০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪২

গবেষণা প্রবন্ধ প্রত্যাহারের নেপথ্য কথকতা

ড. মো. আতিয়ার রহমান   © সংগৃহীত

গবেষণাপত্র প্রত্যাহার বা রিট্রাকশন (retraction) হলো বৈজ্ঞানিক রেকর্ড থেকে ত্রুটিপূর্ণ বা অনৈতিক নিবন্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করার একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া। এটি প্রধানত তথ্য জালিয়াতি, চৌর্যবৃত্তি (প্লেজিয়ারিজম) এবং সৎ ভুলের কারণে ঘটে থাকে। এই আত্মশুদ্ধিমূলক ব্যবস্থাটি বৈজ্ঞানিক সত্যতা রক্ষা করতে এবং ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করতে দারুণ ভূমিকা রাখে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মূল ভিত্তি হল সত্যের অনুসন্ধান, যেখানে সততা ও নৈতিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বৈজ্ঞানিক জগতের নৈতিক সংকটকেই ইঙ্গিত করে। ড্যানিয়েল ফ্যানেলি, স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র গবেষক তার ন্যাচারে প্রকাশিত “Set up a ‘self-retraction’ system for honest errors” শিরোনামের নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, ডেটাবেসে নথিভুক্ত প্রথম প্রত্যাহার নোটটি ১৯৬৬ সালে নিউক্লিয়ার আরএনএ সংশ্লেষণের উপর একটি গবেষণাপত্রের লেখকদের দ্বারা লেখা হয়েছিল। সেটি একটি চমৎকার সূচনা ছিল এবং তার পরের বছরগুলোতে প্রত্যাহার অত্যন্ত বিরল ছিল এবং এক-পঞ্চমাংশের কম জার্নালের প্রত্যাহার নীতি ছিল। আজ, সেই অনুপাত অনেকগুণ বেড়েছে এবং বছর বছর প্রত্যাহারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রশ্ন হলো এরকম প্রত্যাহার হচ্ছে কেন? ”রিট্রাকশন ওয়াচে”র বরাতে বিভিন্ন গবেষণাপত্র প্রত্যাহার বিষয়ে সাধারণত যেসব কারনগুলোকে দায়ী করে থাকে:

প্রত্যাহারের প্রধান কারণসমূহ
• সৎ ভুল (honest error): গবেষণাপত্রে সৎ ভুল (honest error) হলো অনিচ্ছাকৃত ভুল যেমন হিসাবের গরমিল, ডেটা বিশ্লেষণে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি বা ল্যাবরেটরির সমস্যা। ড্যানিয়েল ফ্যানেলি তার ২০১৬ সালে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, মোট যত প্রত্যাহার হয়ে থাকে, তার প্রায় ২০ ভাগের কম হলো এরকম সৎ ভুল জনিত প্রত্যাহার।
• তথ্য জালিয়াতি ও কারসাজি (Fabrication and Falsification): গবেষণার ফলাফল বা ডেটা ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা (Fabrication) কিংবা পরীক্ষামূলক উপাত্ত পরিবর্তন বা বাদ দেওয়া (Falsification) এবং বিশ্বজুড়ে প্রত্যাহৃত গবেষণা প্রত্রের প্রায় ৪০ ভাগ থেকে ৪০.৩ ভাগ প্রত্যাহারের কারন এটি। 
• বৌদ্ধিক চুরি বা চৌর্যবৃত্তি (Plagiarism): অন্য কোনো লেখকের লেখা, ছবি, আইডিয়া বা ডেটা যথাযথ উদ্ধৃতি বা অনুমতি ছাড়া নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া। শতকরা ৮-৯ ভাগ গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের কারন হিসাবে এটিকে দায়ী করা হয়। 
• দ্বৈত প্রকাশনা (Duplicate Publication): কোনো রকম পূর্বানুমতি বা তথ্যসূত্র উল্লেখ না করে একই গবেষণা বা ডেটা একাধিক জার্নালে প্রকাশ করা। শতকরা ১৪.২ ভাগ গবেষণাপত্র এ কারনে প্রত্যাহৃত হয়ে থাকে বলে রিট্রাকশন ওয়াচ দাবি করে থাকে। এছাড়াও
• মারাত্মক পদ্ধতিগত বা গণনগত ভুল (Honest Error): গবেষণার কাজে অজান্তেই কোনো বড় টেকনিক্যাল বা হিসাবের ভুল থাকা, যার ফলে মূল ফলাফল সম্পূর্ণ অকার্যকর বা অবিশ্বাসযোগ্য হয়ে পড়ে। 
• পুনরুৎপাদন অযোগ্যতা (Non-reproducibility): অন্য গবেষকরা একই পদ্ধতি অনুসরণ করে লেখার ফলাফল পুনরায় পেতে ব্যর্থ হলে এবং গবেষণার মূল ভিত্তি দুর্বল প্রমাণিত হলে।
• নীতিগত লঙ্ঘন (Ethical Violations): মানব বা প্রাণী নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি অনুমোদন (যেমন: An Institutional Review Board-IRB/ An Institutional Animal Care and Use Committee-IACUC) না নেওয়া।
• স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest): লেখকের গোপন আর্থিক বা পেশাগত স্বার্থ যা গবেষণার নিরপেক্ষতাকে প্রভাবিত করতে পারে, তা প্রকাশ না করা।
• বক্তব্য বা পিয়ার রিভিউতে জালিয়াতি (Compromised Peer Review): ভুয়া পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়া বা জালিয়াতির মাধ্যমে রিভিউ করিয়ে আর্টিকেল প্রকাশ করানোর প্রমাণ পাওয়া।
• কপিরাইট আইন লঙ্ঘন: কোন জার্নালে প্রকাশিত কোন প্রবন্ধ বা তার কোন অংশ অনুমতি ছাড়া নিজের গবেষণা প্রবন্ধে ব্যবহার করা। 

গবেষনাপত্র প্রত্যাহারের উর্ধমুখী প্রবণতা
চীনা গবেষক Zhengyi Zhou এবং তার সহলেখকগন ২০২৬ সালে  ”অ্যাকাডেমিক সততার মানচিত্রায়ন: বিশ্বব্যাপী প্রত্যাহারের প্রবণতা” (Zhengyi Zhou et al., 2026)  বিষয়ক এক গবেষণা প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, বিষয়ভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্বেষিত ২০০০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক গবেষণাপত্র বা আর্টিকেল রিট্রাকশনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী Retraction Watch ডেটাবেইস অনুযায়ী মোট রিট্রাক্ট হওয়া আর্টিকেলের সংখ্যা বর্তমানে ৬৪,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। এই দুই দশকে ভুয়া পিয়ার রিভিউ, পেপার মিলের দৌরাত্ম্য এবং ডেটা কারচুপির কারণে রিট্রাকশনের হার দ্রুত গতিতে বেড়েছে। আবার ২০০০-২০১০ সময়কালে প্রতি বছর রিট্রাক্ট হওয়া আর্টিকেলের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম এবং সাধারণত শতকের নিচে বা কয়েক শ-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০১১-২০২০ দশকে গবেষণার পরিধি বৃদ্ধির পাশাপাশি এসময়ে জালিয়াতি ধরা পড়ার হার বাড়তে থাকে এবং রিট্রাকশন প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে হাজার অতিক্রম করে। ২০২৩ সালটি বৈশ্বিক গবেষণার ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি করে, যে বছর একক বছরে বিশ্বজুড়ে ১৪,০০০-এর বেশি রিট্রাকশন নোটিশ জারি করা হয়েছিল। তবে ২০২৩-এর পর প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি ও স্বয়ংক্রিয় স্ক্রিনিং টুলের ব্যবহার বাড়ায় ২০২৪ সালে প্রায় ১০,০০০ এবং ২০২৫ সালে ৯,০০০-এর অধিক গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৬ সাল জুড়েও বিভিন্ন জার্নাল কর্তৃক জালিয়াতির অভিযোগে বড় চেইনে পেপার রিট্রাকশনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

ছবি: ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রত্যাহার করা নিবন্ধ এবং প্রত্যাহার বিজ্ঞপ্তির বার্ষিক সংখ্যা 

কেন এত প্রত্যাহার বাড়ছে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশের সংখা অনেক বেড়েছে। যারা উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ করতে চাইছে, তারা সুযোগটিকে নির্বিঘ্ন করতে গবেষণা প্রকাশনার দিকে বেশ মনোযোগ দিচ্ছে এবং প্রকাশনার ক্ষেত্রে একাডেমিয়ার নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে কম। আবার অনেক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদতেই কোন নীতিগত নিয়মনীতি নেই। আবার কেউ কেউ অধিক গবেষণাপ্রবন্ধ প্রকাশনার মধ্যে দিয়ে গবেষক হিসাবে গবেষণাজগতে নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার মানসিকতা পোষন করে থাকে। মোটাদাগে কারনগুলোকে চিহ্নিত করলে দেখা যাবে যে নীচের দুটি বিষয় খুবই নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
 
গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা দিয়ে মূল্যায়নের সংস্কৃতি: গবেষণায় নিয়মিত প্রকাশনার (পেপার পাবলিশ) সংখ্যা দিয়ে একজন গবেষকের যোগ্যতা বা সফলতা মূল্যায়নের প্রবণতা আছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজের স্বীকৃতি পাওয়া, পদোন্নতি অর্জন করা কিংবা গবেষণার তহবিল পেতে হলে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষণাপত্র প্রকাশনা বাধ্যতামূলক বা উচ্চমূল্যায়িত হয়ে দাঁড়ায়। ফলে গবেষকরা প্রায়ই অতি দ্রুত ও ক্রমাগত নতুন নিবন্ধ প্রকাশ করতে চেষ্টায় থাকেন, যাতে তাঁরা প্রচুর পেপার জমা দিতে পারেন। এই চাপে কিছু গবেষক সততা কিংবা সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করার পরিবর্তে শর্টকাট বা অনৈতিক উপায়ে (যেমন ডেটা সাজানো, অনুচিত সহযোগিতা বা প্লাগিয়ারিজম) কাজ এগিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ফেলেন। এ কারণেই বৈজ্ঞানিক গবেষণায় জালিয়াতি বা ত্রুটিপূর্ণ নিবন্ধের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং শেষে অনেকগুলো পেপার প্রত্যাহার (retraction) করতে হয়।

পেপার মিলের (Paper Mills) উত্থান: ‘পেপার মিল’ (Paper Mills) বা ভুয়া গবেষণাপত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের আগ্রাসী উত্থান সাম্প্রতিক সময়ে এক বিশেষ সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে সম্পূর্ণ বা আংশিক ভুয়া গবেষণাপত্র তৈরি করা। সাধারণত পেপার মিলগুলোর সাথে যুক্ত কিছু ‘ঘোষিত’ বা ‘গোপন’ লেখক (ghostwriters) থাকে, যারা নির্দিষ্ট বিষয়ে বা ক্ষেত্রবিশেষে পুরোপুরি কাল্পনিক তথ্য বা ডেটা দিয়ে গবেষণাপত্র লেখে। এরপর ‘ক্রেতা’ (অর্থাৎ যে গবেষক) তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও প্রয়োজনীয় ডিটেইলস যোগ করে সেই পেপারটিকে নিজের নামে চালিয়ে দেন। কখনো কখনো বিদ্যমান কোনো গবেষণাপত্র সামান্য সম্পাদনা বা রদবদল করে নতুন রূপে প্রকাশ করা হয়। পেপার মিল থেকে আসা নিবন্ধগুলোতে ব্যবহৃত ডেটা প্রায়ই বানানো অথবা বিদ্যমান গবেষণার তথ্য ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়। ফলে মূলত এগুলো বিজ্ঞানের নামে ভুল তথ্য ছড়ায়।

প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া
আর্টিকেল বা গবেষণাপত্র রিট্রাকশন বা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী প্রধানত COPE (Committee on Publication Ethics) বা প্রকাশনা নৈতিকতা কমিটির সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনে চলা হয়। এর মূল লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার সততা রক্ষা করা, কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়। প্রকাশনার ক্ষেত্রে অভিনবত্ব, লেখকত্ব, পিয়ার রিভিউ, স্বার্থের সংঘাত, প্রকাশনা সংক্রান্ত অসদাচরণ, সংশোধন, প্রত্যাহার, নৈতিক তত্ত্বাবধান এবং সর্বোত্তম অনুশীলন বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করে। আর সেক্ষেত্রে নীচের ধারাবহিক প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করা হয়:

অসংগতি চিহ্নিতকরণ: পাঠক, সহকর্মী বা এডিটর প্রকাশিত পেপারে কোনো অসংগতি বা জালিয়াতি লক্ষ্য করলে জার্নাল কর্তৃপক্ষকে জানান।
তদন্ত ও যোগাযোগ: জার্নালের সম্পাদক বা এডিটর বোর্ড অভিযোগ যাচাই করেন এবং সংশ্লিষ্ট লেখকদের কাছে ব্যাখ্যা চান।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ: প্রমাণ পেলে অথবা লেখকরা নিজেরা ভুল স্বীকার করলে পেপারটি প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নোটিশ প্রকাশ: মূল নিবন্ধের সাথে একটি স্পষ্ট 'রিট্রাকশন নোটিশ' যুক্ত করা হয় এবং আন্তর্জাতিক ডেটাবেইসগুলোতে পেপারটি যে বাতিল হয়েছে তা স্থায়ীভাবে লিখে দেওয়া হয়।

প্রত্যাহারের ফলাফল ও প্রভাব
• একাডেমিক ক্ষতি: প্রতারণার কারণে পেপার প্রত্যাহার হলে গবেষক ও তার সহগবেষকগণ মারাত্নকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হন।
• তহবিল বা অনুদান হ্রাস: ভবিষ্যতে গবেষণা অনুদান পাওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং পেশাগত ক্যারিয়ার হুমকির মুখে পড়ে।
• প্রাতিষ্ঠানিক সম্মানহানি: সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বস্ততা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
• সংশোধন বার্তা: এটি বিজ্ঞান জগতের স্বয়ংক্রিয় সংশোধন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কাজ করে, যা অন্য গবেষকদের ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করা থেকে বাঁচায়।
• সাইটেশন পেনাল্টি: অন্যান্য প্রকাশিত নিবন্ধের উদ্ধৃতি বা সাইটেশন গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
• গবেষণা সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়া: ইচ্ছাকৃত প্রতারণার ক্ষেত্রে অনেক গবেষকদের সাথে অন্যান্য গবেষকগন কোলাবরেটিভ কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেনা না এবং কেউ কেউ গবেষণা পেশা থেকেই ছিটকে পড়েন।

প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
• প্রাতিষ্ঠানিক কঠোর নজরদারি: বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অনৈতিক কাজ প্রতিরোধে স্বাধীন রিসার্চ ইন্টেগ্রিটি অফিস স্থাপন করা উচিত। এই অফিসটি কোন গবেষণা প্রবন্ধ কোন জার্নালে পাঠানোর আগে তা পর্যালোচনা এবং নিয়মিত অডিট করা উচিত। এই ধরনের ও দায়বদ্ধতা বাড়ালে জালিয়াতির সম্ভাবনা কমবে। একই সাথে সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষনা প্রতষ্ঠিানে COPE (Committee on Publication Ethics) বা প্রকাশনা নৈতিকতা কমিটি গঠন করা এবং কমিটির মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুসরণের ব্যবস্থা করা উচিত।
• কঠোর পিয়ার রিভিউ: প্রকাশনার আগে বিশেষজ্ঞ দ্বারা নিখুঁত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
• সততা ও মূল্যবোধের চর্চা: শিক্ষার্থীদের শুরুর দিক থেকেই গবেষণার নীতিমালা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং লেখালেখির সততা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। প্রকৃত জ্ঞানসাধনা ও দায়বদ্ধতা—এই দুটি গুণই ভবিষ্যৎ বৈজ্ঞানিক প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাবে।
• সফটওয়্যার ব্যবহার: চৌর্যবৃত্তি রোধে আধুনিক স্ক্যানিং টুল ব্যবহার করা।
• স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: কাঁচা ডেটা বা র-ডেটা সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রাখা।
• মূল্যায়নে গুণগত মাপকাঠি: কেবলমাত্র প্রকাশনার সংখ্যা দিয়ে নয়, তার প্রভাব, পুনরায় পরীক্ষাযোগ্যতা ও গুণগত মান দিয়েও 

গবেষকদের মূল্যায়ন করতে হবে। সাধারণত, ভালো গবেষণার মান নির্ণয় করা উচিত তার প্রভাব, বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছতা ও পুনরায় পরীক্ষাযোগ্যতার (reproducibility) ওপর ভিত্তি করে— কেবলমাত্র “কতগুলো” নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে, তার ভিত্তিতে নয়। কিন্তু বর্তমানে “পাবলিশ অর পেরিশ” সংস্কৃতির ফলে অনেকে শুধুমাত্র সংখ্যা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে জোর দেন, যা গবেষণার গুণগত মানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

পেপার মিল ও ভুঁইফোঁড় জার্নালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: বৈশ্বিক পর্যায়ে সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে ভুয়া প্রকাশনা ও জাল পিয়ার রিভিউ রুখতে কঠোর আইন ও ব্ল্যাকলিস্ট তৈরি প্রয়োজন। বর্তমানে ক্যাবেল’স ব্ল্যাকলিস্ট (Cabell’s Predatory Reports), বিল’s লিস্ট (Beall’s List) এবং Retraction Watch Database.

গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের দিক দিয়ে এগিয়ে যারা
গবেষণাপত্র বা আর্টিকেল রিট্রাকশন (Retraction) বা প্রত্যাহারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের গবেষকদের কাজে। তবে প্রকাশিত মোট গবেষণার তুলনায় রিট্রাকশনের হারের দিক থেকে সৌদি আরব, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইথিওপিয়ার মতো দেশগুলো এগিয়ে রয়েছে। দেখা যায় যে, মোট সংখ্যার দিক থেকে চীন যেখানে বৈশ্বিক রিট্রাকশনের সবচেয়ে বড় অংশ প্রায় ৩০% থেকে ৪০% গবেষণাপত্রই চীনা গবেষকদের সাথে সম্পর্কিত। জালিয়াতি ও পেপার মিলের (Paper mill) কারণে এখানে প্রত্যাহার বেশি হয়। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র মোট রিট্রাকশনের সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। উন্নত গবেষণার পরিধি ও কড়া নজরদারির ফলে এখানে ভুলত্রুটি বা সততার লংঘন দ্রুত ধরা পড়ে এবং প্রত্যাহার করা হয়। এবং ভারতে তৃতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের রেকর্ড রয়েছে। বৈশ্বিক প্রকাশনার অনুপাতে এখানকার রিট্রাকশন হারও লক্ষণীয়।  তবে মোট উৎপাদনের তুলনায় রিট্রাকশন হারের (Retraction Rate) পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, প্রকাশিত নিবন্ধ প্রতি রিট্রাকশনের আনুপাতিক হার বা অনুপাতে শীর্ষ স্থানীয় অবস্থানে রয়েছে সৌদি আরব ও পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, কাজাখস্তান, ও রাশিয়া। ইরান, মিশর এবং মালয়েশিয়াতেও প্রকাশনা অনুপাতে রিট্রাকশনের হার বেশ উঁচুতে রয়েছে।

গবেষণা প্রত্যাহারের অপরিচিত অধ্যায় এবং COPE এর আবশ্যকতা
“জার্নাল অব মেডিকেল এথিক্স” জার্নালের ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত জার্নালগুলো কেন এবং কীভাবে প্রবন্ধ প্রত্যাহার করে? ১৯৮৮-২০০৮ সালের মেডলাইন প্রত্যাহারের একটি বিশ্লেষণ” শীর্ষক প্রবন্ধে এলিজাবেথ ওয়েজার এবং পিটার উইলিয়ামস নামের দুজন গবেষক তাদের কৌতুহলী প্রশ্ন ছুড়লেন—আদৌ কি সব জার্নাল একইভাবে এই ভুলগুলো শুধরে নেয়? নাকি যার যার মতো নিয়ম চালাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তারা বিখ্যাত ‘মেডলাইন’ (Medline) ডাটাবেসে প্রকাশিত রিট্র্যাকশন নোটিশগুলোর ওপর এক বিশদ নজরদারী চালান। ১৯৮৮ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে জমা হওয়া শত শত নোটিশ থেকে ৩১২টি ঘটনাকে তাঁরা নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য বেছে নিয়েছিলেন।

তাঁদের গবেষণায় এক চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এলো। সময়ের সাথে সাথে এই প্রবন্ধ প্রত্যাহারের সংখ্যা যেন হঠাৎ করেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে! ১৯৮০-এর দশকে যেখানে বছরে গড়ে মাত্র ৭টি প্রবন্ধ তুলে নেওয়া হতো, ২০০৯ সালে সেই সংখ্যা একলাফে গিয়ে পৌঁছায় ২৭৯টিতে। কিন্তু কেন এমনটা ঘটছে?

সবচেয়ে বড় কারণটি কিন্তু কোনো অপরাধ বা জালিয়াতি ছিল না; ছিল 'সৎ ভুল'! দেখা গেল, প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে গবেষকেরা অনিচ্ছাকৃত কোনো ভুল করে ফেলেছিলেন কিংবা পরে নিজেরা চেষ্টা করেও সেই একই ফলাফল আর পুনরাবৃত্তি করতে পারেননি। তবে অন্ধকার দিকটাও কম ছিল না—প্রায় ২৮ শতাংশ প্রবন্ধ তুলে নেওয়া হয়েছিল ডেটা জালিয়াতি বা অসদাচরণের দায়ে। ১৭ শতাংশ ক্ষেত্রে গবেষকেরা একই তথ্য একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একাধিক জায়গায় ছেপে দিয়েছিলেন, আর ১৬ শতাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি ধরা পড়েছিল লেখা চুরির (Plagiarism) ঘটনা।

এখন প্রশ্ন ওঠে, এই ভুল স্বীকারের বা লেখা তুলে নেওয়ার কাজটি আসলে শুরু করে কে? গল্পটার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, ৬৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই লেখকেরা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে তাঁদের ভুল স্বীকার করেছেন এবং প্রবন্ধ তুলে নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। বাকি ২৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সম্পাদক বা জার্নাল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে লেখা বাতিল করেছে। তবে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বিশ্লেষণ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে রিট্র্যাকশনের নোটিশে আসল কারণটাই স্পষ্টভাবে লেখা হয়নি! অস্পষ্ট গোলমেলে ভাষায় লিখে রাখা হয়েছিল। এর ফলে এক অদ্ভুত সংকট তৈরি হয়—যে গবেষক সততার সাথে নিজের ভুল স্বীকার করে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিলেন, তাঁকেও সাধারণ পাঠক বা সহকর্মীরা জালিয়াতি করা অপরাধীদের সাথে একই চোখে দেখতে শুরু করলেন! এই জায়গাটিতেই গবেষকদ্বয় COPE-এর নির্দেশিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন। রিট্র্যাকশনের আসল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া বা সমাজে ছোট করা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক নথির শুদ্ধতা বজায় রাখা। তাই নোটিশে পরিষ্কার করে বলা উচিত—ভুলটা কি অনিচ্ছাকৃত ছিল, নাকি ইচ্ছাকৃত অপরাধ?

নামী গবেষকদের প্রবন্ধ প্রত্যাহার হয় কিনা?
আর্টিকেল প্রত্যাহারের খবর শুনলেই শুধু অখ্যাতদের কথা মনে হয়, আসলে খ্যাতরোও যে এ তালিকা থেকে বাদ যান না সেটি শুনলে হয়েতা অনেকেরেই মন ভালো হবে। চলুন দেখি আসি নামকরা বিজ্ঞঅনীদের মধ্যে কারা আছেন প্রত্যাহৃতদের তালিকায়- 

গ্রিগ সেমেনজা: মার্কিন বিজ্ঞানী গ্রিগ সেমেনজা একজন প্রখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও শিশু বিশেষজ্ঞ। তিনি ২০১৯ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কোষ কীভাবে অক্সিজেনের মাত্রা বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী নিজেদের মানিয়ে নেয়—এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তিনি উইলিয়াম কেলিন জুনিয়র ও পিটার র্যাটক্লিফের সাথে যৌথভাবে এই সম্মাননা অর্জন করেন। তবে নোবেল অর্জনের পর পরই তার বেশ কিছু পুরোনো গবেষণাপত্রের ছবির উপাত্ত (Image data) নিয়ে প্রশ্ন তোলে বৈজ্ঞানিক কমিউনিটি। পরবর্তীতে ডেটা কারচুপির অভিযোগে তার প্রায় ১৩ টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয় এবং আরও বেশ কিছু গবেষণা তদন্তের মুখে পড়ে।

শিনিয়া ইয়ামানাকা (Shinya Yamanaka): ২০১২ সালে নোবেলজয়ী এই চিকিৎসাবিজ্ঞানীর ল্যাবের একটি গবেষণাপত্রে গুরুতর অসদাচরণের জেরে আর্টিকেল প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছিল, যার দায় তিনি নিজে স্বীকার করেছিলেন। ২০১৮ সালে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা-র ল্যাবরেটরিতে প্রকাশিত ২০১৭ সালের একটি স্টেম সেল গবেষণা পেপার তথ্য জালিয়াতির (Data Fabrication and Falsification) কারণে প্রত্যাহার বা রিট্রাকট করা হয়েছিল। তবে মূল জালিয়াতি করেছিলেন তার দলের সহযোগী গবেষক কোহেই ইয়ামামিজু (Kohei Yamamizu), আর ইয়ামানাকা দাপ্তরিক ও নৈতিক তদারকি ঠিকমতো না করার দায় নিয়ে ক্ষমা ও শাস্তি মাথা পেতে নিয়েছিলেন। মূল ঘটনাটা ছিল, ২০১৭ সালের মার্চ মাসে জার্নালে প্রকাশিত পেপারটির মূল বিষয় ছিল হিউম্যান আইপিএস (iPS) সেল ব্যবহার করে ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার বা রক্ত-মস্তিষ্ক বাধা পুনর্গঠন।

পরবর্তী সময়ে তদন্তে দেখা যায়, ওই পেপারের মূল ও সাপ্লিমেন্টারি ফিগারের প্রায় সবকটি ডেটাসই ভুয়া বা কারসাজি করে তৈরি করা হয়েছিল। কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয় যে প্রথম ও সংশ্লিষ্ট লেখক কোহেই ইয়ামামিজু একাই এই জালিয়াতি করেছেন। এর পরিণতি জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পর কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় অভিযুক্ত গবেষক কোহেই ইয়ামামিজুকে বরখাস্ত করে এবং জার্নাল থেকে পেপারটি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানায়। গবেষণাগারে সঠিক নজরদারি ও তত্ত্বাবধান না করার জন্য নোবেল বিজয়ী শিনিয়া ইয়ামানাকা জনসমক্ষে গভীর দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। নৈতিকতার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় নিজের বেতন থেকে একটি বড় অংশ গবেষণা তহবিলে দান করেন এবং ভবিষ্যতে এমন ভুল রোধে কঠোর নিয়ম চালু করেন।

ফ্রান্সেস আর্নল্ড, ক্যালটেকের একজন গবেষক, যিনি ২০১৮ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নিয়েছিলেন, তিনি ২০১৯ সালের একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করেছেন কারণ তিনি এর ফলাফল পুনরায় প্রমাণ করতে পারেননি। ফ্রান্সেস আর্নল্ড, যিনি এনজাইমের বিবর্তন নিয়ে গবেষণার জন্য ২০১৮ সালের পুরস্কারের অর্ধেক জিতেছিলেন, তিনি আজ সকালে টুইট করে এই খবরটি জানিয়েছেন। Site-selective enzymatic C‒H amidation for synthesis of diverse lactams" (1) রিপোর্টটি প্রকাশের পর, কাজটি পুনরুৎপাদনের প্রচেষ্টায় দেখা যায় যে এনজাইমগুলি দাবিকৃত কার্যকলাপ এবং নির্বাচনশীলতার সাথে বিক্রিয়াগুলিকে অনুঘটক করে না। এরপর প্রথম লেখকের ল্যাব নোটবুক সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করে দেখা যায় যে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলির জন্য সমসাময়িক এন্ট্রি এবং কাঁচা ডেটা অনুপস্থিত। তাই লেখকরা গবেষণাপত্রটি প্রত্যাহার করছেন। ফ্রান্সেস আর্নল্ড তার নিজের টু্ইটে উল্লেখ করেন ”২০২০ সালের আমার প্রথম কর্ম-সম্পর্কিত টুইটে, আমি অত্যন্ত হতাশ হয়ে জানাচ্ছি যে আমরা বিটা-ল্যাকটামের এনজাইমেটিক সংশ্লেষণ বিষয়ক গত বছরের গবেষণাপত্রটি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। কাজটি পুনরুৎপাদনযোগ্য হয়নি।”

পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক: কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রণেতা এবং ১৯১৮ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের দুটি ঐতিহাসিক আর্টিকেল এক দশক ধরে রিট্রাক্টেড বা প্রত্যাহারকৃত ছিল। কানাডার কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউকিউ) বিজ্ঞান ঐতিহাসিক ইভ গিংগ্রাস এবং মাহদি খেলফাউই এই ঘটনাটি আবিষ্কার করার পর বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনা হলো-১৯৪২ সাল ১৯৪০ সালে ম্যাক্স প্লাংকের দুটি গবেষণা প্রবন্ধ ২০১১ সালে কপি রাইট লঙ্ঘনের দায়ে প্রত্যাহার করে স্প্রিংগার নেচার। দুটো প্রবন্ধই কপি রাইট ইস্যূতে প্রত্রাহার করা হয়। প্রকাশিত হয়েছিল জার্মানির নামী বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নাটুয়ারউইসেনশাফটেন’ (Naturwissenschaften)-এ।  

প্লাংকের প্রথম প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘সিন উন্ড গ্রেনজেন ডের এগজাক্টেন উইসেনশাফট’ (যথাযথ বিজ্ঞানের অর্থ ও সীমাবদ্ধতা)। ২০১১ সালে স্প্রিংগার নেচার প্রতাহার করে নেওয়াার পর কানাডার কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়র ইতিহাসবিদ ইভ গিংগ্রাস ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’এ ম্যাক্স প্লাংকের নাম দেখে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে  তার সহকর্মী মাহদি খেলফাউইকে সাথে নিয়ে অনুসন্ধান করে দেখেন, প্রথম লেখাটি সেই সময় আরও দুটি সাময়িকী এবং দুটি বইয়ে পুনঃমুদ্রিত হয়েছিল। ইন্টারনেট আবিষ্কারের আগে গত শতাব্দীতে এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ও স্বাভাবিক অনুশীলন ছিল। বিজ্ঞানীরা চাইতেন তাদের গবেষণাকর্ম যেন ভিন্ন ভিন্ন পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। আলবার্ট আইনস্টাইনও তার লেখা একাধিকবার ভিন্ন জায়গায় প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তার কোনো লেখা প্রত্যাহার করা হয়নি। ১৯৪২ সালের একটি লেখার ওপর আধুনিক যুগের নিয়ম চাপিয়ে দেওয়াকে ইতিহাসবিদরা ‘অ্যানাক্রোনিজম’ বা কালবৈষম্যমূলক ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। 

১৯৪০ সালে প্রকাশিত প্লাংকের দ্বিতীয় প্রবন্ধটি প্রত্যাহারের ঘটনাটি আরও বেশি রহস্যময়। গবেষকদের ধারণা, এটি সম্পূর্ণ একটি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার প্রোগ্রামের (বট) ভুলের ফসল। ১৯৪০ সালের নভেম্বরে দার্শনিক আলোইস মুলার ‘নাটুয়ারউইসেনশাফটেন’ (‘দ্য সায়েন্স অব নেচার)’-এ প্লাংকের কোয়ান্টাম তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে একটি প্রবন্ধ লেখেন, যার শিরোনাম ছিল ‘প্রকৃতি বিজ্ঞান ও বাস্তব বহির্বিশ্ব’। এক মাস পর ম্যাক্স প্লাংক হুবহু একই শিরোনাম ব্যবহার করে সেই সমালোচনার একটি জবাব দেন। ঐতিহাসিকদের ধারণা, স্প্রিংগার নেচারের স্বয়ংক্রিয় কপিরাইট সফটওয়্যার বা বট দুই দশকেরও বেশি সময় পর এসে কেবল শিরোনামের মিল দেখে প্লাংকের প্রবন্ধটিকে মুলারের লেখার ‘নকল’ বা প্লেজারিজম ভেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে দেয়। অথচ দুটি লেখার বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। পরবর্তীতে ২০২৬ সালে প্রকাশনা সংস্থা সেই ভুল সংশোধন করে তার আর্টিকেল দুটি পুনর্বহাল (Reinstate) করে।

পরিশেষে বলা যায়, আর্টিকেল রিট্রাকশন কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং এটি গবেষণা জগতের স্বচ্ছতা ও সততা রক্ষার একটি স্বয়ংক্রিয় ও জরুরি মাধ্যম। এটি প্রমাণ করে যে বিজ্ঞান বা জ্ঞানচর্চা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া, যেখানে ভুলের স্থান নেই এবং ভুল প্রমাণিত হলে তা স্বীকার করে শুদ্ধি আনা বাধ্যতামূলক। ভবিষ্যতে আরও নিখুঁত ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা নিশ্চিত করতে এই রিট্রাকশন প্রক্রিয়া নৈতিক সতর্কতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

 তথ্যসূত্র:
Zhengyi Zhou, Ying Lou, Zhesi Shen, Menghui Li. Mapping Academic Integrity: Global Retraction Trends Explored through a Topic Lens.  

https://doi.org/10.48550/arXiv.2511.21176
Wager E, Williams P. Why and how do journals retract articles? An analysis of Medline retractions 1988-2008. J Med Ethics. 2011 Sep;37(9):567-70. doi: 10.1136/jme.2010.040964.