১১ জুন ২০২৬, ০০:২২

প্রতি উপজেলায় গণগ্রন্থাগার স্থাপন: জিয়াউর রহমানের স্বপ্নপূরণের এখনই উপযুক্ত সময়

এম এ মতিন  © টিডিসি সম্পাদিত

গণগ্রন্থাগারকে বলা হয়, ‘জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়’। কারণ সকল স্তরের, সকল পেশার, সকল বয়সের মানুষ গণগ্রন্থাগারে অবাদে প্রবেশ করে নিজেদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, যে কোন বই পড়তে পারে। এতে মানুষের মধ্যে জ্ঞান চর্চার আগ্রহ সৃষ্টি হয়, মানুষ হয় মননশীল আর ফলত সমাজ হয় স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ। মানুষ এতে অধিকতর যুক্তিনির্ভর হতে শিখে। কিন্তু বাংলাদেশে গণগ্রন্থাগারের সংখ্যা জনসংখ্যার অনুপাতে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আমেরিকান লাইব্রেরী এ্যাসোসিয়েশন (এ এল এ) –এর সংজ্ঞা অনুযায়ী  প্রতি ২৫,০০০ মানুষের জন্যে একটি গণগ্রন্থাগার থাকা প্রয়োজন এবং তাতে মাথাপিছু বইয়ের সংগ্রহ থাকবে ১:২। এ এল এ –এর সংজ্ঞা মোতাবেক বাংলাদেশ এবং তৃতীয় বিশ্বে দেশসমূহ অনেক পিছিয়ে।

বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে থানাগুলোকে 'উপজেলা'-তে রূপান্তর করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়। এই সময় প্রশাসনিক কাঠামোর উন্নয়ন ঘটলেও উপজেলা পর্যায়ে স্বতন্ত্র ও আধুনিক কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি গণগ্রন্থাগার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ⁠ গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর মূলত বিভাগীয় এবং জেলা শহর কেন্দ্রিক গণগ্রন্থাগারগুলো (বর্তমানে ৭১টি) পরিচালনা করে আসছিল। তৎকালীন এনাম কমিটির সুপারিশে বিলুপ্ত বাংলাদেশ পরিষদের লাইব্রেরিগুলোকে জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে একীভূত করা হলেও তা উপজেলা স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল না। অতীতে উপজেলা পর্যায়ে যা কিছু পাঠাগার গড়ে উঠেছিল, তার সিংহভাগই ছিল স্থানীয় সমাজকর্মী, যুব ক্লাব বা বেসরকারি উদ্যোগের ফল। পরবর্তীতে ⁠জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলাগুলোতে বই পড়া কর্মসূচি আংশিক সচল রাখা হয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী গ্রন্থাগারিক পদ (বর্তমানে সহকারী শিক্ষক) সৃষ্টি করে প্রাতিষ্ঠানিক লাইব্রেরি চালুর চেষ্টা করা হলেও, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত উপজেলাভিত্তিক সরকারি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাটি দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল। 

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনামলে দেশের গ্রামীণ জনগণের জ্ঞানচর্চা ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিটি থানা (বর্তমান উপজেলা) পর্যায়ে একটি করে গণগ্রন্থাগার স্থাপনের যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। এটি ছিল প্রান্তিক পর্যায়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের এক দূরদর্শী পদক্ষেপ। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো তাঁর সে পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি; শুধু কিছু থানায় সীমিত আকারে গ্রন্থাগার স্থাপন করে থেমে যায়। বর্তমানে বিএনপি সরকার দেশের উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করলেও জিয়াউর রহমানের সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান না হলেও  বর্তমানে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে উপজেলা পর্যায়ে গণগ্রন্থাগারের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হচ্ছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলোতে নতুন পাঠাগার নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের অগ্রগতি নিন্মরূপঃ 

৪৪ উপজেলা প্রকল্প: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং এলজিইডি (LGED)-এর যৌথ উদ্যোগে দেশের ৪৪টি উপজেলায় বিশেষায়িত পাবলিক লাইব্রেরি নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

আর্থিক বরাদ্দ: প্রতিটি লাইব্রেরি নির্মাণের জন্য ৫৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মোট বাজেট ২৩৩.২ মিলিয়ন টাকা।

অঞ্চল নির্বাচন: শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর এলাকা, বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় উপজেলাগুলোকে এই প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। 

এ ছাড়া সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর এখন জেলা পর্যায় থেকে নেমে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি লাইব্রেরির স্থায়ী কাঠামো তৈরিতে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জসহ বেশ কিছু উপজেলায় সরকারি গণগ্রন্থাগারের জন্য জমি পরিদর্শন ও প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছে। অনেক পুরোনো ও জরাজীর্ণ উপজেলা লাইব্রেরি যেগুলো মাদকসেবী বা চোরদের আস্তানায় পরিণত হয়েছিল, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও) এবং তরুণ সমাজের উদ্যোগে সেগুলোর সংস্কার ও বই পুনঃস্থাপন করা হচ্ছে (যেমন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা পাবলিক লাইব্রেরি সংস্কার)। চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে শুধু ডিজিটাল মাধ্যম নয়, সুষম জ্ঞানচর্চার জন্য মুদ্রিত বই ও গবেষণাপত্রের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া প্রতিটি উপজেলায় একটি মানসম্পন্ন গণগ্রন্থাগার থাকলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার গাইডের বাইরে জ্ঞানবিজ্ঞান, সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চার সুযোগ পাবে। ·চাকরিপ্রার্থীরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় বই ও জার্নাল পাবে। সাধারণ পাঠক সমাজ জ্ঞান ও বিনোদনমূলক বই পড়ে মানসিক বিকাশ ঘটাতে পারবে। সর্বোপরি, গবেষক ও সাংবাদিকরা স্থানীয় ইতিহাস ও তথ্য সংগ্রহের সুবিধা পাবেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বর্তমান বিএনপি সরকার নিম্নলিখিত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনঃ

১. পাইলট প্রকল্প গ্রহণ: প্রথমে প্রতিটি বিভাগের ২টি করে উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে গ্রন্থাগার স্থাপন।
২. বাজেট বরাদ্দ: জাতীয় বাজেটে ‘উপজেলা গণগ্রন্থাগার স্থাপন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক পৃথক খাত সৃষ্টি।
৩. ভৌত অবকাঠামো: প্রতিটি উপজেলা সদরে সরকারি জায়গায় (যেমন উপজেলা পরিষদ চত্বর বা মুক্তমঞ্চ) গ্রন্থাগার ভবন নির্মাণ।
৪. বই সংগ্রহ: জেলা শহরের সরকারি গ্রন্থাগার ও বিদেশি দূতাবাসের সহায়তায় মানসম্পন্ন বাংলা ও ইংরেজি বই, সাময়িকপত্র ও গবেষণা প্রতিবেদন সংগ্রহ।
৫. ডিজিটাল সংযোগ: প্রতিটি গ্রন্থাগারকে জাতীয় ডিজিটাল গ্রন্থাগার নেটওয়ার্কের আওতায় আনা।
৬. কর্মী নিয়োগ: গ্রন্থাগারিক ও সহায়ক কর্মচারী নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
৭. তদারকি কমিটি: স্থানীয় শিক্ষাবিদ, জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন, যা গ্রন্থাগারের নিয়মিত কার্যক্রম মনিটর করবে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন ছিল একটি জ্ঞানভিত্তিক ও আলোকিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল হাতিয়ার হতে পারে উপজেলা পর্যায়ের গণগ্রন্থাগার। বর্তমান সরকার দেশের উন্নয়নে যতই অগ্রগতি করুক না কেন, জ্ঞানচর্চার এই অত্যাবশ্যক প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করে প্রকৃত জাতীয় উন্নয়ন অসম্ভব। তাই আমরা আশা করি, সরকার শিগগিরই পদক্ষেপ নেবে এবং জিয়াউর রহমানের সেই স্বপ্নপূরণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ এক রাষ্ট্রে পরিণত করবে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করে শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

 ‘একটি উপজেলা একটি লাইব্রেরি’ নির্মাণের পাশাপাশি, শিশুদের জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞানভিত্তিক বই পড়ার মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ‘বই পড়ার সংস্কৃতি’ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠায় তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ না করলেও তার প্রয়াত পিতার লক্ষ্য অর্জনে এগোচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হয়। 

শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি, সর্বজনীন শিক্ষা বাস্তবায়ন তথা উন্নত জাতি গঠনের গ্রামীণ তথা উপজেলা পর্যায়ে গণগ্রন্থাগার স্থাপন ও পরিচালনার বিকল্প নেই। সেজন্যে গ্রামীণ তথা উপজেলা পর্যায়ে গণগ্রন্থাগার স্থাপন ও পরিচালনার জন্যে বি এন পি সরকারের বাস্তবানুগ কর্মসূচি প্রত্যাশা করি।

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
ই-মেইল: amatin@aub.ac.bd