ভোট ডাকাতদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কেন নয়?
একটি রাষ্ট্রের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো তার বিচারিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সততা হারিয়ে ফেলা। বাংলাদেশে স্বৈরাচারের পতনের পর আজ যখন চারদিকে রাষ্ট্র সংস্কারের জোরালো দাবি উঠছে, তখন আমাদের আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুতর অসংগতি গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। বিগত দেড় দশকের প্রতিটি সুনির্দিষ্ট অপরাধের চুলচেরা বিচার যেখানে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা, সেখানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে কেবল ‘ঢালাও হত্যা মামলা’র এক ধোঁয়াশাপূর্ণ সংস্কৃতি।
পর্যাপ্ত এবং অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়া দায়ের করা এই ঢালাও মামলাগুলোর আইনি ভিত্তি এতটাই নড়বড়ে যে, ক্ষমতার সমীকরণ সামান্য ওলটপালট হলেই আসামিরা ‘রাজনৈতিক মামলা’র চিরচেনা দোহাই দিয়ে খুব সহজে জামিনে পার পেয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো, যারা এই রাষ্ট্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পঙ্গু করেছে, তাদের প্রকৃত অপরাধের ধারায় কেন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে না? মূল অপরাধের উৎসগুলোকে স্পর্শ করতে আমাদের এই দ্বিধা কেন?
বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে যে তিনটি সাধারণ নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা ছিল মূলত এক একটি সুপরিকল্পিত ‘নির্বাচন নির্বাচন খেলা’। এই তিনটি পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের কোটি কোটি মানুষের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার, তথা ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক অনিয়ম নয়, এটি ছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ (১৫তম) সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর প্রশাসন, বিচারবিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়, যার একমাত্র সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনকে নিজেদের অনুকূলে ‘ম্যানিপুলেট’ করা।
এই তিনটি অবৈধ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিস্ট সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে রাখার তথাকথিত ‘বৈধতা’ দাবি করত। আর এই কৃত্রিম বৈধতার ওপর ভর করেই তারা লিপ্ত হয়েছিল সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থ পাচার, বিরোধী মত দমন, লেখক মুশতাক আহমেদ ও কার্টুনিস্ট কিশোরের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, এবং ইলিয়াস আলীসহ শত শত মানুষকে গুম ও খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে। অর্থাৎ, বাংলাদেশে সংঘটিত প্রতিটি রাষ্ট্রীয় অপরাধের মূল উৎস ছিল এই তিনটি জালিয়াতির নির্বাচন।
কিন্তু আজ অত্যন্ত অবাক লাগে যখন দেখি, ২০ কোটি মানুষের ভোটাধিকার হরণের এই মহাকাব্যিক অপরাধের বিচারের জন্য এখনো কোনো বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়নি! বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ধ্বংস বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল বা অক্ষুণ্ন রাখা ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’র শামিল, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ২০১৪ সালের বিনা ভোটের নির্বাচন, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি নির্বাচন’—প্রতিটিই ছিল সংবিধানের এই ধারা এবং দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির (Penal Code) বিভিন্ন ধারায় চরম দণ্ডনীয় অপরাধ।
আমরা ২০১৮ সালে দেখেছি, আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যালট বাক্স সিল মেরেছে, জাল ভোট দিয়েছে এবং জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। জার্মান আইনবিদ গুস্তাভ রাডব্রুখ (Gustav Radbruch) স্বৈরাচারের পতন উত্তর আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি বিখ্যাত তত্ত্ব দিয়েছিলেন, যা 'রাডব্রুখ ফর্মুলা' নামে পরিচিত।
তিনি বলেছিলেন, “যখন কোনো আইন বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ন্যায়বিচারের ন্যূনতম স্তরকেও লঙ্ঘন করে, তখন সেই আইন আর আইন থাকে না, তা ‘আইনি অন্যায়ে’ (Statutory Injustice) পরিণত হয় এবং তার সহযোগীরা প্রত্যেকে অপরাধী।” এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কেবল শেখ হাসিনা বা তার মন্ত্রীরা নন, যারা ব্যালট বাক্স ছিনতাই করেছে বা জালিয়াতির নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছে, তারা প্রত্যেকেই এই রাষ্ট্রীয় অপরাধের সমান অংশীদার।
যদি এই ভোট জাতির সঙ্গে জড়িতদের সুনির্দিষ্ট ধারায় দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করা যেত, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বুকে এই ধরনের অপরাধ করতে সাধারণ মানুষ বা কোনো কর্মকর্তা দ্বিতীয়বার ভাবার সাহস পেত না। কিন্তু আমরা তা না করে, মূল অপরাধীদের স্রেফ ঢালাও হত্যা মামলায় আসামি করে তাদের পার পেয়ে যাওয়ার একটি অদৃশ্য সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছি।
বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করে, নতুন বাংলাদেশের চেতনাকে ধারণ করতে হলে আমাদের সস্তা আবেগ বা প্রতিশোধপরায়ণ ঢালাও মামলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ২০ কোটি মানুষের ভোটাধিকার হরণের অপরাধকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। সরকারকে অনতিবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিগত তিনটি ভুয়ো নির্বাচনের প্রধান পরিকল্পনাকারী, ইসি কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের ভোট ডাকাতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধের বিচার যদি সুনির্দিষ্ট অপরাধের ধারায় না হয়, তবে আইনি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা চিরতরে হারিয়ে যাবে এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অফ দা ওয়েস্ট অফ ইংল্যান্ড (UWE) ও ছাত্রদল নেতা