ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সূতিকাগার
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের নিজস্ব ইতিহাস ও বিকাশ এই ভূখণ্ডের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই বিরল ও অনন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাম। ১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল একটি প্রথাগত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার যাত্রা শুরু করেনি; বরং এটি হয়ে উঠেছিল বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং স্বাধীনতার দীর্ঘ সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক সূতিকাগার। ফলশ্রুতিতে, প্রতি বছরের ১ জুলাই শুধু একটি বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ স্মারক দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পেছনে কাজ করেছিল তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এক উত্তাল ও জটিল প্রেক্ষাপট। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং পরবর্তীকালে ১৯১১ সালে তীব্র বিরোধিতার মুখে সেই বঙ্গভঙ্গ রদ করার সিদ্ধান্ত এই অঞ্চলের মুসলিম সমাজসহ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মাঝে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করে। এই রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ এবং পূর্ব বাংলার মানুষের উচ্চশিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নাথান কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এই অনন্য আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সূচনা লগ্ন থেকেই এটি পূর্ব বাংলার অনগ্রসর ও শোষিত সমাজব্যবস্থার মধ্যে একটি শক্তিশালী ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠনে প্রধানতম ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে এই সুশিক্ষিত ও সচেতন মধ্যবিত্ত সমাজই দেশের জাতীয় রাজনীতি, সিভিল প্রশাসন, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান চালিকাশক্তি বা মূল নিয়ামক হয়ে ওঠে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাধারণ মূল উদ্দেশ্য থাকে উচ্চশিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার প্রসার ঘটানো। কিন্তু বাংলার দীর্ঘ ইতিহাস প্রমাণ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কখনোই শুধু চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এখানকার মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষক, গবেষক এবং অকুতোভয় শিক্ষার্থীরা বারবার দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটময় মুহূর্তে রাজপথে নেমে এসেছেন এবং জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের উত্তর-পরবর্তী গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা- প্রতিটি যুগান্তকারী অধ্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের রক্তঝরা ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সবার প্রথমে এবং গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল, তার মূল কেন্দ্র ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে যে অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ করেছিল, তা কেবল একটি ভাষার অধিকারকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করেনি; বরং তা বাঙালির মনে স্বাধিকার ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতির চেতনা জাগ্রত করেছিল। এখানকার প্রগতিশীল শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজ ভাষার সাংস্কৃতিক অধিকারকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অধিকারে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই আন্দোলনের গর্ভ থেকেই মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি সুসংহত রূপ গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীকালে আমাদের স্বাধীনতার মূল আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
ভাষা আন্দোলনের পর থেকে ১৯৭১ সালের চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্যবর্তী সময়ে প্রতিটি গণআন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৬২ সালের বৈষম্যমূলক শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ 'ছয় দফা আন্দোলন' এবং পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ১৯৬৯ সালের ছাত্র-জনতার সেই তীব্র গণআন্দোলন তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের শাসনের ভিত্তিকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং আমাদের চূড়ান্ত স্বাধীনতার সংগ্রামকে তরান্বিত ও সুগম করেছিল। এই আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ নিজেদের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে প্রমাণ করেছিল।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অন্যতম প্রধান ও নির্মম লক্ষ্যবস্তু। কারণ তারা জানত, এই বিশ্ববিদ্যালয়ই হলো বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক শক্তির মূল উৎস। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাতে 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, শিক্ষক কোয়ার্টার এবং কর্মচারীদের আবাসে ইতিহাসের বর্বরোত্তম ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড চালায়। ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. গোবিন্দচন্দ্র দেবসহ বহু খ্যাতিমান শিক্ষক, শত শত শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সেই রাতে এবং পরবর্তী সময়ে দেশের জন্য শহীদ হন। এই মহান ও অপূরণীয় আত্মত্যাগ প্রমাণ করে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞানচর্চার একটি বিদ্যাপীঠ নয়; এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ আত্মোৎসর্গের এক পরম প্রতীক।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের যেকোনো অন্যায় ও অপশাসনের বিরুদ্ধে তার বজ্রকণ্ঠ জারি রাখে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এই প্রতিষ্ঠানটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা রাজপথে নেমে এসে স্বৈরাচারী সরকারের পতন নিশ্চিত করেছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা সংস্কার, নাগরিক অধিকার রক্ষা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিটি সংগ্রামে এখানকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমাজ সবসময় সোচ্চার থেকেছেন। যদিও প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে হতে পারে, তবুও সামগ্রিকভাবে এটি দেশের মুক্তমত প্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চেতনার এক অনন্য উন্মুক্ত পরিসর হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় ও সুদূরপ্রসারী অবদান হলো দেশের জন্য যোগ্য এবং দূরদর্শী জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলা। জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি এমন সব মেধার জন্ম দিয়েছে যারা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের চাকা সচল রেখেছেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রধান বিচারপতি, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, দক্ষ কূটনীতিক, আমলা, বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং কালজয়ী কবি ও সাহিত্যিকগণ এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই আঙিনায় গড়ে উঠেছেন। দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দও সবসময় স্বীকার করেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই হলো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কাঠামোর মূল উৎপাদন ক্ষেত্র। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে সমাজ পরিবর্তনের প্রতিটি স্তরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অবদান ও চিরন্তন উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাস ও মেধার বিস্তার কেবল বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই বের হয়ে এসেছেন অসংখ্য গুণী মানুষ, যারা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু, যিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালীন সময়ে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের মতো যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রবর্তন করে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কবি জসীম উদদীন, অধ্যাপক ও নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, বিশিষ্ট সাহিত্যসমালোচক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম ও অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান রূপকার ও কবি বুদ্ধদেব বসুর মতো কালজয়ী আরো অনেক ব্যক্তি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনাকে ধন্য করেছেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদানের পাশাপাশি শিক্ষা, মৌলিক গবেষণা এবং জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এর বিভিন্ন অনুষদ, বিভাগ, বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্র এবং ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে মানবিক, সামাজিক বিজ্ঞান, ফলিত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসায় শিক্ষা এবং আন্তঃবিষয়ক গবেষণায় এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অবদান রেখে চলেছে। বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গবেষণা, জাতীয় অভিধান প্রণয়ন, প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য সম্পাদনা, উন্নত ভাষাতাত্ত্বিক কাজ এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সূচনা এই ক্যাম্পাস থেকেই হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা সূচক ও বৈশ্বিক র্যাংকিংয়েও এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অগ্রগতির ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এর অবস্থান আগের চেয়ে সংহত ও উন্নত হয়েছে। তবে বিশ্বমানের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি করা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি বাড়ানো এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত গবেষণাগার গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান ছিল এক নতুন ও অভূতপূর্ব মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরে যে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল, তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চরম দমনপীড়নের মুখে তা দ্রুতই একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ই আগস্টের সেই ঐতিহাসিক 'মনসুন রেভল্যুশন' বা মৌসুমি বিপ্লবের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্তের সূচনা হয়। এই আন্দোলনের ফসল হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত অবাধ ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই নতুন বাংলাদেশে ‘‘সরকার প্রধান’’ হিসেবে অভিষিক্ত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর, ২০২৬ সালের ১২ই মে তিনি প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উদ্যোগে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত "ট্রান্সফরমিং হায়ার এডুকেশন ইন বাংলাদেশ: রোডম্যাপ টু সাসটেইনেবল এক্সিলেন্স" শীর্ষক দিনব্যাপী একটি উচ্চপর্যায়ের কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। কর্মশালা উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে এক আবেগঘন মতবিনিময় অনুষ্ঠানে মিলিত হন। সেখানে তিনি আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর কথা স্মরণ করেন এবং স্পষ্ট ঘোষণা দেন যে- ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন, উভয় বিপ্লবের অকুতোভয় যোদ্ধারাই দেশের সূর্যসন্তান। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, নতুন এই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে মেধা, মুক্তচিন্তা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে ধারণ করেই একটি বৈষম্যহীন ও আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা হবে, যার কেন্দ্রে থাকবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল চেতনা।
বর্তমান দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে উচ্চশিক্ষার ধারণা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত ভূমিকা সম্পূর্ণ বদলে যাচ্ছে। আধুনিক বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল লার্নিং, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আন্তঃবিষয়ক (Interdisciplinary) গবেষণার এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও কিছু নতুন ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দিতে হলে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা, একাডেমিক স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব জোরদার করা এবং শিল্প-গবেষণা (Industry-Academia) সংযোগকে আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধ এবং সমালোচনামূলক চিন্তার (Critical Thinking) সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখাও সমানভাবে জরুরি।
১ জুলাইয়ের এই তাৎপর্যময় দিনটি তাই শুধুমাত্র একটি প্রাতিষ্ঠানিক জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই বিশেষ দিনটি প্রতি বছর আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে- জ্ঞান, মুক্তচিন্তা, উন্নত গবেষণা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চাই হলো একটি স্বাধীন জাতি গঠনের মূল ভিত্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুদীর্ঘ ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, শিক্ষা কখনো সমাজ বা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়; বরং শিক্ষা, জাতীয় সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় রাজনীতি একে অপরের সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।
এই প্রতিষ্ঠানটিকে শুধুমাত্র একটি চিরাচরিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ঐতিহাসিক গভীরতা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এটি এমন এক অনন্য মহীরুহ, যেখানে জ্ঞানচর্চার সাথে রাজনীতি, সাহিত্যের সাথে সংস্কৃতি, বিজ্ঞানের সাথে সমাজচিন্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের সাথে গণতন্ত্রের চেতনা এক সুদীর্ঘ ও গৌরবময় ঐতিহ্যে মিলিত হয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা, এবং স্বাধীনতা-উত্তর গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার থেকে আজকের আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন- প্রতিটি রূপান্তরের বাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একটি অবিরাম প্রেরণার নাম।
আজকের এই জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে অতীতের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে ভবিষ্যতের আধুনিক জ্ঞান সমাজ নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করাই হোক এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। আর প্রতিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে আমাদের মূল অঙ্গীকার হওয়া উচিত- এই প্রিয় বিদ্যাপীঠ যেন চিরকাল বাংলাদেশের জ্ঞান, মানবিকতা, প্রগতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এক অপরাজেয় আলোকবর্তিকা হয়ে সগৌরবে টিকে থাকে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়