৩১ মে ২০২৬, ২০:৫৪

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ আখ্যা: কাঠগড়ায় দৃষ্টিভঙ্গি, নাকি প্রতিষ্ঠান?

প্রফেসর ড. শাহাদাত হোছাইন, ফাইন্যান্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়   © টিডিসি ফটো

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দেশের শীর্ষ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে সেরা প্রতিষ্ঠানটিকেই যদি শুধু কোচিং সেন্টার বলা হয়, তবে বাকিগুলোর অস্তিত্বের সংকট কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? আর এই মন্তব্য যিনি করেছেন, তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেই-বা এটি কী বার্তা দেয়?

সম্প্রতি এক পডকাস্টে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি কোচিং সেন্টারের সঙ্গে তুলনা করেন। এর প্রতিক্রিয়া আসতে সময় লাগেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাবেক অ্যালামনাইরা ক্ষুব্ধ হন এবং তার নিজস্ব রাজনৈতিক শিবিরের একটি শিক্ষক সংগঠনও এই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি তোলে। চাপের মুখে এক দিনের মধ্যে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে মন্তব্যটি প্রত্যাহার করে নেন। তিনি দাবি করেন যে, তার বক্তব্য ভুল বোঝা হয়েছে এবং তিনি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।

অনেকেই এই দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমেই ঘটনার ইতি ধরে নিয়েছেন। অথচ আসল আলোচনাটা এখান থেকেই শুরু হওয়া উচিত। কারণ তার এই অবমাননাকর মন্তব্যটি যত শোরগোলই তৈরি করুক না কেন, সেটি আসল বিষয় নয়। আসল বিষয় হলো তিনি কোনো মাপকাঠি দিয়ে দেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বিচার করলেন। 

সেই মাপকাঠিটি হলো, গবেষণা। তিনি বললেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পর্যাপ্ত গবেষণা হয় না। এরপরের পুরো বিতর্কটিও তার বেঁধে দেওয়া ছকের ভেতরেই আটকে রইল। সমালোচক ও সমর্থক উভয় পক্ষই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার পরিসংখ্যান ও খতিয়ান তুলে ধরে আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এবং এখনো করছেন। কেন জানি দুই পক্ষই মেনে নিল যে গবেষণার পরিমাপই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-মন্দের একমাত্র মাপকাঠি। অনেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিং এর সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করছেন। আর এখানেই লুকিয়ে আছে আসল গলদ, কারণ একটি মহৎ বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই কেবল গবেষণা উৎপাদনের যান্ত্রিক কারখানা নয়।

এখানে একটু খেয়াল করা দরকার যে, তিনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়টিকে বেছে নিলেন। কোনো ছোট কিংবা ধুঁকতে থাকা কলেজ নয়, তিনি বেছে নিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে, যা দেশের প্রাচীনতম, সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একেবারে শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠান। সবচেয়ে ভালোটিই যদি কেবল কোচিং সেন্টার হয়, তবে বাকিগুলোর অবস্থান কোথায়? চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর কিংবা এর নিচে থাকা দেশের ডজন ডজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে এই দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে, তাদের ভবিষ্যৎ কী? শীর্ষ প্রতিষ্ঠানটিকে খাটো করা মানে প্রকারান্তরে সব কটিকেই অবমাননা করা। তাই এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পাস নিয়ে বিতর্ক নয়, এটি মূলত আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দর্শনের ওপর আঘাত।

এ কথা সত্য যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানাবিধ বাস্তব সংকট রয়েছে। গবেষণার অসম মান, অর্থসংকটে জর্জরিত পরীক্ষাগার কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের মতো বিষয়গুলো এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে। যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভালোবাসেন, তারা বছরের পর বছর ধরে এসব সংকটের কথা বলে আসছেন। কিন্তু ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয় না’— এই ন্যায্য সমালোচনার সঙ্গে ‘গবেষণাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র কাজ’— এই ধারণার আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। প্রথমটি একটি যৌক্তিক অভিযোগ, আর দ্বিতীয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্বরূপ সম্পর্কে এক চরম অজ্ঞতা।

একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কী কাজ করে, তা একটু গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশের বহু আগেই এটি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে কাজ করে। মফস্বল বা দূরবর্তী কোনো জেলা শহর থেকে আসা এক ভীত ও অপ্রস্তুত আঠারো বছরের তরুণকে অ্যাকাডেমিক সেশনের পুরো সময় ধরে আগলে রেখে এটি এমন এক স্নাতকে রূপান্তর করে, যে নিজে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে এবং পৃথিবীতে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে পারে। এটি শেখায় কীভাবে যুক্তি দিতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন তুলতে হয় এবং কীভাবে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর সমাজের অংশ হতে হয়। এখানে আরও অনেক বিষয় যুক্ত করা যাবে। কিন্তু একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অদৃশ্যে থাকা এই শক্তিশালী উপাদানগুলোর কোনো কিছুই গবেষণার পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না— এবং ধরা পড়ার দরকারও নেই। অথচ এসব কারণেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব টিকে আছে।

তাছাড়া, এই প্রতিষ্ঠানগুলো এমন একটি সামাজিক দায়িত্ব পালন করে যা কোনো বৈশ্বিক মর্যাদাক্রম দিয়ে মাপা অসম্ভব। এগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, যা সাধারণ মানুষের করের টাকায় এবং সাধারণ পরিবারের সন্তানদের জন্যই পরিচালিত হয়। এটি কোনো গৌণ বিষয় নয়, এটাই এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলো সেই চত্বর, যেখানে সাধারণ মানুষের স্বপ্নের সূচনা ঘটে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো কৃষকের মেয়ে কিংবা দিনমজুরের ছেলে এখানেই প্রথম বুকে সাহস বেঁধে তার ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখে। অধিকাংশ বাংলাদেশির জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ওপরে ওঠার আর কোনো বিকল্প সিঁড়ি নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নাগালের বাইরে, কারণ সেগুলোর দ্বার মূলত বিত্তশালীদের সন্তানদের জন্যই উন্মুক্ত থাকে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র পথ, আর এই পথটি খোলাই থাকে কারণ দেশের সাধারণ জনগণ করের টাকায় এটি সচল রাখে। 

এর বাইরে আরও একটি দিক রয়েছে, যা কোনো বৈশ্বিক মাপকাঠিতে দেখা যায় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি দেশের সামগ্রিক বিবেকের বাতিঘর। এর প্রমাণের জন্য খুব বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান, যা পুরোনো স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে বর্তমান সরকারের জন্য পথ সুগম করেছে, তার সূত্রপাত কিন্তু এই ক্যাম্পাসগুলো থেকেই হয়েছিল। কোনো গবেষণাপত্রের সাইটেশন বা উদ্ধৃতি স্বৈরাচারের ভয়ের রাজত্বের অবসান ঘটায়নি; ঘটিয়েছে শিক্ষার্থীদের অদম্য সাহস। অথচ যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে মন্ত্রী খাটো করে দেখছেন, সেগুলোর শিক্ষার্থীদের রক্ত ও সাহসই আজ তাকে এই মন্ত্রণালয়ের চেয়ারে বসিয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান এখানে কম; কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান কাঠামো আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের ধারণ করতে পারে না, যা আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ।

তাই বিচার করার মাপকাঠিটি যদি ভুল হয়ে থাকে, তবে এই প্রশ্ন তোলা সংগত যে, যিনি এই পরিমাপক ব্যবহার করলেন, তার সেই যোগ্যতা বা অধিকার কতটুকু? উত্তরটি বেশ অস্বস্তিকর। তার সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (এমবিএ); এর পূর্বে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক করেছেন এবং কোনো পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়াই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তার পাঠদানকৃত মূল বিষয় হিসেবে ব্যবসায় প্রশাসনের কোর্সগুলো থাকলেও, তার নিজস্ব গবেষণা স্নাতক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে অনেক দেরিতে শুরু হয়েছিল, যা পরিমাণে ও পরিধিতে অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ একটি উচ্চতর গবেষণা সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করার জন্য যে দীর্ঘ ও নিবিড় গবেষণা জীবনের প্রয়োজন, ঠিক সেই অভিজ্ঞতাই তার অনুপস্থিত। গবেষণায় সর্বোচ্চ ডিগ্রিবিহীন একজন ব্যক্তি, যার নিজস্ব অ্যাকাডেমিক গবেষণার অবদান স্নাতক পর্যায়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে খুব বেশি এগোতে পারেনি, তিনি দেশের শীর্ষ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আঙুল তুলে বললেন যে এখানে গবেষণা কম। তিনি এমন এক উচ্চতর মানদণ্ড দিয়ে অন্যকে মাপতে গেলেন, যে পরীক্ষায় তিনি নিজে কখনোই উত্তীর্ণ হতে পারতেন না।

তবে এটি মুদ্রার এক পিঠ মাত্র। অপর পিঠটি হলো তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান। সমাজ বা রাষ্ট্রে তার আজকের যে অবস্থান, তা কোনো শিক্ষাঙ্গণ বা শ্রেণিকক্ষ থেকে অর্জিত হয়নি, বরং এসেছে তার পারিবারিক পরিচয় থেকে। তার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুটি ডিগ্রির ক্ষেত্রেই দেশের বাইরের নামি-দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় থাকলেও এটা অনুমেয় যে, আমাদের দেশের সাধারণ নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখে বিদেশে পড়তে যায়, তার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী ব্যবসায়ীর সন্তান এবং পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের একজন পরিচালক। তার জীবনের গতিপথ নির্ধারিত হয়েছে প্রথমে ব্যবসা এবং পরে রাজনীতির মাধ্যমে। তিনি নিজে দল গঠন করেছেন, এরপর রাজনৈতিক জোটে যোগ দিয়ে মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছেন। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মতো একটি অভিজাত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, যেখানে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের প্রবেশাধিকার একপ্রকার অসম্ভব, তার শিক্ষকতার পদটি মূলত একটি আলংকারিক পদবি মাত্র, তা তার জীবনের মূল সাধনা নয়।

পুরো চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে তার জীবনের কোনো সাফল্যই কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে আসেনি। তার অর্থসম্পদ, তার পেশাজীবন কিংবা তার শিক্ষাগত পরিচয় কোনো কিছুই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ঋণী নয়। যেহেতু তাকে কখনোই কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়নি, তাই দেশের সর্বস্তরের মানুষের জন্য তৈরি এই অনন্য সিঁড়িটিকে তিনি সম্পূর্ণ বাইরে দাঁড়িয়ে খণ্ডিতভাবে বিচার করেছেন। 

যাকে কখনো কোনো জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়নি, তার পক্ষে সেই প্রতিষ্ঠানের গভীরতা বোঝা কঠিন। অনেক উচ্চতায় বসে দেখলে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি লোকসানি ব্যবসা মনে হতেই পারে, কারণ সেই উচ্চতা থেকে ভেতরে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবনসংগ্রাম চোখে পড়ে না। জনাকীর্ণ শ্রেণিকক্ষকে তখন সুযোগ সৃষ্টির বদলে সম্পদের অপচয় বলে ভ্রম হয়। সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিওর ‘হ্যাবিটাস’ তত্ত্ব অনুযায়ী, তিনি যে পরিবেশে বড় হয়েছেন, সেখান থেকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ‘ব্যর্থ ব্যবসা’ বা ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবেই দেখা স্বাভাবিক। একজন সুবিধাবাদী দর্শকের কাছে এই প্রতিষ্ঠানটি কখনো এক মেধারী দরিদ্র শিশু এবং তার অবরুদ্ধ ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র ভরসার দেয়াল হিসেবে ধরা দেয়নি।

আর ঠিক এই কারণেই তার এই মন্তব্যটি সাময়িক কোনো বিতর্ক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি উদ্‌বেগের কারণ। যে মানসিক দূরত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভুল বুঝল, সেই একই দূরত্বের কারণে চট্টগ্রাম বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, প্রান্তিক অঞ্চলের কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা জেলা শহরের সরকারি কলেজও ভুল মূল্যায়নের শিকার হবে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি যেকোনো গণমুখী প্রতিষ্ঠানই এই মানসিকতার কাছে উপেক্ষিত থাকবে, যা এমন মানুষের জন্য গড়া- যাদের জীবন তিনি কখনো যাপন করেননি।

আমাদের মনে রাখা দরকার যে, তার মূল দায়িত্বটি কী। ববি হাজ্জাজ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন, দেশের গ্রামের স্কুল, দুপুরের খাবার বা শিশুর প্রথম পাঠের দায়িত্ব প্রতিমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত। উচ্চশিক্ষা তো তার মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্তই নয়। অথচ দেশের সবচেয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ নিয়ে এমন এক ঢালাই রায় দিয়ে দিলেন, যা কেবল এমন একজন মানুষের পক্ষেই সম্ভব যাকে জীবনের কোনো স্তরে কেউ কখনো বলেনি যে কিছু বিষয় তার বোঝাপড়ারও বাইরে। তিনি কেবল একজন দর্শক নন, তিনি এখন এমন একটি ব্যবস্থার নীতি-নির্ধারক যা কোটি কোটি দরিদ্র শিশুর ভাগ্য নির্ধারণ করবে, যাদের সামনে কোনো অক্সফোর্ড বা দামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বিলাসিতা নেই।

তাই মন্তব্যটি প্রত্যাহার করা হোক বা না হোক, একে নিছক মুখ ফসকানো কথা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মুখ ফসকানো একটি দুর্ঘটনা মাত্র, কিন্তু এটি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। এমনকি তার দুঃখপ্রকাশের ধরনও সেই মানসিকতাই প্রমাণ করে, যেখানে তিনি উল্টো শ্রোতাদের ওপর ভুল বোঝার দায় চাপিয়েছেন এবং আলোচনাটিকে অনানুষ্ঠানিক বলে পার পেতে চেয়েছেন। কিন্তু মানুষ যখন অসতর্ক থাকে, তখনই তার ভেতরের আসল চিন্তাটি বেরিয়ে আসে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ভুলবশত কিছু বলেননি, বরং তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তার মতো আর্থ-সামাজিক পটভূমি থেকে আসা একজন মানুষ এই দেশের গণমানুষের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আসলে কতটা তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন।

একজন মন্ত্রী হিসেবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও উন্নয়ন ও সংস্কার চাইতেই পারেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকেরই তা চাওয়া উচিত। কিন্তু তিনি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই থেমে থাকেননি। সবচেয়ে সেরা প্রতিষ্ঠানটিকে খারিজ করার মাধ্যমে তিনি প্রকারান্তরে দেশের সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন, যা লক্ষ লক্ষ সাধারণ পরিবারের স্বপ্নকে ধারণ করে আছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম কিংবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই হলো গরিবের স্বপ্নের চারণভূমি এবং একমাত্র সমতার সিঁড়ি, যেখানে একজন কৃষকের সন্তানও দেশের ধনকুবেরের সন্তানের সঙ্গে সমান শর্তে প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়।

যারা নিজেদের যাপিত জীবনের অহমিকায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ত্যাগ ও অবদানকে সংখ্যার অঙ্কে মাপতে চান, তাদের পক্ষে এর মর্মার্থ বোঝা সম্ভব নয়। এক অসতর্ক মুহূর্তে তিনি আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার মতো সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির বাইরে থাকা মানুষের জন্য গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি কীভাবে দেখেন। বর্তমানে তিনি যে গুরুদায়িত্ব পালন করছেন তা বিবেচনা করলে তার এই দৃষ্টিভঙ্গিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

লেখক: অধ্যাপক, ফাইন্যান্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়