১১ মে ২০২৬, ১৭:৪৮

সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক রবীন্দ্রনাথে ঐতিহাসিক বিবর্তনঃ একটি পর্যালোচনা 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  © টিডিসি সম্পাদিত

বিএনপি যেভাবে রবীন্দ্রনাথকে তাদের সাংস্কৃতিক রাজনীতির পুঁজি বানানো শুরু করেছে এটা বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সাংস্কৃতিক বিভাজনরেখাকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে আরো অস্থিতিশীল করে তুলবে।

সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিক রবীন্দ্রনাথ হিসেবে এই বাংলায় চর্চাটা শুরু হয় পাকিস্তান আমলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের মুসলিম জাতীয়তাবাদ প্রসূত পূর্ব পাকিস্তানিদের উপর সাংস্কৃতিক নিপীড়নের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কাগজে- কলমে 'আমার সোনার বাংলা'কে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণের মধ্য দিয়ে যার চূড়ান্ত পরিণতি লাভ হয়।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। আমাদের মা, মাটি, মানুষের একটা লোকায়ত সংস্কৃতি থাকলেও আমাদের মানসের যে হীনমন্যতা- তা এই লোকায়ত সংস্কৃতির চেয়ে বড় না হলেও কোনো অংশে কম না। ফলে এই হীনমন্যতা ঢাকতে আমরা অধিকাংশ সময়ই ধর্মের দ্বারস্থ হই, কখনো পশ্চিম আবার কখনোবা প্রতিবেশীর দ্বারস্থ হতেও দ্বিধা করি না।

রবীন্দ্রনাথ আগুনসময়ে প্রতিরোধের রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে চর্চিত হলেও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে মুসলমানি না থাকায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যিক জ্ঞান করতে প্রস্তুত থাকলেও তিনি কখনো প্রায়োগিক অর্থে বাংলাদেশের মুসলমান মানসে 'জাতীয়' হয়ে ওঠতে পারেন নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে জাতীয় করে তোলার বহুমাত্রিক রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টা ঐতিহাসিকভাবে হয়ে আসছে; যার লিগ্যাসি এখন এসে বিএনপির হাতে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও সরকারকে ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথকে জাতীয় করার প্রচেষ্টা যতোটা না আমাদের তারচে বেশি ভারতের। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই প্রকল্পের প্রভাবশালী ইজারাদার আওয়ামীলীগ; যেটা তাদের ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়ার আগ পর্যন্ত বলবৎ ছিলো। ভারত ও আওয়ামিলীগ এই প্রকল্পটা যুগপৎভাবে বিভিন্ন সামাজিক- সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রি দ্বারা এই জাতির উপর রাষ্ট্রীয়ভাবে আরোপ করার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা করে গেছে।

রবীন্দ্রনাথ সন্দেহাতীতভাবে বাঙ্গালির সবচে বড় কালোত্তীর্ণ সাহিত্যিক। তাঁর উপর এপার- ওপার বাংলার যৌথ হক আছে। রবীন্দ্রনাথকে ধারণ ও চর্চার তরিকাটা হওয়া উচিৎ আরোপিত নয়; স্বতস্ফুর্ত। কিন্তু ছলেবলে, কৌশলে রাষ্ট্র যখন বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও আন্দোলনের মাধ্যমে এই ধারণ ও চর্চার তরিকাটা ঠিক করে দিতে তৎপর হয় এবং এই আরোপিত তরিকাকে কেউ খারিজ করলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শত্রুজ্ঞান করতে শুরু করে তখন প্রক্রিয়াটা স্বাভাবিক না হয়ে আরোপিত হয়ে ওঠে এবং এভাবেই সমাজ ও রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বিভাজন রেখাটা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।

দেখুন, উদীচী বা ছায়ানট কখনো কারো সাক্ষাৎ ক্ষতি করেনি। তারা শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্য- সংস্কৃতির একনিষ্ঠ চর্চায় নিয়োজিত। কিন্তু যারা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের উপর রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নিপীড়নকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তাদের সাংস্কৃতিক সহযোগী হিসেবে উদীচী, ছায়ানটের ভূমিকা পূণর্মূল্যায়নযোগ্য। নিপীড়নকারীকে তাদের সহযোগিতা করার ধরণটা কেমন? এই যে রবীন্দ্রনাথকে ধারণ ও চর্চার নিপীড়নকারী কর্তৃক আরোপিত তরিকা এবং এর বাইরের ধারণ ও চর্চার অপরাপর তরিকাকে শত্রুজ্ঞান করা- তারই বৈধতা উৎপাদনের সাংস্কৃতিক সহযোগী তারা।

ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান জনগণের কাছে আওয়ামিলীগ স্বৈরাচার হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং ছায়ানট, উদীচীর ভূমিকাটা প্রশ্নবিদ্ধ ও অমীমাংসিত।

অন্যদিকে বিএনপির যে 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে'র রাজনৈতিক দর্শন তা সার্বভৌম সীমানার ভেতরকার ইমাজিনড্ কমিউনিটি বা কল্পিত সম্প্রদায়। আওয়ামিলীগের বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদে সার্বভৌম সীমানার নিরিখে কল্পিত সম্প্রদায় নির্মাণের সীমাবদ্ধতা না থাকায় তাদের পক্ষে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ব্যবহার যতোটা সহজ বিএনপির পক্ষে অতোটা সহজ নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ সার্বভৌম সীমানার নিরিখে কল্পিত সম্প্রদায় এর ধারণার অনুগামী হওয়াতে বিএনপি বহুলাংশে ইসলামপ্রবণ। এরিই ধারাবাহিকতায় বিএনপির পক্ষে জামাতের মতো রাজনৈতিক সংগঠনকে রাজনৈতিকভাবে বৈধ করার পথ নির্মাণ করে দেওয়া রাজনৈতিক ও দার্শনিকভাবে তুলনামূলক সহজ।

এই বাস্তবতায় বিএনপি যদি আবার রবীন্দ্রনাথকে ধারণ ও চর্চার তরিকা নির্ধারণে তৎপর হয় তবে-

প্রথমত, বিএনপির রাজনৈতিক তত্ত্বের সার্বভৌম সীমান্তের প্রেক্ষিতের সাথে একটা সাংঘর্ষিক দার্শনিক অবস্থান তৈরি হবে।

দ্বিতীয়, বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের ইসলাম ও মুসলিম ইনক্লিনেশানের সাথে একটা দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি হবে।

তৃতীয়ত, বিএনপি এই তরিকা বাস্তবায়ন করতে গেলে বিভিন্ন সামাজিক- সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বা আন্দোলনকে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করা লাগবে। এইসব প্রতিষ্ঠান ও আন্দোলন তাদের টিকে থাকার স্বার্থে সবসময় ক্ষমতাসীনদের পাশাপাশি থাকতে চাওয়ায় তাদের কাছে পেতে বিএনপির বেগ পেতে হবে না সত্য; তবে এইসব প্রতিষ্ঠান ও আন্দোলনকে যেহেতু বাংলাদেশের আপামর মুসলিম সম্প্রদায় সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে ফলে বিএনপিকে ক্রমে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করবে।

চতুর্থত, বিএনপি যদি এই তরিকা আরোপ করে দেওয়ার ব্যাপারে একরোখা হয়ে ওঠে এবং বিকল্প তরিকাকে শত্রুজ্ঞান করা শুরু করে তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বিএনপি মাঠপর্যায়ে এই জনগণের তীব্র প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হবে।