জুলাইয়ের রক্তিম সূর্য: ১৭ বছরের অন্ধকার ঘুচে বাংলাদেশের বুকে নতুন ভোর
বাংলাদেশের ইতিহাস বরাবরই, শেকল ভাঙার ইতিহাস। আর ২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিলো একটি মহাকাব্যিক গণ-অভ্যুত্থানের উপাখ্যান। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা একদলীয় দুঃশাসন, অপশাসন, আর স্বৈরাচারের অবসানে নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল বাংলাদেশ। দেশের ছাত্র-জনতা তাদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে পতন ঘটিয়েছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ও তার শাসনের।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থান নিশ্চয়ই একদিনে হয়ে যায়নি, কিংবা এর প্রেক্ষাপট ও একদিনেই তৈরি হয়নি, এই গণ-অভ্যুত্থান হুট করে কোনো অলৌকিক ঘটনা ছিল না এটি ছিল ১৭ বছর যাবৎ ধরে জমতে থাকা ক্ষোভ, যন্ত্রণা, হাহাকার এবং নিরবচ্ছিন্ন অবিচারের এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ।
২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে তছনছ করে দেওয়া শুরু করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভ নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা সবকিছুই একে একে দলীয়করণের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ের পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগে সরকার গঠন করে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এর মাত্র ৫০ দিনের মাথায়, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি, পিলখানায় এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। হাসিনার এই ঘটনার ষড়যন্ত্রের পেছনে অন্যতম লক্ষ্য ছিল দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান শক্তি সেনাবাহিনীকে মনস্তাত্ত্বিক ও নেতৃত্বগতভাবে দুর্বল করে দেওয়া। শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের শুরুটাই হয়েছিল এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির মাধ্যমে, এবং এর পিছনে একটি কারণ ছিল সেনাবাহিনী যেন পরবর্তীতে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বা ক্ষমতার ভারসাম্যে ভূমিকা রাখতে না পারে, সেই বার্তা দেওয়া।
২০১৪ সালের একতরফা 'বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার' নির্বাচন ছিল গণতন্ত্রের কফিনে প্রথম পেরেক। প্রধান বিরোধী দলসমূহ সেই প্রহসনের নির্বাচন বয়কট করলে কোনো ভোট ছাড়াই তথা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ১৫১ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যান। এরপর ২০১৮ সালে আসে তথাকথিত 'রাতের ভোটের' নির্বাচন, যেখানে দিনের আলো ফোটার আগেই ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে রাখা হয়েছিল। আর ২০২৪ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত হয় 'আমি-ডামি নির্বাচন', যেখানে নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচনের এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন তামাশা তৈরি করা হয়। ১৭ বছরে দেশের প্রতিটি নাগরিক তাদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার হারিয়ে এক চরম রাজনৈতিক বন্দিদশায় দিন অতিবাহিত করছিল।
হাসিনা সরকারের ১৭ বছরের দীর্ঘ শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর রচিত হয়েছিল ভয়ের সংস্কৃতির ওপর ভর করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য মতভিন্নতাকারী দলগুলোকে নিশ্চিহ্ন করতে ব্যবহার করা হয় রাষ্ট্রের পুরো শক্তিকে। হাজার হাজার ভুয়া ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জড়িয়ে ফেলা হয় লাখো বিরোধী নেতাকর্মীকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় ছিল রাষ্ট্রীয় মদদে 'গুম' এর ঘটনা। র্যাব, ডিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো। তৈরি হয় আয়না ঘর' এর মতো গোপন বন্দিশালা, যেখানে বছরের পর বছর মানুষকে অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম থেকে শুরু করে শত শত রাজনৈতিক নেতারা এই গুমের শিকার হয়েছেন, সাজেদুল ইসলাম সুমন, সুজন, কাজি ফরহাদের মতন কত শত তরুণ এই গুমের শিকার হয়েছেন, অনেকের লাশ ভেসে উঠেছে নদীতে, আর অনেকের হদিস আজও পর্যন্ত মেলেনি।
একইসঙ্গে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ার এর নামে বিচারিক প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক, খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান জনি এরকম হাজারো ক্রসফায়ার এর ঘটনা আওয়ামী শাসনামলে ঘটেছে। অধিকার, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ একইভাবে "বন্দুকযুদ্ধ" বা "ক্রসফায়ার" এর নামে নিহত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে (২০০৯–২০২৪) পুলিশি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ব্যাপক নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। মানবাধিকার সংস্থা 'আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)' এর তথ্যমতে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে পুলিশ ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে যায়।
ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের তৎকালীন সহ-সভাপতি এবং তেজগাঁও থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন মিলনকে ২০১৮ সালের ৬ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে রাজধানীর মৎস্য ভবন এলাকা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে রমনা থানা ও পরবর্তীতে শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের পুলিশি রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিন দিনের রিমান্ড শেষে অমানুষিক নির্যাতনের কারণে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় ১১ মার্চ মিলনকে আদালতের মাধ্যমে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। পরের দিন ১২ মার্চ সকালে কারাগারে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে কারা কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরকম ঘটনা যেন নিত্যদিনের হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এইদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলতে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ২০১৮ সালে পাস হওয়া 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন' (পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন নামে পরিচিত) মুক্তচিন্তা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বা 'কালো আইন' হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সরকারের সমালোচনা, দুর্নীতির খবর প্রকাশ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাধীন মতামত প্রকাশের কারণে হাজার হাজার মানুষ এই আইনের অধীন ভিক্টিম বা শিকার হয়েছেন। সেন্টার ফর গভার্নেন্স স্টাডিজ (CGS)-এর তথ্যমতে, এই আইনের অধীনে পাঁচ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে, যার অধিকাংশই শাসকদলের নেতাকর্মী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছিল।
করোনা মহামারীর সময় সরকারের গাফিলতি ও দুর্নীতির সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে ২০২০ সালের মে মাসে র্যাব লেখক মুশতাক আহমেদকে গ্রেপ্তার করে। জামিন না দিয়ে ৯ মাস কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দী রাখার পর ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। ‘লাইফ ইন দ্য টাইম অব করোনা’ শীর্ষক কার্টুন এঁকে সরকারের নানা অপকর্ম তুলে ধরার অপরাধে মুশতাক আহমেদের সাথেই ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর। দীর্ঘ ১০ মাস কারাগারে আটক ছিলেন। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে কিশোর প্রকাশ করেন যে, হেফাজতে থাকাকালীন তাঁর ওপর অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, যার ফলে তাঁর কান ও পায়ের স্থায়ী ক্ষতি হয়। ২০২৩ সালে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে স্বাধীনতা দিবসে একটি প্রতিবেদন করায় মাঝরাতে ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় প্রথম আলোর সাংবাদিক শামসকে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দেওয়া হয় তাঁকে। দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদের মুখে পরে অবশ্য তিনি জামিন পান।
২০২০ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে অনলাইনে একটি ওয়েবিনার উপস্থাপনা করার কারণে শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। ওই অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে একজন প্রবাসী সরকারবিরোধী মন্তব্য করেছিলেন এটি ছিলো খাদিজার অপরাধ। ২০২২ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ ১৫ মাস কারাগারে আটকে রাখা হয়। শারীরিক অসুস্থতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চলাকালীন একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে জামিন না দিয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে রাখা এই আইনের চরম অপব্যবহার তুলে ধরে।
রাজনীতি ও গণতন্ত্রের পতনের পাশাপাশি হাসিনা শাসনামলের আরেকটি বড় অভিশাপ ছিল লাগামহীন দুর্নীতি, রেন্ট-সিকিং এবং ব্যাংক ডাকাতি। অবকাঠামোগত উন্নয়নের চমকপ্রদ স্লোগানের আড়ালে গড়ে উঠেছিল সর্বগ্রাসী এক লুটপাটের সিন্ডিকেট। মেগা প্রজেক্টের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ওভার-ইনভয়েসিং বা খরচ বাড়িয়ে আত্মসাৎ করা হয়।
বিদ্যুৎ খাতে 'কুইক রেন্টাল' বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে আইন পাস করে হাজার কোটি টাকা শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও আমলাদের পকেটে চালান করে দেওয়া হয়। দেশের ব্যাংকিং খাতকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ, জালিয়াতি এবং ব্যাংক দখলের ঘটনা প্রতিদিনের সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছিল। পাচার হয়ে যায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে কানাডায় 'বেগমপাড়া', মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম এবং দুবাই-লন্ডনে গড়ে ওঠে বিশাল সম্পদের পাহাড়। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্বে পিষ্ট হচ্ছিল সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন।
১৭ বছরের সংগৃহীত এই ক্ষোভ ও অসন্তোষের বারুদ মানুষের মনে মনে জমা হচ্ছিল নিঃশব্দে। প্রয়োজন ছিল কেবল একটি স্ফুলিঙ্গের। ২০২৪ সালের জুনের শেষদিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলে সেই স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতির সংস্কার চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন রাজপথে নেমে আসে, সরকার বরাবরের মতোই তাদের ঐতিহ্যগত অহংকার ও দমন নীতি বেছে নেয়। ২০২৪ এর ৭ই জানুয়ারির আমি-ডামি নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় সরকারের একটা বৈষম্যমুলক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিলো কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয় এর হাজার হাজার শিক্ষার্থীরা।
অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য এবং শিক্ষার্থীদের 'রাজাকারের নাতিপুতি' হিসেবে আখ্যা দেওয়া আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সরকারের পেটুয়া বাহিনী 'ছাত্রলীগ' এবং পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে সশস্ত্র হামলা চালায়। কিন্তু এবার হিসাব বদলে যায়; সাধারণ শিক্ষার্থীরা রক্ত দেখে পিছু হটেনি, বরং রাজপথেই বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়।
১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের বন্দুকের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে যান। বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের সেই গুলিবিদ্ধ দেহের দৃশ্য দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। সাঈদের রক্তে আন্দোলন রূপ নেয় এক সর্বাত্মক গণ-অভ্যুত্থানে। চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরামের “চলে আসুন ষোলশহর” এই ফেসবুক স্ট্যাটাসের পরে তার গুলিবিদ্ধ হয়ে নিথর দেহ ও আন্দোলনে অন্য মাত্রা যোগ করে।
আবু সাঈদ ওয়াসিমদের মৃত্যুর পর সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার উত্তরায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি বিতরণ করতে করতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। কলেজছাত্র ফারহান ফাইয়াজ শহীদ হন ধানমন্ডি এলাকায়। প্রতিটি শহিদ হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের প্রতীক। শিশু, কিশোর, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, শ্রমিক, শিক্ষক, আইনজীবী এবং সাধারণ অভিভাবকরা নেমে আসেন রাজপথে।
সরকার তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নির্বিচারে গুলি চালায়। হেলিকপ্টার থেকে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল এবং প্রাণঘাতী বুলেট ব্যবহার করা হয়। শতাধিক প্রাণ ঝরে পড়ে কয়েক দিনের ব্যবধানে, আহত হয় হাজার হাজার মানুষ। কারফিউ জারি, ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে গণহত্যা ঢাকার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতা ততক্ষণে মৃত্যুর ভয়কে জয় করে ফেলেছিল। হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি চালানোর সময় শিশু রিয়া গোপ মারা যাওয়ার ঘটনা মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়।
কোটা সংস্কারের দাবি ততদিনে রূপ নেয় এক দফা দাবিতে 'স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পদত্যাগ'। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আহ্বানে ৪ আগস্ট সারা দেশে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আর ৫ আগস্টের 'লং মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচিতে হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ ঢাকার রাজপথ অভিমুখে যাত্রা করে। গণভবনের দিকে ধেয়ে আসা কোটি জনতার প্রবল স্রোত ও সেনাবাহিনীর অনড় অবস্থান দেখে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে শেষ হয় দীর্ঘ ১৭ বছরের এক অন্ধকার ও দুঃস্বপ্নের অধ্যায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এর দিনটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাওয়া। যে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক বিচার প্রতিষ্ঠা।
জুলাই.২০২৪ এর পরে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেছে, এই গণতান্ত্রিক সরকারের সামনে এখন ১৭ বছরের অপশাসন, গুম, খুন এবং দুর্নীতির ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন এক বাংলাদেশকে গড়ে তোলার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
জুলাইয়ের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো স্বৈরাচারই চিরস্থায়ী নয় এবং জনরোষের সামনে পৃথিবীর কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি টিকতে পারে না। এই গণ-অভ্যুত্থান যে বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়েছে যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য, থাকবে না কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন, আর বজায় থাকবে আইনের শাসন ও পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার সেই পথেই এগিয়ে যাবে আগামীর বাংলাদেশ।
লেখক: শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা বিভাগ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদল