২৪ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৫৫

হামদর্দ পাবলিক কলেজ: ধারাবাহিক সাফল্যের নেপথ্যে হোস্টেলে সুনিবিড় পরিচর্যা

হামদর্দ পাবলিক কলেজের হোস্টেলের চিত্র  © টিডিসি সম্পাদিত

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এইচএসসি) শতভাগ পাসের ধারাবাহিকতা, রেকর্ড জিপিএ-৫ এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের অনন্য সাফল্য—প্রতিষ্ঠার ১৬ বছরে এসব অর্জন রাজধানীর হামদর্দ পাবলিক কলেজের ঝুলিতে। প্রতিষ্ঠানটির এই ঈর্ষণীয় সাফল্যের পেছনে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং শিক্ষকদের ভূমিকা ঠিক যতটা, ততটা ভূমিকা এর সুশৃঙ্খল আবাসন ব্যবস্থারও। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজটি শুধু নিরাপদ ও মানসম্মত বাসস্থানই নিশ্চিত করছে না, কাজ করছে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য অর্জনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবেও।

প্রতিষ্ঠানটিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হামদর্দ পাবলিক কলেজের আবাসন ব্যবস্থায় যুক্ত রয়েছে মোট চারটি হোস্টেল। এর মধ্যে তিনটি ছাত্রদের। এগুলো হলো—হামদর্দ ভবন ছাত্র হোস্টেল, কলেজ ভবন ছাত্র হোস্টেল ও শান্তিনিকেতন ছাত্র হোস্টেল। এ ছাড়া ছাত্রীদের জন্য কলেজের কাছাকাছি কাঠালবাগানে রয়েছে ৯ তলাবিশিষ্ট আরেকটি হোস্টেল।

কলেজ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি হোস্টেল অভিজ্ঞ শিক্ষক-কর্মচারীদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। ফলে আবাসিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, খাবার, দৈনন্দিন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো দেখভালের জন্য কলেজের একটি প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান ব্যবস্থা রয়েছে। আবাসিক শিক্ষার্থীদের হোস্টেলগুলোতে রয়েছে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিশেষ করে ছাত্রী হোস্টেলের ভবনটি লিফট ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত।

হামদর্দ পাবলিক কলেজের হোস্টেলে মনোরম পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পড়াশোনা, তবে গুরুত্ব আছে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যেও
হামদর্দ পাবলিক কলেজের হোস্টেল কেবল আবাসনের জায়গা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। কলেজ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ‘প্রাইভেট কেয়ার’ ব্যবস্থা। এ ক্লাসে সব শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। অনুপস্থিত থাকলে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

নিয়মতান্ত্রিক ও শুঙ্খলিত জীবনযাত্রার মাধ্যমে পড়াশোনার জন্য নির্দিষ্ট সময় ও পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। নিজ নিজ কক্ষে অবস্থান করে অথবা রিডিং রুমে বসে পড়াশুনা করতে হয়। অযথা অন্যের কক্ষে প্রবেশ, অন্য শিক্ষার্থীকে নিজের কক্ষে প্রবেশ করানো এবং অন্যের পড়াশোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করার বিষয়েও রয়েছে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ। সরকারি ছুটির দিনেও হোস্টেলে অবস্থান করে পূর্বের পড়া রিভিশন দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এ ছাড়া ঘন ঘন ছুটি নেওয়ার বিষযটি নিরুৎসাহিত করা হয়।

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে হোস্টেলে প্রতিদিন তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। সকালের নাশতা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার নির্ধারিত সময়ে গ্রহণ করতে হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, খাবারের মেনু স্বাস্থ্যসম্মতভাবে নির্ধারণ করা হয়। খাবার নিয়ে শিক্ষার্থীদের কোনো পরামর্শ বা অভিযোগ থাকলে তা হোস্টেল কর্তৃপক্ষ বা সুপারদের জানানোর সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষ খাবারের মেনু পরিবর্তন করতে পারে।

শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি আবাসন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পাঠদানের নিয়ম থাকায় হামদর্দ পাবলিক কলেজের কোনো শিক্ষার্থীকে বাইরে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় না। শিক্ষকরা বলছেন, পাঠদানের প্রধান লক্ষ্য থাকে ধাপে ধাপে সহজ থেকে কঠিনতর বিষয়ের গভীরে নিয়ে যাওয়া, যাতে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে।

শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থাও। এ ছাড়া নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী গরম পানির ব্যবস্থা করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

হোস্টেলে ছাত্রীদের আনন্দ আয়োজন

হামদর্দ পাবলিক কলেজের হোস্টেল ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আবাসিক শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য। কলেজ শিক্ষকবৃন্দের তত্ত্বাবধানে প্রাইভেট কেয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি হোস্টেলে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা তো রয়েছেই, কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ তার প্রয়োজনীয় যত্ন ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্খা করে। গরম পানির প্রয়োজন হলে হোস্টেল সুপারের মাধ্যমে কিচেন থেকে তা সংগ্রহ করার নিয়মও রয়েছে। অর্থাৎ আবাসিক শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন শারীরিক প্রয়োজনের বিষয়গুলোও হোস্টেল ব্যবস্থাপনার আওতায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

শুধু পড়াশোনা নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও অবসর কাটানোর জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে কলেজর হোস্টেলে। আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেলভিত্তিক এই সুযোগ তাদের নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করে। তবে বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ। হোস্টেলের মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোনো শিক্ষার্থীর কাছে মোবাইল ফোন পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সেটি জব্দ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সিট বাতিল করার বিধান রয়েছে।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—যেমন ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব বা টিকটকে কলেজ, শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের সম্পর্কে উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করলে হোস্টেল থেকে বহিষ্কারের বিধান রয়েছে।

আবাসিক জীবনে শৃঙ্খলার ওপর জোর
হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থীদের দুই বছরের আবাসিক জীবনকে একটি শৃঙ্খলিত কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনযাপনের সমন্বিত পরিবেশ হিসেবে গড়ে তোলার এই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এর অংশ হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের আসা-যাওয়ার রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম।

হোস্টেল সন্ধ্যা

এই নিয়ম অনুযায়ী, আবাসিক শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে দুই বছরের জন্য থাকতে হয় এবং কোনোভাবেই এইচএসসি পরীক্ষার আগে হোস্টেল ত্যাগ করা যায় না। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ব্যক্তিগত প্রয়োজন, কেনাকাটা ও জুমার নামাজের জন্য ছুটির সুযোগ রয়েছে। অন্য কোনো দিনে বিশেষ জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে সাময়িক ছুটির বিষয়টি কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে।

জ্ঞান, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়াই হচ্ছে শিক্ষা। তাই নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিবিড় একাডেমিক তদারকি, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধের প্রতি আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আবাসিক ব্যবস্থার মধ্যেও এই দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে— মো. নজরুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, হামদর্দ পাবলিক কলেজ

হোস্টেল থেকে কোন প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে মোবাইল ফোনে কথা বলতে হয়। অভিভাবক ছাড়া অন্য কাউকে হোস্টেলের ভেতরে নেওয়া যায় না। বন্ধুবান্ধব, বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন বা কোনো বহিরাগতকে রাতে হোস্টেলে অবস্থান করানোর অনুমতিও নেই। কোন শিক্ষার্থী অনুমতি ছাড়া বাইরে গেলে প্রতি বারের জন্য ৫০০ টাকা জরিমানা দেওয়ার বিধান রয়েছে।

বুলিং রোধে কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে এসব হোস্টেলে। কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া হোস্টেলে ধূমপান, মাদকদ্রব্যের ব্যবহার বা সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ বস্তু, যেকোনো ধরনের ডিভাইস কিংবা ডিভাইস চার্জার রাখাও নিষিদ্ধ। ঝগড়া বা মারামারিতে জড়িত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে তাৎক্ষণিকভাবে হোস্টেল থেকে বহিষ্কারের বিধান রয়েছে।

কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, হামদর্দ পাবলিক কলেজের ধারাবাহিক সাফল্যের নেপথ্যে অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজ করে এসব সুদৃঢ় নিয়ম-শৃঙ্খলা ও কঠোর সময়ানুবর্তিতা। প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলার বিষয়ে কোনো আপস নেই। শৃঙ্খলাভঙ্গ করলে আর্থিক জরিমানা ও অভিভাবকসহ উপস্থিতির মতো সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়।

হোস্টেল বর্ষপূর্তি উদযাপন

তবে শৃঙ্খলাই সাফল্যের মূল নিয়ামক নয়। শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি আবাসন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পাঠদানের নিয়ম থাকায় হামদর্দ পাবলিক কলেজের কোনো শিক্ষার্থীকে বাইরে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় না। শিক্ষকরা বলছেন, পাঠদানের প্রধান লক্ষ্য থাকে ধাপে ধাপে সহজ থেকে কঠিনতর বিষয়ের গভীরে নিয়ে যাওয়া, যাতে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে।

হামদর্দ পাবলিক কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জ্ঞান, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়াই হচ্ছে শিক্ষা। তাই নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিবিড় একাডেমিক তদারকি, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধের প্রতি আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। আবাসিক ব্যবস্থার মধ্যেও এই দর্শনের প্রতিফলন রয়েছে।

অধ্যক্ষ বলেন, আমরা চাই, একজন শিক্ষার্থী হামদর্দ থেকে শুধু একটি ভালো ফলাফল নিয়ে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বদানে সক্ষম মানুষ হিসেবে তৈরি হোক।