২৩ জুন ২০২৬, ১৭:৪৮

সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সরকারি চাকরিজীবীদের বদলানো যাচ্ছে না কেন?

ড. মোহাম্মাদ মিজানুর রহমান  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

বাংলাদেশের মানুষ আজ যে অভিযোগটি সবচেয়ে বেশি করে, সেটি কোনো একক ঘটনার নয়; এটি একটি দীর্ঘ রোগের নাম— দুর্নীতি, দুরবস্থা, দালাল নির্ভরতা আর জবাবদিহিতাহীন প্রশাসন। সাম্প্রতিক খবরগুলো এই বাস্তবতাকেই নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। একদিকে দুর্নীতির অভিযোগ জমছে, কিন্তু তদন্ত ও মামলার গতি থমকে আছে। অন্যদিকে প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বহুদিন ধরে শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে ফল খুব কম। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও প্রশাসন সংস্কার কমিশনের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণও বলছে, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ, রাজনৈতিক পক্ষপাত, আর সিদ্ধান্তহীনতা এখনো প্রশাসনের ভেতরে গভীরভাবে রয়ে গেছে। 

সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, জনগণের চোখে সরকারি চাকরি এখন আর ‘সেবা’ নয়; অনেকের কাছে তা ‘ক্ষমতার আসন’। প্রশাসন সংস্কার কমিশনের এক বিশাল অনলাইন জরিপে ৮০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, প্রশাসন সাধারণ মানুষের প্রতি বন্ধুসুলভ নয়, ৬৬ শতাংশ মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীরা নিজেদের শাসকসুলভ আচরণ করেন। ওই জরিপে ৪২ শতাংশ বলেছেন, সেবা পেতে ঘুস ছাড়া উপায় নেই, ৪৬ শতাংশ সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। যখন একটি রাষ্ট্রের নাগরিকরা এমন অভিজ্ঞতা বয়ে বেড়ায়, তখন সেটি কেবল একটি দপ্তরের ব্যর্থতা থাকে না; সেটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবক্ষয়ের দলিল হয়ে ওঠে। 

এই সংকটের একটি বড় কারণ হলো প্রশাসনের রাজনীতিকীকরণ। প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রভাব, পক্ষপাত ও স্বজনপ্রীতির কারণে জনসেবার গতি নষ্ট হয়েছে, কর্মদক্ষতা ও মেধার গুরুত্ব অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে। নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি— অনেক জায়গায় যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য ও তোষামোদ বেশি কাজ করেছে। এর ফলে প্রশাসনের ভেতরে একটি ভুল সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে: আইন মানা নয়, বরং কার ঘনিষ্ঠ হওয়া বেশি লাভজনক—এই ধারণা। এমন ব্যবস্থা থেকে নিরপেক্ষ ও সেবামুখী আমলাতন্ত্র জন্মায় না; জন্মায় ভয়ের, সুবিধার এবং দায় এড়ানোর এক যন্ত্র। 

এখনকার বাস্তবতা আরও উদ্বেগজনক। দুর্নীতির অভিযোগ প্রতিদিন জমছে, কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কার্যত অচল অবস্থায় চলে গেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অভিযোগ হচ্ছে, কমিশনার না থাকায় নতুন অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত অনুমোদন, চার্জশিট দাখিল, সম্পদ জব্দ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা— এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থমকে আছে। যে দেশে দুর্নীতির অভিযোগ জমে, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার চাকা ঘুরে না, সেখানে দুর্নীতি কেবল ব্যক্তি-অসততা নয়; সেটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতা। জনগণ তখন দেখে, শক্তিশালীকে ছোঁয়া যায় না, আর সাধারণ মানুষকে নথি, নোটিশ আর ঘুষের জালে আটকে রাখা যায়। 

সরকারের ভেতর থেকেও স্বীকারোক্তি এসেছে যে বেতন-ভাতা, ব্যয়বৃদ্ধি আর জীবনযাত্রার চাপ সরকারি কর্মচারীদের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমতে পারে— কারণ আর্থিক চাপ কমলে অসৎ প্রবণতা কিছুটা কমে আসতে পারে। কিন্তু এই যুক্তির সমস্যা হলো, এটি অসম্পূর্ণ। কারণ দুর্নীতি কেবল গরিবি বা বেতনের সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতা, তদারকি, শাস্তি, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার সমস্যা। বেতন বাড়ানো দরকার হতে পারে, কিন্তু বেতন বাড়ালেই যদি জবাবদিহি না বাড়ে, তাহলে ঘুষের দামও শুধু একটু বেড়ে যাবে। সুতরাং, বেতন সংস্কার একা সমাধান নয়; সেটি কেবল একটি অংশ। 

টিআইবির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণও একই সতর্কতা দিচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, শাসনব্যবস্থার ঘাটতি, দুরবস্থা এবং পক্ষপাতদুষ্ট প্রভাব এখনো সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। আরও বলা হয়েছে, দুর্নীতি ও অনিয়ম মোকাবিলায় দৃঢ় নীতি-নির্দেশনা এবং ঝুঁকিভিত্তিক কৌশলের অভাব রয়েছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের হাতে সমস্যা চিহ্নিত করার সক্ষমতা আছে, কিন্তু সেটা কাটিয়ে ওঠার দৃঢ়তা ও ধারাবাহিকতা নেই। কাগজে সংস্কার, বাস্তবে স্থবিরতা—এই দ্বৈততা বাংলাদেশে বহুদিনের রোগ। তাই আজকের সমস্যাটি কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তিরও প্রশ্ন। 

আরেকটি কঠিন সত্য হলো, সংস্কার নিয়ে দেশে অনেক কথা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক কিছুই ‘পরিকল্পনায়’ আটকে রয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বহু বড় সংস্কার প্রস্তাব এখনো অনুমোদন বা বাস্তবায়নের সীমা পেরোতে পারেনি; পুলিশ, দুর্নীতি দমন, সংবিধান এবং প্রশাসনিক সংস্কার— সবখানেই অগ্রগতি অসম। অর্থাৎ রাষ্ট্র জানে কী করতে হবে, কিন্তু করছে কম; প্রতিশ্রুতি আছে, কার্যক্রম নেই। এই ব্যবধান যত দীর্ঘ হয়, ততই জনগণের আস্থা কমে, আর আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিহীনতা শক্ত হয়। একসময় মানুষ মনে করতে শুরু করে, পরিবর্তন আসবে না—শুধু মুখ বদলাবে, চরিত্র বদলাবে না। 

এখন প্রশ্ন, সরকারি চাকরিজীবীদের বদলানো যাচ্ছে না কেন? কারণ, শুধু ব্যক্তিকে বদলালে ব্যবস্থা বদলায় না। যদি পদোন্নতি নির্ভর করে আনুগত্যের ওপর, যদি বদলি হয় শাস্তি বা পুরস্কারের হাতিয়ার, যদি সেবাদানের প্রতিটি ধাপে অনিশ্চয়তা ও অস্বচ্ছতা থাকে, তাহলে সবচেয়ে সৎ মানুষও ধীরে ধীরে ব্যবস্থার সঙ্গে আপোশ করতে বাধ্য হয়। দুর্নীতি তখন ‘ব্যক্তিগত দুর্বলতা’ নয়; এটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিকতা’ হয়ে যায়। এই জায়গায় প্রয়োজন কঠোর তিনটি জিনিস: জবাবদিহি, শাস্তি, এবং স্বচ্ছতা। এর কোনোটিই না থাকলে স্লোগান দিয়ে আমলাতন্ত্রের চরিত্র বদলানো যায় না। 
এখনই দরকার সুনির্দিষ্ট সংস্কার। সেবা প্রদানের প্রতিটি ধাপে সময়সীমা বেঁধে দিতে হবে, অনলাইন ট্র্যাকিং বাধ্যতামূলক করতে হবে, ঘুস-অনিয়মের অভিযোগের জন্য স্বাধীন অভিযোগ ব্যবস্থা গড়তে হবে, এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে দুদককে কমিশনার-নির্ভর অচল কাঠামো থেকে বের করে কার্যকর ও দ্রুত সিদ্ধান্তের সক্ষমতা দিতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী সত্যিকারের নজরদারিতে আনতে হবে; নিয়োগ-পদোন্নতিতে মেধা ও সততা মূল্যায়নের ব্যবস্থা কঠোর করতে হবে; আর নাগরিক সেবায় দালালচক্র ভাঙতে হবে। শুধু দপ্তর নয়, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ক্ষমতা ভোগ করার জায়গা নয়; এটি জনগণের আমানত— এই কথাটি প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ফিরিয়ে আনতে হবে। 

বাংলাদেশ আজ যে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে আর নাটকীয় বক্তৃতা যথেষ্ট নয়। মানুষ এখন আর ‘পরিবর্তনের আশ্বাস’ শুনে তৃপ্ত নয়; তারা চায় ঘুস ছাড়া সেবা, ভয় ছাড়া ন্যায়, আর তদবির ছাড়া কাজ। দুর্নীতি ও দুরবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে হলে প্রথমে রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে— সমস্যা বিচ্ছিন্ন কয়েকজন অসৎ কর্মচারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমস্যা পুরো ব্যবস্থার মধ্যে। সেই স্বীকারোক্তি না এলে সংস্কার হবে নামসর্বস্ব, আর জনগণের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে। দেশের মানুষ আর ডুবতে চায় না; তারা চায় এমন একটি প্রশাসন, যেখানে সেবা নিতে গেলে মাথা নিচু করতে না হয়, আর নাগরিককে শাসক নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হয়। 


লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা ফেলো, ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া