১৬ মে ২০২৬, ২০:১০

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে কর-শুল্ক সংস্কার, স্বল্পসুদে অর্থায়ন ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাবনা

ইঞ্জি. মোহাম্মদ আতাউর রহমান সরকার রোজেল  © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গভীর, জটিল, বহুমাত্রিক এবং কাঠামোগত জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই সংকট কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, কৃষি ব্যবস্থা, রপ্তানি সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও এলএনজির মূল্য অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। এর ফলে বাংলাদেশ এক ধরনের “Double Pressure” বা “Double Squeeze” পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে—একদিকে জ্বালানি সরবরাহ ঘাটতি, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ব্যয়।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত, বিশেষ করে সৌর খাত, সম্ভাবনার তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বর্তমানে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৫ শতাংশের নিচে, যেখানে বিশ্বব্যাপী এই হার ৩০ শতাংশ অতিক্রম করেছে। এই পিছিয়ে থাকার মূল কারণ প্রযুক্তিগত নয়; বরং নীতিগত, আর্থিক, কর-শুল্কসংক্রান্ত এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা।

বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে মোট প্রায় ২৮–৮৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর আরোপ করা হচ্ছে। ব্যাটারি স্টোরেজ বা Bess প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও উচ্চ শুল্ক বিদ্যমান। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ব্যবহৃত অধিকাংশ যন্ত্রপাতি—প্রায় ৯০–৯৫ শতাংশ—আমদানিনির্ভর, কারণ দেশে এখনো এই পণ্যগুলোর উল্লেখযোগ্য উৎপাদন বা ম্যানুফ্যাকচারিং সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি।

প্রচলিতভাবে আমদানি শুল্ক স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার জন্য আরোপ করা হয়। কিন্তু যে খাতে দেশীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে নেই, সেখানে উচ্চ আমদানি শুল্ক আরোপ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, প্রকল্প ব্যয় বাড়ায়, Irr কমিয়ে দেয় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করে। অন্যদিকে প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানি খাত আমদানি থেকে উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভর্তুকি এবং নীতিগত সুবিধা পেয়ে আসছে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে একটি স্পষ্ট নীতিগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার দিক থেকেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম এবং চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর শূন্য বা অত্যন্ত কম আমদানি শুল্ক, কর অব্যাহতি এবং স্বল্পসুদের অর্থায়নের মাধ্যমে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ খাতে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিশেষ করে অনেক দেশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের ওপর শুল্ক শূন্য বা খুব কম রাখা হয়েছে, যাতে Variable Renewable Energy কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়। অথচ বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাটারি আমদানির ওপরও প্রায় ৫০–৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়, যা এনার্জি স্টোরেজ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রধান প্রতিবন্ধকতাসমূহ হলো—
১. নবায়নযোগ্য সরঞ্জামে ২৮-৮৯ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও কর;
২. ব্যাটারি স্টোরেজ বা BESS প্রযুক্তিতে উচ্চ শুল্ক;
৩. ১০–১২ শতাংশ বা তার বেশি উচ্চ সুদের অর্থায়ন;
৪. রুফটপ সোলার ও রেসিডেন্সিয়াল গ্রাহকদের জন্য সহজ ঋণের অভাব;
৫. বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান তহবিলের সীমাবদ্ধতা এবং তা সকল সম্ভাব্য গ্রাহকের কাছে না পৌঁছানো;
৬. জটিল ও সময়সাপেক্ষ অনুমোদন প্রক্রিয়া;
৭. নেট মিটারিং ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক বাধা;
৮. LC Margin বেশি হওয়া;
৯. জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মধ্যে নীতিগত অসামঞ্জস্য;
১০. Rooftop Solar, Utility-Scale Solar, Floating Solar, Agrivoltaics, Solar Irrigation এবং Hybrid Solar-Storage-এর জন্য পৃথক ও সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব;
১১. Merchant Power Policy বা MPPA Policy-এর সীমাবদ্ধতা ও জটিলতা;
১২. Renewable-Friendly Tax Policy-এর অভাব;
১৩. স্থানীয় Renewable Manufacturing Ecosystem-এর দুর্বলতা;
১৪. Grid Infrastructure, Smart Grid এবং Digitalization-এর অপ্রতুলতা।

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত, ধাপভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী National Renewable Energy Roadmap গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই Roadmap স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি—এই তিন পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

স্বল্পমেয়াদে, অর্থাৎ ০–৬ মাসে, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুত সংকট প্রশমন, লোডশেডিং হ্রাস এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। এ পর্যায়ে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো জরুরি:
১. নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর Customs Duty, VAT এবং অন্যান্য কর অবিলম্বে শূন্যে নামিয়ে আনা;
২. Lithium-Ion Battery, BESS এবং Energy Storage Technology-এর ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার;
৩. Rooftop Solar স্থাপনে ১৫–৩০ দিনের মধ্যে Net Meter Approval নিশ্চিত করা;
৪. Net Metering Process সহজীকরণ এবং One-Stop Service চালু করা;
৫. শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে জরুরি ভিত্তিতে Solar Installation-এর জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রদান;
৬. স্থগিত বা বাতিল হওয়া ৩১টি Solar Project দ্রুত পুনর্মূল্যায়ন ও পুনরুজ্জীবন;
৭. Renewable Energy Project/MPP-এর জন্য Wheeling Charge যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ;
৮. Solar, Storage এবং EV Charging-এর জন্য জরুরি Policy Support প্রদান;
৯. Rooftop Solar Financing-এর জন্য Collateral-Free Low-Cost Credit Line চালু;
১০. NBR-এর মাধ্যমে Assessment Reform এবং 0% Duty বাস্তবায়নে দ্রুত নির্দেশনা প্রদান; 
১১. SREDA-কে স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। 

মধ্যমেয়াদে, অর্থাৎ ১–৩ বছরে, লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্বালানি ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং Private Sector-Led Energy Transition। এ পর্যায়ে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
১. সর্বোচ্চ ৫% সুদে ১০–১৫ বছর মেয়াদি Renewable Energy Financing Facility চালু;
২. Renewable Equipment Import-এর ক্ষেত্রে LC Margin ৫% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা;
৩. Utility-Scale Solar-এর জন্য Land Bank এবং Grid Infrastructure তৈরি;
৪. Merchant Power Policy এবং MPPA Policy সহজীকরণ;
৫. Rooftop Solar, Utility-Scale Solar এবং Hybrid Solar-Storage প্রকল্পের জন্য ১০–১৫ বছরের Tax Holiday;
৬. Rooftop Solar Project Company-এর জন্য ১০০%, ৫০%, ২৫% ধাপে Tax Holiday কাঠামো চালু;
৭. ১৭ লাখ Diesel Irrigation Pump-কে Solar Pump-এ রূপান্তরের কর্মসূচি গ্রহণ;
৮. সরকারি ভবনে Rooftop Solar বাধ্যতামূলক করা;
৯. Industrial Zone, EPZ, Economic Zone এবং Large Commercial Building-এ Rooftop Solar বাধ্যতামূলক বা Incentive-Based করা;
১০. EV Solar Charging Ecosystem তৈরি;
১১. EV-কে Distributed Energy Storage Asset হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্যে Vehicle-to-Home (V2H) এবং Vehicle-to-Grid (V2G) প্রযুক্তি গ্রহণ ও নীতিমালা প্রণয়ন; যাতে সৌরশক্তি দ্বারা চার্জকৃত EV Battery প্রয়োজন অনুযায়ী বাসাবাড়ি ও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে;
১২. Distributed Storage ব্যবস্থার জন্য EV Battery Integration নীতিমালা প্রণয়ন;
১৩. Renewable Energy Skill Development এবং কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু;
১৪. আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ছাদের ডিজাইনে সোলার ইন্সটলেশন উপযোগিতা নিশ্চিত করা;
১৫. আবাসিক ভবনের জেনারেটরের পরিবর্তে হাইব্রিড সোলার সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা। 

দীর্ঘমেয়াদে, অর্থাৎ ৩–১০ বছরে, লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি টেকসই, স্বনির্ভর, আধুনিক এবং কম-আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গঠন। এ পর্যায়ে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. ২০৩০ সালের মধ্যে ১০,০০০+ মেগাওয়াট Solar Power উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন;
২. Offshore ও Onshore Wind Energy উন্নয়ন;
৩. Floating Solar এবং River-Based Solar Project বাস্তবায়ন;
৪. Agrivoltaics এবং Climate-Resilient Solar Agriculture Model উন্নয়ন;
৫. National Energy Storage Strategy প্রণয়ন;
৬. Smart Grid এবং Power Sector Digitalization দ্রুত সম্পন্নকরণ;
৭. স্থানীয় Renewable Manufacturing Ecosystem গঠন;
৮. Solar Panel, Inverter, Mounting Structure, Battery Pack, BMS এবং EV Charging Equipment-এর স্থানীয় Assembly ও Manufacturing উৎসাহিত করা;
৯. Regional Power Trade সম্প্রসারণ;
১০. Renewable Purchase Obligation বা RPO চালু;
১১. EV, Solar এবং Storage-কে একত্রে বিবেচনা করে National Distributed Energy Policy প্রণয়ন;
১২. দীর্ঘমেয়াদে Fossil Fuel Subsidy পুনর্বিন্যাস করে Renewable Energy Transition Fund গঠন।

উপরোক্ত পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং সামাজিক সুফল অর্জন করতে পারবে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ হ্রাস পাবে, শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যয় কমে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী হবে এবং ভর্তুকির বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

একই সঙ্গে প্রতি মেগাওয়াটে ২০–২৫ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, যা বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। Rooftop Solar, Utility-Scale Solar, Solar Pump, EV Charging, Battery Storage, Smart Grid, Manufacturing, Installation, Operation and Maintenance—এসব খাতে নতুন দক্ষ জনশক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরি হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি একই সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এই মুহূর্তে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত জ্বালানি ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বনির্ভর, সাশ্রয়ী, বিনিয়োগবান্ধব এবং টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে।

এই প্রস্তাবনার মূল বার্তা হলো—“জ্বালানি সংকট কেবল সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি একটি নীতিগত কাঠামোর সমস্যা। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি—বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, এনার্জি স্টোরেজ এবং EV Integration—বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর, অর্থনৈতিক এবং টেকসই সমাধান।”

ভবিষ্যতের প্রশ্ন এটি নয় যে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রহণ করবে কি না। আসল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কত দ্রুত, কত পরিকল্পিতভাবে এবং কত সাহসিকতার সঙ্গে এই রূপান্তর সম্পন্ন করতে পারবে।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (BSREA) ও চেয়ারম্যান, ফিলামেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড
ই-মেইল: ataur.muspana@gmail.com, ataur.rojel@muspana.com