০১ আগস্ট ২০২৬, ১৬:১৫

৩১ দফার রাষ্ট্র মেরামত: জাতীয় ঐক্য, মেধাভিত্তিক সমাজ ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

মাহাদী-উল-মোর্শেদ  © টিডিসি ফটো

বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকট, বিভাজন ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সংকট সব মিলিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী করার প্রশ্নটি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি ঘোষিত ‘রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা’ নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২৩ সালের ১২ জুলাই ঘোষিত এই রূপরেখার অন্যতম লক্ষ্য হলো জনগণের হাতে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া, রাজনৈতিক বিভাজন কমানো এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠন করা। এই পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘জাতীয় পুনর্মিলন কমিশন’ গঠন, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভক্তি দূর করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ধরনের সংস্কার কি কেবল রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছায় সফল হতে পারে? বাস্তবতা হলো, কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করে জনগণের সমর্থন, আস্থা এবং গ্রহণযোগ্যতার ওপর। সম্প্রতি পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রাষ্ট্র সংস্কার ও জাতীয় পুনর্মিলনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের আয়, শিক্ষা, পেশা, সামাজিক অবস্থান এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বিভাজনের রাজনীতি থেকে ঐক্যের পথে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বহু বছর ধরে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একটি দলের লাভকে অন্য দলের ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রও অনেক সময় নিরপেক্ষতার পরিবর্তে দলীয় প্রভাবের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ৩১ দফার মূল দর্শন হলো এই বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও সবাই দেশের উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করবে। জাতীয় পুনর্মিলন কমিশনের ধারণা এসেছে মূলত এই চিন্তা থেকে যাতে অতীতের রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিহিংসা এবং অবিশ্বাস দূর করে নতুন একটি সামাজিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।

দক্ষিণ আফ্রিকা, রুয়ান্ডা এবং বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক সংঘাতের পর পুনর্মিলন কমিশন সফলভাবে সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশেও এমন একটি উদ্যোগ কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে গবেষণাভিত্তিক আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘রেইনবো নেশন’ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বলতে কী বোঝায়?
বিশ্বজুড়ে "রেইনবো নেশন" বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এই ধারণার একটি সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট রয়েছে। শব্দগত মিলের কারণে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত ‘রেইনবো’ (রংধনু) পতাকার সাথে মিল রেখে অনেকেই শুরুতে প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, এই রূপরেখায় পশ্চিমা কোনো সামাজিক আন্দোলন বা ৩৭৭ ধারার অধীন বিষয়গুলোর (যেমন সমকামিতা বা ট্রান্সজেন্ডার অধিকার) কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বিএনপির 'রেইনবো নেশন' তত্ত্বের সাথে সমকামিতা বা ৩৭৭ ধারা সংশোধনের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা ও ডেসমন্ড টুটুর রাজনৈতিক দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত যার মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দূর করে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করা।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ডেটা প্রদানকারীরাও এই বিষয়ে একমত যে, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ মানে কোনো আন্তর্জাতিক ভাবধারার অনুকরণ নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হবে না।
তাদের মতে, প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি বলতে বোঝায়, 

মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নঃ রাজনৈতিক পরিচয় বা স্বজনপ্রীতির পরিবর্তে মেধার ভিত্তিতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

অনগ্রসরদের উন্নয়নঃ অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সংবিধানসম্মত সুযোগ দিয়ে সামনে এগিয়ে নেওয়া।

সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতিঃ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সহাবস্থান বজায় রাখা। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৯, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদেও সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ, বৈষম্যহীনতা ও মেধার মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগকে অবশ্যই সংবিধানের এই চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

গবেষণায় কী উঠে এসেছে?
৪৪৮ জন নিবন্ধিত ভোটারের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, জাতীয় পুনর্মিলন কমিশন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতি মানুষের সমর্থনের পেছনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১. অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানুষকে পরিবর্তনের পক্ষে আনে
গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক আয় যত বেশি, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতি সমর্থনও তত বেশি। পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, পারিবারিক আয় ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ইতিবাচক উপাদান (β = .499, p < .001)। এর অর্থ হলো, যেসব মানুষ অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ অবস্থানে আছেন, তারা রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সংস্কারকে ইতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা বেশি দেখান। কারণ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মানুষকে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার আত্মবিশ্বাস দেয়।

২. সামাজিক মর্যাদা পরিবর্তনের পথে বাধা হতে পারে
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো, যাদের সামাজিক মর্যাদা তুলনামূলকভাবে বেশি, তারা অনেক সময় রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন (β = -.414, p < .001)। এর কারণ হতে পারে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় সুবিধাভোগী মানুষ নতুন পরিবর্তনকে নিজেদের অবস্থানের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে তারা অনেক সময় রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেন।

৩. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় পরিচয়ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতি মানুষের মনোভাবকে প্রভাবিত করে। ANOVA বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মনোভাবের প্রায় ৩০.৭ শতাংশ পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে পারে। এটি স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশে যেকোনো রাজনৈতিক সংস্কার বা পুনর্মিলন প্রক্রিয়াকে অবশ্যই দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে সম্মান করতে হবে। জনগণের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া সম্ভব নয়।

৪. শিক্ষা ও পেশাজীবীদের দৃষ্টিভঙ্গি
সাধারণভাবে মনে করা হয়, উচ্চশিক্ষিত মানুষ সবসময় সংস্কারের পক্ষে থাকবেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষাগত যোগ্যতা (β = -.148, p = .003) এবং পেশাগত অবস্থান (β = -.164, p = .007) অনেক ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর একটি কারণ হতে পারে, উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবীদের একটি অংশ রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাবকে সন্দেহের চোখে দেখেন অথবা বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

৫. নারীদের ইতিবাচক অবস্থান
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় রাষ্ট্র সংস্কার ও সামাজিক সমন্বয়ের প্রতি কিছুটা বেশি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। নারীদের গড় সমর্থনের মান ছিল ২.৬৯, যেখানে পুরুষদের ছিল ২.৫২। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, নারীরা সাধারণত সামাজিক ন্যায়বিচার, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন।

ভবিষ্যতের জন্য করণীয়
এই গবেষণার ফলাফল রাজনৈতিক দল, নীতিনির্ধারক এবং সুশীল সমাজের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়ঃ প্রথমত, রাষ্ট্র সংস্কারের যেকোনো পরিকল্পনা দেশের সংবিধান, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক বাস্তবতার ভিত্তিতে তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কেবল রাজনৈতিক সংস্কার সফল করা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। জনগণের আস্থা অর্জন ছাড়া কোনো সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। চতুর্থত, রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়গুলোকে সহজ ভাষায় মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। মানুষকে বুঝতে হবে, একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও মেধাভিত্তিক সমাজ কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে উন্নত করতে পারে।

পরিশেষে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সংঘাতের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার ওপর। ৩১ দফার রাষ্ট্র মেরামত পরিকল্পনা যদি কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। কিন্তু যদি এটি জনগণের বাস্তব চাহিদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং মেধাভিত্তিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি একটি নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। জাতীয় পুনর্মিলনের প্রকৃত অর্থ হলো ভিন্ন মত ও ভিন্ন পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেখানে কোনো নাগরিকের অন্ধ রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তার যোগ্যতা, মেধা ও মানবিক মর্যাদা বেশি মূল্য পায়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে ঠিক এই দর্শনের ওপর।

লেখক: গবেষক ও পলিসি এনালিস্ট

Source: Morshed, M. U. (2025)"The dynamic of state integration: evaluating the mechanics of the National Reconciliation Commission in BNP's 31-point outline" Unpublished Manuscripts, Research Division, Centre For Research In Multidiscipline - CRM.