযুক্তি দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা, গবেষণামুখী চিন্তা ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি। যে তরুণ বিশ্বকে বুঝতে শিখবে, সেই তরুণই আগামী বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ আজ তরুণদের হাতে। এই তরুণ প্রজন্ম যদি সঠিক শিক্ষা, সঠিক নেতৃত্ব ও সঠিক মূল্যবোধ পায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, বিশ্বের বুকে একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। কিন্তু যদি তাদের হতাশা, বিভাজন ও অদক্ষতার মধ্যে ফেলে রাখা হয়, তবে সেই সম্ভাবনাই একসময় জাতীয় সংকটে রূপ নেবে।
তাই এখনই সময় তরুণদের শুধুমাত্র ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে নয়, বর্তমান রাষ্ট্রগঠনের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার। কারণ বাংলাদেশের আগামী দিনের অর্থনীতি, গণতন্ত্র, সমাজব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে আজকের তরুণ সমাজ। আর সেই কারণেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত তার তরুণ প্রজন্মের ওপর।
লেখক: চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী, বাংলাদেশ প্রতিনিধি, কমনওয়েলথ স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন
ই-মেইল: ahsannafi71@gmail.com