বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এগোতে পারে
বর্তমান বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাংকিং শুধু মর্যাদা, পরিচিতি বা প্রচারের বিষয় নয়। এর মাধ্যমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সংযোগ, সুশাসন এবং সামাজিক অবদানের একটি সামগ্রিক চিত্র প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে একটি দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সক্ষমতা সম্পর্কেও আন্তর্জাতিক পরিসরে ধারণা তৈরি হয়।
বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান উন্নত করছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও বিষয়টি এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণ মানে শুধু একটি আবেদনপত্র পূরণ বা নির্দিষ্ট সময়ে কিছু তথ্য জমা দেওয়া নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিংয়ে ভালো করতে চাইলে প্রথম কাজ র্যাংকিং সংস্থার ফরম সংগ্রহ করা নয়। আগে প্রতিষ্ঠানকে নিজের বর্তমান সক্ষমতা, দুর্বলতা, গবেষণার অবস্থা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। এরপর প্রতিষ্ঠানের ধরন, বয়স, শিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক উপস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপযুক্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
সব আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের উদ্দেশ্য ও মূল্যায়নপদ্ধতি এক নয়। QS World University Rankings অ্যাকাডেমিক সুনাম, নিয়োগদাতাদের মূল্যায়ন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত, গবেষণার উদ্ধৃতি, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, গবেষণা নেটওয়ার্ক এবং টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনা করে।
QS Asia Region Rankings আঞ্চলিক বাস্তবতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি একটি বাস্তবসম্মত মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য হতে পারে। তবে QS Asia র্যাংকিংয়ে প্রবেশ স্বয়ংক্রিয় নয়। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম, স্নাতক ব্যাচ, অ্যাকাডেমিক সুনাম এবং Scopus এ সূচিভুক্ত গবেষণা প্রকাশনার মতো বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
Times Higher Education World University Rankings মূলত গবেষণানির্ভর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার পরিবেশ, গবেষণার গুণমান, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সম্পর্ক মূল্যায়ন করে। এই র্যাংকিংয়ে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পর্যাপ্তসংখ্যক গবেষণা প্রকাশনার শর্ত পূরণ করতে হয়। তাই শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যা জমা দিলেই এতে স্থান পাওয়া সম্ভব নয়।
আগে THE Impact Rankings নামে পরিচিত ব্যবস্থাটি বর্তমানে Sustainability Impact Ratings নামে নতুন কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ভিত্তিতে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, নীতি, অংশীদারত্ব এবং সামাজিক অবদান মূল্যায়ন করা হয়।
বাংলাদেশের যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এখনো বিপুল গবেষণা প্রকাশনার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু সামাজিক উন্নয়ন, পরিবেশ, নারী উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শিল্প সহযোগিতা কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করছে, তাদের জন্য এই মূল্যায়ন একটি সম্ভাবনাময় প্রাথমিক ক্ষেত্র হতে পারে। তবে কার্যক্রম পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি কাজের পক্ষে নীতি, প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান, ওয়েব তথ্য এবং বাস্তব ফলাফলের প্রমাণ থাকতে হবে।
Academic Ranking of World Universities বা ARWU উচ্চপর্যায়ের গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক গবেষণা উৎকর্ষকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নোবেল পুরস্কার ও ফিল্ডস মেডেলপ্রাপ্ত শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অত্যন্ত উদ্ধৃত গবেষক, Nature ও Science সাময়িকীতে প্রকাশনা এবং Web of Science এ সূচিভুক্ত গবেষণাপত্রের মতো সূচক এতে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শুরুতেই ARWU লক্ষ্য করা বাস্তবসম্মত নয়। শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো, উচ্চমানের গবেষক, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব তৈরি হওয়ার পর এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হতে পারে।
সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই র্যাংকিং লক্ষ্য গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত নয়। একটি নতুন বা শিক্ষাকেন্দ্রিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি পুরোনো গবেষণানির্ভর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামর্থ্য, গবেষণা উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি এক নয়।
লক্ষ্য নির্ধারণের আগে বিশ্ববিদ্যালয়কে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত শিক্ষাকেন্দ্রিক, নাকি গবেষণানির্ভর? কত বছর ধরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করছে? Scopus বা Web of Science এ সূচিভুক্ত গবেষণার পরিমাণ কত? সামাজিক ও টেকসই উন্নয়নে প্রমাণযোগ্য কাজ রয়েছে কি না? আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা কতটা সক্রিয়? শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্নাতকদের তথ্য নির্ভরযোগ্যভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে কি না?
এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমে QS Asia, QS Subject Rankings, THE Sustainability Impact Ratings অথবা অন্য কোনো আঞ্চলিক ও বিষয়ভিত্তিক র্যাংকিংকে লক্ষ্য করতে পারে। গবেষণা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সুনাম বাড়লে পরে QS World বা THE World University Rankings এর দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।
র্যাংকিং প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও র্যাংকিং সেল গঠন। ছোট বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দায়িত্ব একই সেলের অধীনে রাখা যেতে পারে। বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা, মাননিয়ন্ত্রণ, র্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জন্য পৃথক ইউনিট থাকা বেশি কার্যকর।
এই সেলের কাজ শুধু র্যাংকিংয়ের তথ্য জমা দেওয়া নয়। এর দায়িত্ব হবে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই, গবেষণা প্রকাশনা পর্যবেক্ষণ, উদ্ধৃতি বিশ্লেষণ, শিক্ষক পরিচিতি হালনাগাদ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখা।
বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, বরং একই তথ্যের একাধিক সংস্করণ। রেজিস্ট্রার দপ্তর, মানবসম্পদ বিভাগ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর এবং ওয়েবসাইটে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক সময় এক থাকে না। কোথাও মোট ভর্তি শিক্ষার্থী দেখানো হয়, কোথাও সক্রিয় শিক্ষার্থী, আবার কোথাও পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ব্যবহার করা হয়।
র্যাংকিং সংস্থায় তথ্য জমা দেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষণা প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, বিদেশি শিক্ষক, গবেষণা আয়, শিল্প সহযোগিতা, পেটেন্ট, কর্মসংস্থান এবং স্নাতকদের তথ্য এক জায়গায় সংগঠিত করতে হবে।
প্রতিটি তথ্যের সুস্পষ্ট সংজ্ঞাও থাকতে হবে। পূর্ণকালীন শিক্ষক বলতে কাকে বোঝানো হবে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কোন তারিখ অনুযায়ী গণনা করা হবে এবং পূর্ণকালীন সমতুল্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হিসাব কীভাবে হবে, তা লিখিতভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত তথ্যের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর, সময়কাল, অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং সমর্থনকারী নথি যুক্ত থাকতে হবে। ওয়েবসাইট, বার্ষিক প্রতিবেদন ও র্যাংকিংয়ে জমা দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত শিক্ষার পরিবেশ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাধারণভাবে কম অনুপাত শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত নির্দেশনা, গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের বেশি সুযোগ নির্দেশ করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট একটি অনুপাতকে সব বিশ্ববিদ্যালয় ও সব বিষয়ের জন্য সমানভাবে ভালো বা খারাপ বলা যুক্তিযুক্ত নয়।
চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষাদান পদ্ধতি এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য শুধু অনুপাত কম দেখানো হওয়া উচিত নয়। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক ধরে রাখা, গবেষণা তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে গবেষণার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তবে শুধু গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়ালেই ভালো অবস্থান নিশ্চিত হয় না। গবেষণার গুণমান, আন্তর্জাতিক প্রভাব, উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক সহলেখক, বিষয়ভিত্তিক গবেষণা এবং শিক্ষকসংখ্যার তুলনায় গবেষণা উৎপাদন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজের গবেষণার অগ্রাধিকার ক্ষেত্র নির্ধারণ করতে হবে। সব বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে অল্প গবেষণা করার পরিবর্তে কয়েকটি শক্তিশালী ক্ষেত্রে গবেষণা দল, পরীক্ষাগার, তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলা বেশি কার্যকর হতে পারে।
শিক্ষকদের নাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এবং বিভাগীয় পরিচিতি সব গবেষণাপত্রে একইভাবে লেখা প্রয়োজন। বানান ও পরিচিতির ভিন্নতার কারণে Scopus বা Web of Science এ একই গবেষকের প্রকাশনা একাধিক পরিচয়ের অধীনে বিভক্ত হতে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত গবেষণা উৎপাদন ও উদ্ধৃতি যথাযথভাবে দৃশ্যমান হয় না।
প্রতিটি শিক্ষকের ORCID এবং Scopus Author ID নিয়মিত যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে নিম্নমানের ও সন্দেহজনক সাময়িকীতে প্রকাশনা নিরুৎসাহিত করতে হবে। গবেষণার সংখ্যা বাড়ানোর নামে মান ও নৈতিকতার সঙ্গে আপোশ করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ভাণ্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দৃশ্যমানতা বাড়াতে পারে। এখানে গবেষণাপত্র, থিসিস, গবেষণা প্রতিবেদন, সম্মেলনপত্র, বইয়ের অধ্যায় এবং শিক্ষক পরিচিতি সংরক্ষণ করা যায়। তবে শুধু একটি ভান্ডার চালু করলেই হবে না। সঠিক metadata, DOI, লেখকের পরিচিতি, বিভাগ, প্রকাশনার বছর এবং নিয়মিত সংরক্ষণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটও আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও তথ্য যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। QS World বা THE World University Rankings এ সাধারণ ওয়েবসাইট নকশা সরাসরি আলাদা সূচক না হলেও একটি নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট গবেষণা দৃশ্যমানতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
প্রতিটি শিক্ষকের পরিচিতিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণার ক্ষেত্র, নির্বাচিত প্রকাশনা, ORCID, Scopus পরিচিতি এবং গবেষণা প্রকল্পের তথ্য থাকা উচিত। চাকরি ছেড়ে যাওয়া বা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে সক্রিয় শিক্ষক হিসেবে দেখানো অনুচিত। একই শিক্ষককে একাধিক বিভাগে পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
আন্তর্জাতিকীকরণ মানে শুধু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নয়। অধিকাংশ সমঝোতা স্মারক যদি বাস্তব কার্যক্রমে রূপ না নেয়, তাহলে তার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য সীমিত থাকে।
সক্রিয় আন্তর্জাতিকীকরণের মধ্যে যৌথ গবেষণাপত্র, গবেষণা অনুদান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ সম্মেলন, দ্বৈত ডিগ্রি, visiting faculty এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করলে তাদের ভিসা, আবাসন, পরামর্শ, স্বাস্থ্যসেবা এবং অ্যাকাডেমিক অভিযোজনের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
স্নাতকদের কর্মসংস্থান ও নিয়োগদাতাদের মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়মিত graduate tracer study পরিচালনা করতে হবে। স্নাতকেরা কোথায় কাজ করছেন, চাকরি পেতে কত সময় লাগছে, কোন খাতে যাচ্ছেন এবং নিয়োগদাতারা তাদের দক্ষতা সম্পর্কে কী ভাবছেন, তা জানা প্রয়োজন।
শুধু বছরে একটি চাকরি মেলা আয়োজন যথেষ্ট নয়। পাঠ্যক্রম উন্নয়নে শিল্পখাতের মতামত, internship, career counselling, mock interview, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং alumni network গড়ে তোলা প্রয়োজন।
টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বৃত্তি, নারী উন্নয়ন, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রশিক্ষণে কাজ করছে। কিন্তু এসব কার্যক্রমের বড় অংশ নিয়মিত নথিভুক্ত হয় না।
প্রতিটি কার্যক্রম কোন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত, কতজন উপকারভোগী ছিল, কী ফলাফল পাওয়া গেছে এবং কোন নীতির অধীনে কাজটি হয়েছে, তা সংরক্ষণ করতে হবে। কয়েকটি ছবি বা সংবাদ প্রতিবেদন যথেষ্ট নয়। কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও ফলাফলের প্রমাণ প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন থেকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।
প্রথম বছরে বর্তমান অবস্থা নির্ণয়, লক্ষ্য নির্বাচন, তথ্য যাচাই, শিক্ষক পরিচিতি হালনাগাদ, কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার এবং ওয়েবসাইট উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
দ্বিতীয় বছরে গবেষণার গুণমান, গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক সহলেখক, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ভাণ্ডার, শিল্প সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রমাণ উন্নয়ন করতে হবে।
তৃতীয় বছরে গবেষণার উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, স্নাতকদের কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং সক্রিয় বিনিময় কর্মসূচির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এরপর নির্বাচিত র্যাংকিংয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য জমা দেওয়া যেতে পারে।
চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে র্যাংকিং ফলাফল ও সূচকভিত্তিক দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে। শুধু সামগ্রিক অবস্থানের দিকে তাকালে হবে না। কোন সূচকে প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে আছে এবং কোন বিনিয়োগ কার্যকর ফল দিচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
র্যাংকিংয়ের জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটও এক হবে না। প্রতিষ্ঠানের আকার, প্রযুক্তি, শিক্ষকসংখ্যা, গবেষণা সক্ষমতা এবং নির্বাচিত লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারিত হবে। র্যাংকিং সেলের জনবল, তথ্যব্যবস্থা, গবেষণা ভাণ্ডার, ওয়েবসাইট, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা তহবিল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও তথ্য নিরীক্ষায় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তবে র্যাংকিংয়ে তথ্য জমা দেওয়ার ব্যয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সক্ষমতা উন্নয়নের ব্যয়কে এক করে দেখা উচিত নয়। কিছু র্যাংকিংয়ে সরাসরি তথ্য জমাদানের ফি না থাকলেও গবেষণা, তথ্যব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রম গড়ে তুলতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন।
র্যাংকিংয়ে উন্নতির জন্য নৈতিকতার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অকার্যকর আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্মারক, কাগুজে বিদেশি শিক্ষক, একই শিক্ষককে একাধিক বিভাগে দেখানো, সন্দেহজনক গবেষণা প্রকাশনা, কৃত্রিম উদ্ধৃতি বৃদ্ধি এবং প্রমাণহীন সামাজিক কার্যক্রম কোনো বৈধ কৌশল নয়।
র্যাংকিংকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান উদ্দেশ্য না বানিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ফল হিসেবে দেখা উচিত। শিক্ষা, গবেষণা, তথ্যের স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সামাজিক দায়িত্বে প্রকৃত উন্নতি হলে র্যাংকিংয়েও তার প্রতিফলন ঘটবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য বিচ্ছিন্ন কিছু কার্যক্রম বা একবারের তথ্য জমাদান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক লক্ষ্য, নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা, মানসম্পন্ন গবেষণা, যোগ্য শিক্ষক, সক্রিয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী শিল্পসংযোগ এবং প্রমাণযোগ্য সামাজিক অবদান।
এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আন্তর্জাতিক র্যাংকিং শুধু একটি তালিকায় অবস্থান অর্জনের মাধ্যম হবে না। এটি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও স্বচ্ছ, গবেষণামুখী, আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত এবং শিক্ষার্থীবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কার্যকর পথ হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: প্রফেসর আবুল কালাম, ডিন, স্কুল অব বিজনেস, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি