২৭ মে ২০২৬, ২১:১৭

কোরবানির ইতিহাস ও গুরুত্ব

মো. রেজুয়ানুল হক   © টিডিসি ফটো

মুসলমানদের দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসবের একটি ঈদুল আজহা অন্যটি ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের প্রধান বিষয় রোজা আর ঈদুল আজহার প্রধান আকর্ষণ কুরবানি। কোরবানি মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এর রয়েছে চমকপ্রদ ইতিহাস। 

'কোরবানি' শব্দটি আরবি 'কুরবান' থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ হলো নৈকট্য, সান্নিধ্য বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। পরিভাষায়, আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট নিয়মে শরিয়ত নির্দেশিত হালাল পশু জবাই করাকে কুরবানি বলা হয়।

কোরবানির ইতিহাস
কুরবানির সূচনা হজরত আদম আ. এর যুগ থেকে সকল যুগেই ছিল। তবে কুরবানির প্রকৃতি ও ধরন সব শরিয়তে এক রকম ছিল না । 

হজরত আদম ও হজরত হাওয়া আ. পৃথিবীতে আসেন এবং সন্তান ও বংশ বিস্তার আরম্ভ হয়, তখন প্রতি গর্ভ থেকে একজন পুত্র ও একজন কন্যা-এরূপ যমজ সন্তান জন্মগ্রহণ করত। আল্লাহ্ তা'আলা প্রয়োজনের খাতিরে আদম (আ.)-এর শরিয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন গণ্য হবে। তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। 

কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারিণী সহোদরা বোন হিসেবে গণ্য হবে না অর্থাৎ তাদের পরস্পর বিবাহ বৈধ। এই বিধি মোতাবেক কাবিলের সঙ্গে জন্মগ্রহণকারী বোনের সঙ্গে হাবিলের এবং হাবিলের সঙ্গে জন্মগ্রহণকারী বোনের সঙ্গে কাবিলের বিয়ে হবার কথা। 

ঘটনাচক্রে কাবিলের সহজাত সহোদরা বোনটি ছিল পরমাসুন্দরী এবং হাবিলের সহজাত বোনটি সুন্দরী ছিল না। বিবাহের সময় হলে নিয়মানুযায়ী হাবিলের সহজাত অসুন্দরী কন্যা কাবিলের ভাগে পড়ল। এতে কাবিল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে গেল। সে জেদ ধরল যে, আমার সহজাত বোনকেই আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। হজরত আদম (আ.) তাঁর শরিয়তের আইনের পরিপ্রেক্ষিতে কাবিলের আব্দার প্রত্যাখ্যান করলেন।

অতঃপর তিনি হাবিল ও কাবিলের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা উভয়েই আল্লাহর জন্য নিজ নিজ কুরবানি পেশ কর। যার কুরবানি গৃহীত হবে, সে সেই কন্যার পাণিগ্রহণ করবে। হজরত আদম আ. এর নিশ্চিত বিশ্বাস যে, যে সত্য পথে আছে, তার কুরবানিই গৃহীত হবে।ঐ সময় কোরবানি গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা অবতীর্ণ হয়ে কুরবানিকে ভস্মীভূত করে আবার অন্তর্হিত হয়ে যেত। যে কুরবানি অগ্নি ভস্মীভূত করত না, তাকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হতো।

হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশু পালন করত। সে একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা কুরবানি করল। কাবিল কৃষিকাজ করত। সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানির জন্য পেশ করল। অতঃপর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা অবতরণ করে হাবিলের কুরবানিটিকে ভস্মীভূত করে দিল এবং কাবিলের কুরবানি যেমন ছিল, তেমনি পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যতায় কাবিলের দুঃখ ও ক্ষোভ বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে ভাইকে বলে দিল, 'আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব।' (তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-৩/৯৮-৯৯)

উপর্যুক্ত ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, হজরত আদম আ. এর যুগ থেকেই কুরবানি প্রচলিত ছিল এবং এটি মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি অন্যতম ইবাদত। পৃথিবীতে প্রথম কোরবানি হজরত আদম আ. এর সময় থেকে প্রচলিত হলেও ইসলামি শরিয়তে কুরবানির যে পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে তা হজরত ইব্রাহিম আ. থেকে আমাদের পর্যন্ত এসেছে। এজন্য কুরবানিকে 'সুন্নতে ইব্রাহিমি'ও বলা হয়।

বহু দিন ধরে ইব্রাহিম আ.-এর কোনো সন্তান হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সন্তান জন্মের স্বাভাবিক বয়স পার হয়ে যায় জীবনসন্ধ্যায় দাঁড়িয়েও তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে নেক সন্তান প্রার্থনা করেন-হে আমার রব, আমাকে নেক সন্তান দান করুন। -সূরা সাফফাত- ১০০

হজরত ইব্রাহিম আ. এর ৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো সন্তান হননি। তিনি আল্লাহর নিকট মোনাজাত করতেই থাকতেন। অবশেষে তাঁর বয়স যখন ৮৬ তখন তার ঔরসে হজরত ইসমাইল আ. এর জন্ম হয়। এরপর নিরানব্বই বছর বয়সে তাঁর  আরো একজন সন্তান জন্মগ্রহণ করে যার নাম হজরত ইসহাক আ.। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ইসলামিক ফাউন্ডেশন-৯/৪৩৯)

বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের পিতা হয়ে তিনি শোকর আদায় করে বলেন-সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাঈল ও ইসহাক দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দুআ শ্রবণকারী। -সূরা ইব্রাহিম- ৩৯

ইব্রাহিম (আ.) শামে (সিরিয়া) বসবাস করতেন। একসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এল, পুত্র ইসমাঈল ও তাঁর মা হা-জারকে যেন মক্কায় রেখে যান। মক্কায় তখন জনবসতি ও জীবনোপকরণ বলতে কিছুই ছিল না। তারপরও আল্লাহর নির্দেশমতো তিনি তাঁদেরকে সুদূর মক্কায় রেখে যান।

মক্কায় হজরত ইসমাঈল আ. বেড়ে উঠতে শুরু করলেন। তিনি যখন ছোটাছুটি করার বয়সে উপনীত হন তখন ইব্রাহিম আ. সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। তিনি স্বপ্নে দেখেন, একমাত্র সন্তান ইসমাইলকে জবাই করছেন।

নবীগণের স্বপ্ন ওহীর মতো হয়ে থাকে। তাই এ স্বপ্নের অর্থ এই ছিল যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে ইব্রাহিম (আ.)-কে একমাত্র সন্তান ইসমাঈল (আ.)-কে জবেহ করার আদেশ করা হয়েছে। হজরত ইব্রাহিম (আ.) প্রিয় পুত্রকে মহান আল্লাহর আদেশ সম্পর্কে অবহিত করে বললেন, হে আমরা বৎস, আমি স্বপ্নে দেখি, তোমাকে জবেহ করছি। তাই তুমি চিন্তা করে দেখ, তোমার অভিমত কী।

হজরত ইসমাইল আ. সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন-হে আমার পিতা, আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে আল্লাহ চাহেন তো অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। -সূরা সাফফাত- ১০৩

অতঃপর যখন তারা উভয়ে আদেশ মান্য করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল। আর আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইব্রাহিম, তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা। এবং আমি এক মহান কুরবানির (পশুর) বিনিময়ে তাকে (ইসমাঈল) মুক্ত করলাম। সূরা সাফফাত- ১০৪-১০৮

হজরত ইব্রাহিম আ.-এর এই দুম্বা কুরবানি হল, ইসলামি শরিয়তে নির্দেশিত কুরবানির পদ্ধতির মূল সূত্র। (সামর্থ্যবান) মুসলমানদের কর্তব্য হল (নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট) পশু কুরবানী করা।

কোরবানির গুরুত্ব
কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম।

ধর্মীয় গুরুত্ব
আল্লাহ তায়ালা মহানবী সা. কে কুরবানি করার আদেশ দিয়েছেন। সুরা কাউসারের তাফসিরে আল্লামা ইবনে কাছির বলেন, আমি যেমন আপনাকে দুনিয়া ও আখিরাতে বিপুল কল্যাণ বিশেষত জান্নাতের নহরে কাওছার দান করেছি তেমনি আপনি একনিষ্ঠভাবে কেবলমাত্র আপনার রবের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ফরজ ও নফল নামাজ আদায় করতে থাকেন এবং একমাত্র তাঁরই নামে কুরবানি করুন। (তাফসিরে ইবনে কাছির, ১১শ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় দশ বছর ছিলেন। প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫০৭। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যার সামর্থ্য আছে তবুও সে কুরবানি করল না (অর্থাৎ কুরবানি করার সংকল্প তার নেই) সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।’ -মুসনাদে আহমদ ২/৩২১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত উম্মতের মধ্যে এই ইবাদত ‘তাওয়ারুছ’ ও ‘তাওয়াতুরে’র সঙ্গে চলমান রয়েছে এবং প্রতিবছর ‘শিয়ার’রূপে (ইসলামের একটি প্রকাশ্য ও সম্মিলিতভাবে আদায়যোগ্য ইবাদত হিসেবে) তা আদায় করা হয়েছে। অতএব কেউ যদি মনে করে, কুরবানি ইবাদত নয় এবং ইসলামি শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত নয় তবে সে শরীয়তকে অস্বীকারকারী। (মুফতি আব্দুল মালেক, খতিব, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম, মাসিক আল কাউসার, ডিসেম্বর ২০০৮)

অর্থনৈতিক গুরুত্ব
কুরবানিকে কেন্দ্র করে খামারিরা গবাদি পশু পালন করে। কৃষি, প্রাণিসম্পদ, পরিবহন, চামড়াশিল্প, খুচরা ব্যবসা, ইলেকট্রনিক, ডিজিটাল ফাইন্যান্স ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে কুরবানির মৌসুমে দেশের মৌসুমী অর্থনীতির আকার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রতিবছর কুরবানিকে কেন্দ্র করে যে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়, তার আকার এখন প্রায় এক লাখ কোটি টাকার সমপর্যায়ে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হয়। (প্রথম আলো, ২৩ মে ২০২৬)

গ্রাম গঞ্জের ক্ষুদ্র খামারিরা এর মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছে বা হবার স্বপ্ন দেখছে। কুরবানির বাজার সামনে রেখে দেশের লাখো খামারি সারা বছর গবাদিপশু লালন-পালন করেন । অনেক কৃষক পরিবারের জন্য কুরবানির পশু বিক্রির আয়ই বছরের সবচেয়ে বড় নগদ প্রাপ্তি। 

কুরবানি মৌসুমের অর্থনীতি শুধু পশু ক্রয় বিক্রয়ের উপর নির্ভরশীল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু শ্রমিকের আয়ের উৎস। কুরবানির আগে পরিবহন, পশুর খাদ্য বিক্রি, কুরবানির দিন মাংস কাটাকাটিসহ নানা পেশার মানুষের আয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কুরবানির অর্থনীতি। কুরবানির বিপুল সংখ্যক পশুর চামড়া দেশের চামড়া শিল্পকে প্রাণসঞ্চার করতে সক্ষম যদি সরকার সঠিকভাবে এর যথোপযুক্ত ব্যবহার করতে পারে।

সামাজিক গুরুত্ব
সরকারি হিসেব মতে প্রতি বছর প্রায় এক কোটির বেশি পশু কুরবানি হচ্ছে। এ বছর এই সংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখের মত। এই বিরাট সংখ্যক পশুর মাংস ধনী গরীব নির্বিশেষে সকলের ঘরে কমবেশি পৌঁছাবে। সারা বছর মাংস ক্রয়ের সামর্থ হয় না এমন ঘরে কুরবানির মাংস পৌঁছে যাওয়া একটি অভূতপূর্ব আনন্দের বিষয়। কুরবানির মাংস তিন ভাগে বিভক্ত করা মুসতাহাব। এক ভাগ নিজেরা খাওয়া হবে, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের দেওয়া হবে আর এক ভাগ দেওয়া হবে গরীব-মিসকিনদের। (আল কাউসার, আগস্ট ২০১৯)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদিসে ইরশাদ করেছেন-তোমরা খাও, জমা করে রাখ এবং দান-খয়রাত কর। -সহিহ বুখারি, হাদীস ৫৫৬৯ 

কুরবানির এই সুন্দর প্রথার কারণে পারিবারিক ও সামাজিক  ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। সামাজিক ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় হয়। কুরবানির মাংস গরিব আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তা সামাজিক সমতার একটি মহান আদর্শ।

লেখক, প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, শ্রীবরদী সরকারি কলেজ, শ্রীবরদী, শেরপুর