৩০ জুলাই ২০২৬, ১৮:৪০

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবেন না

প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম  © টিডিসি ফটো

বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করছে, যেখানে আইনের শাসন থাকবে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, দুর্নীতিবাজরা শাস্তি পাবে এবং সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই ন্যায়বিচার লাভ করবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর সরকারের প্রথম দিকের কিছু উদ্যোগও মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- একজন প্রধানমন্ত্রী যতই আন্তরিক, জনপ্রিয় কিংবা শক্তিশালী হোন না কেন, তিনি একা একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা বদলে দিতে পারেন না।

তারেক রহমান এমন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, যখন বাংলাদেশের সামনে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক- তিন ধরনের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নির্বাচনের পর তিনি নিজেই অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর শাসন নিশ্চিত করা।

সরকারের প্রথম ১০০ দিনের প্রকাশিত বিবরণে কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, বিচারিক নথি ডিজিটাইজেশন, ই-বেইল বন্ড এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ক্ষুদ্র কৃষক ও বর্গাচাষীদের ভর্তুকি, ঋণ, বীজ, সার, বিমা এবং বাজারসংক্রান্ত তথ্য সরাসরি দেওয়ার পরিকল্পনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রয়টার্সের তথ্য অনুসারে, প্রাথমিকভাবে ২২ হাজারের বেশি কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে প্রায় ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষকের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে কর্মসূচির ঘোষণা আর কার্যকর বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। বাস্তবায়নের পথে যদি দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ, মধ্যস্বত্বভোগী এবং প্রশাসনিক জটিলতা থেকে যায়, তাহলে ভালো উদ্যোগও মানুষের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রতিবেদনে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আহরণ, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধিকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে যে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য কেবল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যথেষ্ট নয়।

অর্থমন্ত্রীকে গ্রহণযোগ্য নীতি প্রণয়ন করতে হবে; বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক চাপের বাইরে থেকে ব্যাংক খাত তদারক করতে হবে; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে করব্যবস্থা সহজ ও ন্যায়সংগত করতে হবে; আর ব্যবসায়ী সমাজকে মজুতদারি, সিন্ডিকেট ও কর ফাঁকির সংস্কৃতি পরিত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দ্রুত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও সরকার একা সফল হতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় না হলে শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতা এবং চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যকার ব্যবধান আরও বাড়বে। তাই চাকরি সৃষ্টি শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়; এটি শিক্ষা, শিল্প, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগনীতির একটি সম্মিলিত প্রকল্প।
বাংলাদেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন- প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের পাশাপাশি মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক কর্মী, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়