জটিল সমস্যার সমাধানে কেন প্রয়োজন আন্তঃবিষয়ক গবেষণা?
বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানচর্চার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় গবেষণা মানেই ছিল নির্দিষ্ট একটি শাস্ত্রের ভেতরে সীমাবদ্ধ থেকে কাজ করা। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে বিজ্ঞান আর একক কোনো ডিসিপ্লিনের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়; বরং এটি বহুমাত্রিক, বহুবিষয়ক এবং আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতার উপর দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য সংকট, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি সমস্যা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসব জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ কোনো একক শাস্ত্রের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। ফলে মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি ও ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি গবেষণা আজ সময়ের দাবি।
মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি গবেষণায় বিভিন্ন বিষয়ের গবেষকেরা একই সমস্যাকে নিজেদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন। আর ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি গবেষণায় তারা পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে জ্ঞানের সীমানা একে অপরকে অতিক্রম করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন এপিডেমিওলজিস্ট রোগের বিস্তার বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রায়ই একজন বায়োস্ট্যাটিস্টিশিয়ানের সহায়তা নেন, যিনি জটিল ডেটা বিশ্লেষণ ও মডেলিংয়ের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক ফলাফলকে নির্ভরযোগ্য করে তোলেন। আবার একজন পরিবেশ বিজ্ঞানী যখন দূষণ নিয়ন্ত্রণ বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন, তখন তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং সমাধানের উপর নির্ভর করতেই হয়। অর্থাৎ জ্ঞানের অগ্রযাত্রা এখন পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়েই সম্ভব।
বর্তমান গবেষণার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ডেটা-নির্ভরতা। বিগ ডেটা, রিমোট সেন্সিং, বায়োইনফরমেটিক্স কিংবা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স—এসব প্রযুক্তি বিভিন্ন শাস্ত্রকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে। একজন জীববিজ্ঞানী জেনোমিক তথ্য বিশ্লেষণের জন্য কম্পিউটার বিজ্ঞানীর সহায়তা নিচ্ছেন, আবার একজন সমাজবিজ্ঞানী নীতিনির্ধারণী গবেষণায় পরিসংখ্যানবিদের সহযোগিতা পাচ্ছেন। এভাবে জ্ঞানের ভেতরে যে সেতুবন্ধন তৈরি হচ্ছে, তা গবেষণাকে আরও শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী করে তুলছে।
মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উদ্ভাবন। ভিন্ন ভিন্ন শাস্ত্রের জ্ঞান ও পদ্ধতি একত্রিত হলে নতুন ধারণা, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন সমাধান তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বায়োমেটেরিয়াল, ন্যানোটেকনোলজি ও বায়োইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমন্বয়ে উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরি হচ্ছে। পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় ভূ-তথ্য ব্যবস্থা (GIS), রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও নীতিশাস্ত্রের সমন্বয় টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করছে। এই আন্তঃবিষয়ক সমন্বয় না হলে এমন উদ্ভাবন সম্ভব হতো না।
তবে এই ধরনের গবেষণার জন্য প্রয়োজন মানসিক উন্মুক্ততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং কার্যকর যোগাযোগ। ভিন্ন শাস্ত্রের ভাষা ও পদ্ধতি বোঝার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে যৌথ গবেষণা, যৌথ তহবিল এবং যৌথ প্রকাশনার সুযোগ বাড়ে। তরুণ গবেষকদেরও একাধিক শাস্ত্রের মৌলিক ধারণা অর্জনে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
সবশেষে বলা যায়, বর্তমান যুগের বিজ্ঞান একক কোনো শাস্ত্রের শক্তিতে এগোয় না; এটি এগোয় সমন্বিত জ্ঞানের শক্তিতে। মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি গবেষণা শুধু একটি পদ্ধতি নয়, এটি ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানচর্চার ভিত্তি। জ্ঞানের এই সমন্বিত পথই আমাদেরকে আরও কার্যকর, টেকসই ও মানবকল্যাণমুখী সমাধানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়