২৫ জুন ২০২৬, ২১:৫৮

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা: একটি বৈশ্বিক সংকট

এম এ মতিন  © টিডিসি ফটো

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের একটি ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত বিষয়। এটি একটি নীরব মহামারী, যা প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের লক্ষ লক্ষ শিশুর জীবন অকালে বিনষ্ট করে। এর সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণ হচ্ছে – অতিসম্প্রতি বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার অন্যতন জনবহুল এলাকা মিরপুরের পল্লবীর একটি বহুতল বাড়িতে আট বছর বয়সী দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী রামিসা (৮) পাশের ফ্লাটের অধিবাসী জনৈক সোহেল (৩৮) তদীয় স্ত্রীর সহায়তায় নির্মমভাবে ধর্ষিত হয় এবং অমানুষিভাবে তাকে হত্যা করে মরদেহ দ্বিখন্ডিত করে লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়। অবশ্য দ্রুত বিচারে অপরাধী স্বামী-স্ত্রী দুইজনের ফাসির রায় হয়েছে।

 শুধু রামিসা নয়। রামিসা ঘটনা ও মামলার বাইরেও, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের সামগ্রিক চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নিখোঁজের পর এক ৭ বছর বয়সী শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে (২০২৬-০৬-১৬) । রামিসা হত্যার পর সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাজশাহীর দুর্গাপুরে ৪ বছর বয়সী একটি শিশু, সিলেট, ঠাকুরগাঁও এবং মুন্সীগঞ্জে কয়েকজন শিশুর বিরুদ্ধে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। প্রথম আলোয় ১৭ জুন, ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় ৫ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে।· ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, ৪ যুবক শিশুটিকে ‘কদম ফুল দিতে নিয়ে যাওয়ার’ কথা বলে ডেকে নিয়ে যায়। পরে তাকে কংস নদের পাড়ে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে, তাকে জীবিত অবস্থায় কংস নদীতে চুবিয়ে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ নদীর তলদেশে কাদার মধ্যে পুঁতে ফেলা হয়। বাংলাদেশের সর্বশেষ? শিশু ধর্ষণের যে খবর বেরিয়েছে তাহলো ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার চিকনা গ্রামে মসজিদের ইমাম কতৃক ৫ বছরের মেয়েকে ক্রমাগত ধর্ষণের লোমহর্ষক ঘটনা (২০-০৬-২৬)।

শিশু ও নারী নির্যাতন বাংলাদেশে একটি প্রকট সমস্যা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ১২৪ জন শিশু খুন হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৩৫ টি মামলায় চার্জ গঠন করা হয়েছে এবং মাত্র ২টিতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের বিচার দ্রুত করায় এই ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি বিদ্যমান সমস্যা মোকাবেলায় একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস। "স্টেট অফ চাইল্ড রাইটস ২০২৫" শীর্ষক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত শিশুদের নিয়ে প্রকাশিত ১,৮৬৭টি নেতিবাচক সংবাদের মধ্যে ৬২.৬৬ শতাংশই ছিল ধর্ষণ ও হত্যা সংক্রান্ত।· ন্যাশনাল গার্ল চাইল্ড অ্যাডভোকেসি ফোরামের (এনজিসিএএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে কমপক্ষে ৩৯০ জন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ৮৩ জন মেয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ১০৪ টি শিশুর আত্মহত্যারও খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা ঢাকা বিভাগে শিশু অপরাধ ও দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে বেশি। এই বিভাগে ২৮৪টি শিশু আহত ও ২৯৮টি শিশু নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ২৮% পুরুষ শৈশবে যৌন সহিংসতার শিকার হয়।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিসংখ্যান

শিশু যৌন নির্যাতন ও তৎপরবর্তী হত্যা ও লাশ গুমজনিত অপরাধ শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। ইউনিসেফে’র ‘শিশুদের বৈশ্বিক অবস্থা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৩৭০ মিলিয়নেরও বেশি মেয়ে ও নারী—যা প্রতি ৮ জনে ১ জন, ১৮ বছর বয়সের আগে ধর্ষণ বা যৌন হামলার শিকার হয়েছে। অনলাইন বা মৌখিক নির্যাতনের মতো ‘অ-শারীরিক’ যৌন সহিংসতা যোগ করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫০ মিলিয়নে, যা প্রতি ৫ জনে ১ জন। ছেলেদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আনুমানিক ২৪০ থেকে ৩১০ মিলিয়ন ছেলে ও পুরুষ — প্রায় প্রতি ১১ জনে ১ জন — শৈশবে ধর্ষণ বা যৌন হামলার শিকার হয়েছে। অধিকাংশ যৌন নির্যাতন ঘটে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘটনা ১০ বছর বয়সের নিচের শিশুদের উপর সংঘটতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হ্য়। আর্থ-সামাজিকভাবে দুর্বল অঞ্চলে এই হার আরও বেশি। সংঘাত ও উদ্বাস্তুজনিত  পরিস্থিতিতে প্রতি ৪ জন মেয়ের মধ্যে ১ জন শৈশবে ধর্ষণ বা যৌন হামলার শিকার হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ। সাব-সাহারান আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী ধর্ষণের  শিকার (৭৯ মিলিয়ন), তারপরেই রয়েছে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া (৭৫ মিলিয়ন)।

 ধর্ষণ ও হত্যার কারণ

গার্হস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক কারণঃ ফিলিপাইনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দারিদ্র্য অনেক ক্ষেত্রেই এই অপরাধের সাথে জড়িত হওয়ার প্রধান কারণ। অভিভাবক বা আত্মীয়রা অর্থের লোভে শিশুদের অনলাইনে যৌন কাজে বাধ্য করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধী শিশুর পরিচিত কেউ—পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, শিক্ষক, কোচ - এরা শিশুর আস্থা অর্জনের জন্য ‘গ্রুমিং’-এর মতো কৌশল প্রয়োগ করে। এ ছাড়া প্রযুক্তি-সহায়ক যৌন নির্যাতন দ্রুত বাড়ছে। অনলাইনে ৫৪% তরুণ-তরুণী জীবনে অন্তত একবার যৌন ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেন পরিদৃষ্টে প্রতিয়মান হয়। যৌন হয়রানি, ‘সেক্সটরশন’ (যৌন ছবি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল) করা এখন  অতি সাধারণ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

সামাজিক নিয়ম, কলঙ্ক ও সংস্কারের কারণে অনেক গার্জিয়ান সমাজে শিশু যৌন নির্যাতনকে ‘লজ্জা ও অপমানের  বিষয়’ হিসেবে বিবেচনা করেন। সে কারণে অপরাধের শিকার হয়েও অপমান ও কলঙ্কের কারণে স্বীয় সন্তান দুর্দশাগ্রস্ত হলেও তারা সমাজের বা আইনের সাহায্য চাইতে পারেন না। সমাজের দুর্বল আইন ও সুরক্ষা ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা অনেকক্ষেত্রেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।

 শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মনস্তাত্ত্বিক কারণ

অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি ছেলে বা মেয়ের প্রতি যৌনাকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হওয়া কোন  স্বাভাবিক মানুষের পরিচায়ক নয় এবং মানসিকভাবে সুস্থতার লক্ষণও নয়। বরং এটি পেডোফিলিয়া (Pedophilia) নামক একটি মানসিক ব্যাধির ইঙ্গিত, যা আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিভাগ (ICD-11) এবং ডায়াগনস্টিক ম্যানুয়াল (DSM-5)-এ একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে স্বীকৃত। যৌবনে পদার্পণকারী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের পক্ষে নারীদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করা একটি জৈবিক ও প্রজননমূলকভাবে স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এটি প্রকৃতির ধারায় সঙ্গী নির্বাচনের অংশ। কিন্তু অস্বাভাবিক হলো যে, যে শিশুর শরীর এখনো যৌন পরিণতি লাভ করেনি (Pre-pubescent), তার প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করা। কারণ শিশুর শরীর ও মস্তিষ্ক যৌন ক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত নয়; এটি প্রকৃতিগতভাবে ‘অপ্রাকৃতিক’ বলে বিবেচিত। এর পরে আসে মানসিক সুস্থতার বিষয়। কেউ যদি অপ্রাপ্ত, নিষ্পাপ শিশুর প্রতি এমন আকর্ষণ বোধ করে তাহলে ঐ ব্যক্তি প্রথমত মানসিকভাবে অসুস্থ এবং আইনের দৃষ্টিতে অবশ্যই ‘অপরাধী’ বলে বিবেচনা করতে হবে। পেডোফিলিয়া একটি 'প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার' (অস্বাভাবিক যৌন আকর্ষনজনিত ব্যাধি)। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো - কোন সুস্থ বিবেকবান ব্যক্তি যিনি নিজের মধ্যে এই ধরনের অনুভূতি বা আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারেন তখন তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন না, বরং চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। আর অসুস্থ, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত  বিপজ্জনক ব্যক্তি নিজের মধ্যে জাগ্রত এই অস্বাভাবিক ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দিয়ে শিশুর উপর কার্যকরী হিংস্রতা (ধর্ষণ বা হত্যা) চালান। রামিসার ক্ষেত্রে যেমনটি দেখা গেছে, সেখানে ইচ্ছা শুধু ইচ্ছেই থাকেনি, তা নৃশংস অপরাধে রূপ নেয়। অনেক আগেই রামিসা হত্যাকারী সোহেলের চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন ছিল।

 পেডোফিলিয়া বা 'প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার' ব্যক্তি চেনার উপায়

শিশুর প্রতি অত্যধিক আগ্রহ: কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি শিশুদের সঙ্গে অন্য যেকোনো কাজের চেয়ে বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করেন, বিশেষ করে যখন অন্য প্রাপ্তবয়স্করা উপস্থিত নেই, তখন তার প্রতি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

সীমা লঙ্ঘন: শিশুর ব্যক্তিগত জায়গায় প্রবেশ করা, জোর করে কোলে নেওয়া, বা শিশু অপ্রস্তুত হলেও তাকে স্পর্শ করেন – এ ধরনের ব্যক্তি।

বিশেষ পছন্দ: একটি নির্দিষ্ট বয়সী (বিশেষত বয়ঃসন্ধির আগের) শিশুর প্রতি অস্বাভাবিক ঝোঁক এবং সেই শিশুটিকে আলাদা করে বিশেষ উপহার বা মনোযোগ দেন এমন ব্যক্তি।

গোপনীয়তা: শিশুর সঙ্গে একান্তে থাকতে চাওয়া, দরজা বন্ধ করে রাখা, এবং শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা করে নিয়ে যাওয়া – এ ধরনের কার্যে লিপ্ত ব্যক্তি।

অতিরিক্ত আদর বা 'গ্রুমিং' (Grooming):  শিশুকে মিথ্যা কথা বলতে বা গোপন রাখতে শেখানো (যেমন: "এটা আমাদের একটা খেলা, কাউকে বলা যাবে না")।

দ্রুত বন্ধুত্ব করে আস্থা অর্জন: শিশুর পরিবারের সঙ্গে খুব দ্রুত বন্ধুত্ব করে আস্থা অর্জন করা এবং একা পেতে পরিবারকে সাহায্য করার অফার দেওয়া (যেমন: বাচ্চার লেখাপড়া/কোচিং এর দায়িত্ব নেয়া)।

শিশুকে যৌন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা বা অশ্লীল ছবি/ভিডিও দেখানো বা তার সাথে এ জাতীয় আলাপ আলোচনা করা, ইত্যাদি।

সামাজিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ

বাংলাদেশের আইনে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রধান আইনটি হলো "নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০" (২০২৫ সালের সংশোধনীসহ)। এই আইনে বলা হয়েছে - সম্মতির সর্বনিম্ন বয়স ১৬ বছর। কোনো ব্যক্তি যদি ১৬ বছর পূর্ণ হয়নি (অর্থাৎ ১৫ বছর বা তার কম) এমন কোনো শিশুর সাথে, তার সম্মতি থাকলেও, যৌনকর্ম করেন, তাহলে সেটি ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হবে। এই বয়সের নিচে কেউ আইনত সম্মতি দিতে পারে না। ষোল বছরের বেশি কিন্তু ১৮ বছরের কম কোনো নারীর সাথে যদি বিবাহ বন্ধন ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা হয়, তাহলে তা "সম্মতি ব্যতিরেকে" সংঘটিত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং ধর্ষণের আওতায় আসবে। এই আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ১৬ বছরের বেশি বয়সী কোনো নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর শস্তি অনধিক ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। উল্লেখ্য, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এও ১৪ বছরের কম বয়সী কারো সাথে যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-ই এ বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে ভালো লাগা প্রকৃতি ও স্বভাবসম্মত আর শিশুর প্রতি যৌনাকর্ষণ বা কামনা হচ্ছে বিকৃতি। এই বিকৃতি কোনো স্বাভাবিকতার অংশ নয়, বরং তা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা ও আইনি হস্তক্ষেপের দাবী রাখে।  স্বাভাবিক মানুষের পরিচয় হলো "যুক্তি ও নৈতিকতা" দিয়ে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করা। কোনো শিশুর প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ বোধ করলে সুস্থ মানুষ তা দমন করে তার মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত।

 প্রতিরোধের উপায়

শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও হত্যা প্রতিরোধে বহুমাত্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন। প্রথমত শিশুদের ক্ষমতায়ন। ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় - শিশুদের ‘শরীরের স্বায়ত্তশাসন’। এটি অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের শরীরের স্বায়ত্তশাসন বলতে বোঝায় প্রতিটি শিশু তার নিজের শরীরের প্রতিটি অংগের সঠিক নাম জানবে। কে তার শরীর স্পর্শ করতে পারে বা পারবে তা তাকে শেখাতে হবে। একান্ত আপনজন ছাড়া কেউ কোলে নিতে চাইলে বা আদর করে স্পর্শ করতে চাইলে তা গ্রহণ করবে না। এসব আচরণের সময় কীভাবে ‘না’ বলতে হয়—তা শিশুকে শেখাতে হবে। এ বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ জরুরী। ইন্দোনেশিয়ায় পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শিশুদের যৌন নির্যাতন সম্পর্কে জ্ঞান ও সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে পারে। তাই শিশুদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, ডিভাইসের প্রাইভেসি সেটিংস চালু করা এবং অপরিচিতদের সাথে যোগাযোগ সম্পর্কে সতর্ক করা বিষয়ক জ্ঞান ও দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ আমাদের গার্জিয়ানদের দিতে হবে। আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালীকরণ করতে হবে। ফিলিপাইনের মতো অ্যান্টি-অনলাইন চাইল্ড অ্যাবিউজ আইন কার্যকর করা এবং তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা অতীব জরুরী। সচেতনতা বৃদ্ধি শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় কৌশলের মতো ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা দরকার। শিশুদের জন্য বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, অধিকাংশ শিশু নির্যাতনের কথা বলে না বা অনেক দেরিতে বলে। আক্রান্ত শিশুদের সহায়তা: শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাসহ দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

সর্বোপরি শিশু সুরক্ষার জন্যে যথাযথ প্যারেন্টিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পিতামাতাকে জানতে হবে তাদের শিশুকে তারা কিভাবে সুরক্ষা দিবেন। এজন্যে প্যারেন্টিং বিষয়ে তাদের সুশিক্ষিত হতে হবে এবং ব্যবহারিক জীবনে তা কাজে লাগাতে হবে। যে সকল বিষয়ে পিতামাতাকে যত্নশীল হওয়া দরকার সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোঃ  

 অভিভাবকত্বের একটি সুনিত্তদিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন যার লক্ষ্য হবে  শিশুদের মধ্যে নিন্মোল্লিখিত গুণাবলী সৃষ্টি করাঃ

পিতামাতা/গার্জিয়ান ও শিশুদের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনঃ পিতামাতা/গার্জিয়ান ও শিশুদের মধ্যে এমন সম্পর্ক সৃষ্টি করা যাতে তাদের মধ্যে কোনরকম  ব্যবধান না থাকে। যে কোন বিষয়য় মন খুলে শিশু মা-বাবা/গার্জিয়ানকে নির্ভয়ে বলার পরিবেশ সৃষ্টি করা।

অর্জনের আগে চরিত্র গঠনঃ সততা, বিনয়, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণকে পরীক্ষার নম্বর বা মর্যাদার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

 কৌতূহল ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির বিকাশঃ শিশুদের প্রশ্ন করতে, পড়তে, চিন্তা-ভাবনা করতে এবং আত্মবিশ্বাস ও ভদ্রতার সঙ্গে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে উৎসাহিত করা।

 বাস্তব কাজের মাধ্যমে লালন-পালনঃ সেবা, পারিবারিক দায়িত্ব, দানশীলতা, পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নেতৃত্বের শিক্ষা দেওয়া।

 প্রজ্ঞার সঙ্গে ডিজিটাল যুগের পথচলাঃ সুস্থ সীমারেখা নির্ধারণ করে শিশুদের অর্থবহ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল ব্যবহারের দিকে পরিচালিত করা।

 পারিবারিক শৃঙ্খলা থেকে জাতীয় চরিত্র গঠনঃ স্বীকৃতি দেওয়া এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা  যে,  ন্যায়পরায়ণ, দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল পরিবারগুলো যোগ্য নাগরিক এবং শক্তিশালী জাতি গঠনে ভূমিকা রাখে।

শিশুদের নিত্যকার গতিবিধি অনুসরণ করা শিশুরা কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে যাচ্ছে, কার সাথে খেলাধুলা করছে, সময় কাটাচ্ছে – এগুলোর প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখা।

প্রতিবেশী পিতা-মাতা/গার্জিয়ানদের সাথে মত বিনিময় করাঃ প্রতিবেশী শিশুদের খোঁজখবর রাখা। তাদের পিতা-মাতা/গার্জিয়ানদের সাথে শিশুদের লেখাপড়া, আচার আচরণ, ইত্যাদি নিয়ে মত বিনিময় করা। উদ্দেশ্য,   শিশুদের মধ্যে অস্বাভাবিক যৌনাচার বা কারো সাথে অস্বভাবিক মেলামেশার কোন তথ্য পাওয়া যায় কিনা।

 একতাবদ্ধ হয়ে শিশু নির্যাতন মোকাবেলা করাঃ পাড়া, মহল্লা, গ্রামে যদি শিশুর সাথে কারো অস্বাভাবিক কোন আচরণ বা যৌন কর্মাদির কোন অভিযোগ কারো বিরুদ্ধে পাওয়া যায় তাহলে একাকী নয়, সন্মিলিতভাবে এর মোকাবেলা করতে হবে। প্রথমত সামাজিকভাবে এবং দ্বিতীয়ত আইনশৃংখলা রক্ষাকারী কতৃপক্ষের মাধ্যমে।  

উপসংহার

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা একটি জটিল সমস্যা, যার কোনো সহজ সমাধান নেই। তবে বৈশ্বিক পরিসংখ্যান ও গবেষণা থেকে আমরা কিছু পরিষ্কার দিকনির্দেশনা পাই। দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, অনলাইন ঝুঁকি এবং দুর্বল আইনি কাঠামো—এ সবকিছু এর মূল কারণ। প্রতিরোধের জন্য প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ,  যেমন -  শিশু শিক্ষা, অভিভাবক প্রশিক্ষণ, আইন সংস্কার এবং সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তি—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সময় এসেছে নীরবতা ভাঙার এবং শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ার সংকল্প নেওয়ার।

লেখকঃ উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)
ই-মেইলঃ amatin@aub.ac.bd