কারিগরিতে অর্ধেক আসনই শূন্য থাকে: তবুও ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা চালুর ঘোষণা কতটা যৌক্তিক?
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অধীনে শের-ই-বাংলা নগরস্থ আগারগাঁওয়ে অবস্থিত কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। বাংলাদেশের একমাত্র কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অফিস এখানেই। কারিগিরি শিক্ষা সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৬০ সালে এ’টি প্রতিষ্ঠিত হয়। কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়য় ছাড়া দেশের সকল কারিগরি শিক্ষা এই বোর্ডের অধীন পরিচালিত হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সার্টিফিকেট পর্যায়ে ১৩৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ এবং ১টি ভোকাশনাল টিচার্চ ট্রেনিং ইন্সটিটিউট রয়েছে। এ ছাড়া ডিপ্লোমা পর্যায়ে ৪৯ টি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এবং ডিগ্রী পর্যায়ে ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ রয়েছে। এগুলো ছাড়াও এই অধিদপ্তরের অধীনে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ২০২২-২৩ সালে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে সর্বমোট ১২,০৭৪ টি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিয়েছে। এ গুলোর মধ্যে সরকারি ১২০৫টি ও বেসরকারি ১০,৮৬৯টি। এগুলোর মোট আসন সংখ্যা হচ্ছে ১৩,৬৯,১০৫টি। ২০২২-২৩ সালে ভর্তি হয়েছে মোট ৬,৭৩,৫৯১ জন (সরকারি ৯৭,৯২৯ জন ও বেসরকারি ৫,৭৬,৬৬২ জন)। অতএব দেখা যাচ্ছে মোট আসনের শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশী আসন খালি পড়ে আছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে মূলত ৩ প্রকারের শিক্ষাক্রম চালু রয়েছেঃ
১। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স ৪ বছর মেয়াদি। ভর্তির যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক পাশ।
২। এইচ এস সি ভোকেশনাল এ এর মেয়াদ ২ বছর।
৩। এস এস সি (ভোকেশনাল) । এর মেয়াদ ২ বছর।
৪। ট্রেড কোর্স, যোগ্যতা ৮ম শ্রেণি পাশ। কোর্সের মেয়াদ ৬ মাস থেকে ১ বছর।
উপরে পরিবেশিত তথ্য ও উপাত্ত পরিদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ একেবারে অপ্রতুল নয়। কিন্তু বিদ্যমান সুযোগের অর্ধেকই ব্যবহৃত হচ্ছে না। এর পরেও সরকারি তরফে বলা হচ্ছে – আগামী বছর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা প্রদান করা হবে। গত ৮ জুন ২০২৬ বাংলাদেশ সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা বিভাগ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জনাব মাহদী আলম বলেন, “দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে এবং একই সংগে শিক্ষার্থীদেরকে সৃজনশীল, নৈতিকতা, খেলাধূলা, সংস্কৃতি ও উদ্যোক্তা দক্ষতা বিকাশে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে” (সূত্রঃ প্রথম আলো, ৯ জুন ২০২৬)। উপদেষ্টা মহোদয়ের এই বক্তব্য দেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণী থকে কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও কারিগরি শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যে দেশের বিদ্যমান কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার বিপুল সংখ্যক আসন প্রতি বছর অর্ধেকের বেশি ফাঁকা থাকে, সেখানে নতুন করে মাধ্যমিক স্তরের শুরুতে আরেকটি কারিগরি শিক্ষা কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক? কারিগরি শিক্ষার বর্তমান চিত্র হলো - বিশাল অবকাঠামো, শিক্ষক, সরঞ্জামাদি থাকা সত্ত্বেও অভাবনীয়ভাবে অর্ধেকের বেশী শূন্যপদ বিদ্যমান। প্রশ্ন উঠেছে, ষষ্ঠ শ্রেণী পড়ুয়া ১২/১৩ বছরের ছেলেমেয়েদের কী কারিগরি শিক্ষা দেয়া হবে? অবকাঠামো, ল্যাব, যন্ত্রপাতি, শিক্ষক/ইন্সট্রাক্টর কোথায়? আর এদেরকে কী কোর্সই বা শিক্ষা দেয়া হবে? ছয় মাসে ট্রেড কোর্স? এক বছরের ভোকাশনাল কোর্স? আর এটা শেষ করেই বা এরা কী করবে? শিশুর বয়স পার হয়নি বলে তো এরা চাকরিতেও ঢুকতে পারবে না! অতএব ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে কারিগরি শিক্ষা প্রদান বাধ্যতামূলক করা যৌক্তিক হবে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া আর একটি বিষয় প্রনিধানযোগ্য – তা হলো - কারিগরি বিষয়টা তো বিজ্ঞানবিষয়ক। সবাই বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়টি নিতে পারবে বলেও মনে হয় না। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের কয়জন নবম শ্রেণীতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করে? তাই কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের উপযুক্ত বয়স হচ্ছে ১৩/১৪ বছর। যখন বাচ্চারা অষ্টম শ্রেণী শেষ করে। তখন তারা শারীরিকভাবে মোটামুটি শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং নিজেকে চেনার ও আয় রোজগার করার চেতনা তাদের মধ্যে জাগ্রত হয়। তাই বর্তমানে বিভিন্ন কারিগরি ইন্সটিটিউটে অষ্টম শ্রেণী পাশ ছাত্রছাত্রীদের জন্যে ছয় মাস মেয়াদি যে সকল ট্রেড কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে সেটাই উপযুক্ত বলে মনে হয়। কারিগরি ক্ষেত্র ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে আমাদের দেশে নিন্ম পর্যায়ের চাকরির সুযোগ বিদ্যমান – যেমন, এম এল এস এস, সিকিউরিটি গার্ড, গার্ডেনার, ইত্যাদি, এগুলোর শিক্ষাগত যোগ্যতাও অষ্টম শ্রেণী পাশ। সেজন্যে শিক্ষা ববস্থায় অষ্টম শ্রেণী একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। তাই বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণীর স্থলে অষ্টম শ্রেণী করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সরকার এই বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।
একই অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ তার বক্তৃতায় বলেন, “ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা চালু করলে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে অভ্যস্ত হবে। এটি তাদের ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মোচন করবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “নতুন এ উদ্যোগে শিক্ষক নিয়োগ, ল্যাব ও যন্ত্রপাতি স্থাপনসহ বিপুল বাজেটের প্রয়োজন হবে” (সূত্রঃ প্রথম আলো, ৯ জুন ২০২৬)। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, যেখানে ১২ হাজার প্রতিষ্ঠানের অর্ধেক আসন ফাঁকা, সেখানে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে নতুন ল্যাব, যন্ত্রপাতি ও শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে আরেকটি সমান্তরাল কাঠামো দাঁড় করানো কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে?
যুগান্তর ও প্রথম আলো পত্রিকার শিক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. জামিলুর রহমান এ বিষয়ে তার মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “প্রথমে বর্তমান কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। ওই সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংকট কেন? কারণ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা মনে করেন, কারিগরি শিক্ষা মানেই ‘খাটুনির কাজ’, যা সমাজে অমর্যাদার। এ ধারণা ভাঙতে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও চাকরির বাজারে কারিগরি শিক্ষার মূল্যায়ন বাড়ানো”। তিনি আরও যোগ করেন, “ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হয়তো প্লাম্বিং, ওয়েল্ডিং, ইত্যাদি বিষয়ের তাত্ত্বিক জ্ঞান নেবে, কিন্তু তা বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ কোথায়? মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর ইতোমধ্যেই পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা প্রকট। সেখানে যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ”।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-তে কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হলেও সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষার চেয়ে বরং নবম-দশম শ্রেণিতে ‘ওয়ার্ক অরিয়েন্টেড এডুকেশন’-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে, টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (টিভিইটি) সংস্কার প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বারবার বলা হয়েছে, নতুন প্রতিষ্ঠান না খুলে বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখতে জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ‘ক্যাম্প’ এর নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, “মাধ্যমিকের শুরুতেই কারিগরি শিক্ষার ভিত গড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। জার্মানি ও জাপানের মডেলে তো শিশুরা ছোট থেকেই কাজভিত্তিক শিক্ষায় যুক্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে আমাদের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বিদ্যালয়গুলোতে প্রাথমিক বিজ্ঞান ল্যাব পর্যন্ত অস্তিত্বের সঙ্কটে। নতুন কারিগরি ল্যাবে যন্ত্রপাতি বসানো, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দক্ষ শিক্ষক নিয়োগের পেছনে যে বিশাল ব্যয়, তা দেশের বাজেটের পরিপ্রেক্ষিতে অদূরদর্শী হবে, যতক্ষণ না বিটিইবির অধীনে থাকা ১২ হাজার প্রতিষ্ঠানের ফাঁকা আসনগুলো পূরণের নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনা গহণ করা হবে”।
উপর্যুক্ত পর্যালোচনায় স্পষ্ট, বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী না থাকার মূল কারণ হলো সামাজিক মানসিকতা, স্বদেশে যথাযথ চাকরি ও বিদেশে যাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকা এবং পরিকাঠামোর দুর্বলতা। শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও মন্ত্রী ববি হাজ্জাজের প্রস্তাবটি চমকপ্রদ হলেও তা বাস্তবে রূপ দিতে গেলে উল্টো বর্তমান কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুন করে বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগের আগে সরকারের উচিত:
১. বিটিইবির অধীন ১২ হাজার প্রতিষ্ঠানের শূন্য আসন পূরণে উদ্যোগ গ্রহণ করা;
২. কারিগরি শিক্ষাকে সমাজে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা’ হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা দূর করতে ব্যাপক প্রচারাভিযান;
৩. এসব প্রতিষ্ঠানের ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেটের সমতুল্যতা ও মূল্য বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ; এবং
৪. নতুন কারিগরি শিক্ষা চালুর চেয়ে বর্তমান কারিগরি বিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান কর্মশালা ও ল্যাব সংস্কার।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ। এ অঞ্চলের ৪৫টি দেশের জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আমরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থানে রয়েছি। শুধু তাই নয়, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫-৫৯ বছর) মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি। তাই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট (জনমিতি মুনাফা) বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন অতিক্রম করছে একটি সুবর্ণ সময়। আমরা এ সুযোগ ও সম্ভাবনাকে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রত্যাশিত উন্নত দেশে পরিণত হতে পারি। কিন্তু তরুণ-তরুণীদের প্রকৃত শিক্ষা ও কাজ দিতে না পারলে সে সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা সর্বাধিক। তাই শ্রম বাজারে কর্মসংস্থানের হার বাড়াতে হলে কারিগরি শিক্ষাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। সেই লক্ষ্যে নিন্মোল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রতি বি এন পি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন করছিঃ
১. কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতকরা ১০০ ভাগ ছাত্র ভর্তি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষক/প্রশিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা;
২. অষ্টম শ্রেণী পাশ ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকে বিশেষ পরীক্ষা (স্ক্রিনিং) এর মাধ্যমে শুধুমাত্র অতি মেধাবীদের নবম শ্রেণীতে ভর্তির অনুমতি প্রদান এবং বাদবাকীদের ঢালাওভাবে কারিগরি শিক্ষায় অনুপ্রবেশের একটি সর্বসম্মত জাতীয় নীতি গ্রহণ করা। মনে রাখা প্রয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দান জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী;
৩. শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ আধা–দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আফ্রিকার শ্রম বাজারে চাহিদা অনুযায়ী কম খরচে জনশক্তি রপ্তানির ব্যবস্থা করা;
৪. দেশে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পদক্ষেপ গ্রহণ করা। শিক্ষিত বেকার যুবকদের প্রয়োজনীয় ট্রেনিং ও পুঁজি সহায়তা দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ করে দেওয়া;
৫. সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদের সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান তৈরি করে পর্যায়ক্রমে দুর্নীতিমুক্তভাবে শিক্ষিত বেকারদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা;
৬. শ্রমিক অসন্তোষ দূর করে নতুন নতুন রপ্তানিমুখী শিল্প কারখানা গড়ে তোলা। বন্ধ শিল্প কারখানা দ্রুত চালু করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
৭. বিশ্বের উন্নত দেশে বাংলাদেশের শ্রম বাজার সম্পর্কে প্রচার করার পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যত বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা যাবে তত বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে ডলার সংকট দূর করা, অর্থ পাচার বন্ধ করে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সর্বোপরি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা দুরূহ হয়ে উঠবে; এবং সবশেষে
৮. সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে বাংলাদেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার প্রতি যে নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক ভাবমূর্তি বিদ্যমান তা দূরীভূত করার কার্যর্কর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে তরুণরা সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণে ব্রতী হয়।
সার্বিকভাবে আমাদের নতুন প্রজন্ম এবং শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীকে বিশ্ববাজারে নতুন নতুন কাজের উপযোগী করে গড়ে ওঠার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৩ অনুসারে, সব ধরনের খাত এবং শিল্পে সবুজ চাকরির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সবুজ রূপান্তরের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী তিন কোটি কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এ কর্মসংস্থান তৈরি হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অল্প শক্তি ব্যবহার করে বেশি উৎপাদন এবং কম নির্গমন প্রযুক্তি এ তিনটি খাতে। সবুজ শক্তি এবং টেকসই উন্নয়নে নতুন চাকরির সুযোগের ক্ষেত্রে আপাতত যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে পশ্চিমা দেশ এবং জাপান। এরপরে রয়েছে চীন। এ কাজগুলো ব্যবসা, বিজ্ঞান ও পরিবেশের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হতে পারে। আমাদের বেকার কর্ম শক্তিকে ঐসব কাজের উপযোগী করে প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযোগী ওইসব দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)
ই-মেইলঃ amatin@aub.ac.bd