শৃঙ্খলায় দৃঢ়, অর্জনে অনন্য: শ্রেষ্ঠত্বের পথে হামদর্দ পাবলিক কলেজ
২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার পর ২০১৫ সালে একটি জাতীয় বিজ্ঞান উৎসবে অংশ নেন হামদর্দ পাবলিক কলেজের একদল শিক্ষার্থী। ওই প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয়সহ তিনটি পুরস্কার ছিনিয়ে আনেন তারা। এরপর ২০২৪ পর্যন্ত ১৫টি বড় বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সর্বমোট ৭৩টি পুরস্কার ঝুলিতে নিয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। এসব প্রতিযোগিতার আরও চারটিতে অর্জন করেছেন চ্যাম্পিয়নশিপ। এছাড়া মোট ৯টিতে দ্বিতীয় স্থান বা প্রথম রানার্সআপ এবং আরও ২টিতে অর্জন করেছেন দ্বিতীয় রানার্সআপ।
বিভিন্ন অলিম্পিয়াডে হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য যেন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সাফল্যের সমান্তরাল। প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত মোট ৯টি ব্যাচে শতভাগ পাসের রেকর্ড করেছে। যে ৫টিতে শতভাগ পাস নিশ্চিত হয়নি, সেগুলোতেও ৯৮.০৩ থেকে ৯৯.৬৮ শতাংশ পাস করেছে। এছাড়া ১৪টি ব্যাচে সর্বমোট ৩ হাজার ১০৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন রেকর্ড ১ হাজার ৬৬২ জন শিক্ষার্থী। আর প্রতিষ্ঠার পর এই ৩১০৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৬৫০ জনই বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।
কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের এই ধারাবাহিক সাফল্যের মূলে রয়েছে এর সুদৃঢ় নিয়ম-শৃঙ্খলা ও কঠোর সময়ানুবর্তিতা। প্রতিদিন সকাল ৮টায় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয় শিক্ষার্থীদের। এরপর পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ, বাণী ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে দিনের সূচনা ঘটে, যা শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করে।
প্রতিষ্ঠানটিতে শৃঙ্খলার বিষয়ে কোনো আপস নেই। জানা গেছে, পরিপাটি ও নির্ধারিত ইউনিফর্ম, গলায় ঝুলানো পরিচয়পত্র, মার্জিত চুল ছাড়া ক্যাস্পাসে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া তরুণ প্রজন্মকে অপ্রয়োজনীয় আসক্তি থেকে দূরে রাখতে ক্যাম্পাসে মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে; নিয়ম ভাঙলে রয়েছে তাৎক্ষণিক বাজেয়াপ্ত করার কঠোর নিয়ম।
আরও পড়ুন: হামদর্দ পাবলিক কলেজ: যেখানে স্বপ্নেরা ডানা মেলে
প্রতিষ্ঠানটিতে ন্যূনতম ৮০% ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, আর শতভাগ উপস্থিতির জন্য শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় বিশেষ ‘অ্যাটেনডেন্স সার্টিফিকেট’। কোনো শিক্ষার্থী বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকলে বা শৃঙ্খলাভঙ্গ করলে আর্থিক জরিমানা ও অভিভাবকসহ উপস্থিতির মতো সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলাপরিপন্থী কোনো মন্তব্য প্রকাশ কিংবা কোনোপ্রকার র্যাগিং বা মারামারিতে জড়িত থাকার শাস্তি সরাসরি বহিষ্কার।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই সুনির্দিষ্ট নিয়মের শিকলই মূলত শিক্ষার্থীদের জীবনের মূল ধারায় এনে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
তবে শৃঙ্খলাই প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের মূল নিয়ামক নয়। হামদর্দ পাবলিক কলেজের নিবিড় পাঠদান কাঠামোর কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে বাইরে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় না। শিক্ষকরা বলছেন, পাঠদানের প্রধান লক্ষ্য থাকে ধাপে ধাপে সহজ থেকে কঠিনতর বিষয়ের গভীরে নিয়ে যাওয়া, যাতে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকদের পাঠদান শিক্ষার্থীদের ক্লাসের পড়া ক্লাসেই আয়ত্ত করতে সহায়তা করে। এছাড়া কলেজের অভাবনীয় ফলাফলের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো এর ‘গাইড শিক্ষক কার্যক্রম’ ও শ্রেণি শিক্ষকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ। প্রতিটি শিক্ষার্থীর পড়াশোনার অগ্রগতি, মনস্তাত্ত্বিক আচরণ ও প্রতিদিনের উপস্থিতির সার্বিক খেয়াল রাখেন একজন নির্দিষ্ট গাইড শিক্ষক। আবাসিক বা হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের সান্ধ্যকালীন পাঠদানের জন্য রয়েছে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের সার্বক্ষণিক নিবিড় যত্ন।
আমরা চাই, একজন শিক্ষার্থী হামদর্দ থেকে শুধু একটি ভালো ফলাফল নিয়ে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বদানে সক্ষম মানুষ হিসেবে তৈরি হোক— মো. নজরুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, হামদর্দ পাবলিক কলেজ
কলেজ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষা পদ্ধতি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত। প্রতিটি পার্বিক পরীক্ষার পূর্বে ৪টি কুইজ টেস্ট এবং ২টি করে মাসিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কুইজের ১০%, মাসিক পরীক্ষার ১০% এবং পার্বিক পরীক্ষার ৮০% নম্বর মিলিয়ে চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করা হয়।
এছাড়া শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ‘বেসিক টেস্ট’-এর মাধ্যমে মেধাভিত্তিক সেকশন নির্ধারণ করা হয়। পিছিয়ে পড়া দুর্বল শিক্ষার্থীদের টেনে তুলতে রয়েছে ‘স্পেশাল ক্লাস’, ‘কুইজ’ এবং ‘এফআরটি (ফেইল রিকভারি টিম)’-এর মতো বিশেষ উদ্যোগ। যেকোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে শিক্ষার্থীদের রিটেক টেস্টে অংশ নিয়ে নিজেকে শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এইচএসসি পরীক্ষার আগে অধ্যায়ভিত্তিক প্রাত্যহিক পরীক্ষা ও চূড়ান্ত মডেল টেস্ট শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিষয়ে শতভাগ প্রস্তুত করে তোলে।
আরও পড়ুন: শতভাগ পাশ, ৭০% জিপিএ-৫: হামদর্দ পাবলিক কলেজের এক দশকের সাফল্যের গল্প
তবে কেবল শ্রেণিকক্ষেই নয়, ঘরের পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে বছরে দুইবার অনুষ্ঠিত হয় ‘শিক্ষক-অভিভাবক মতবিনিময় সভা’। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষককের এই ত্রয়ী যোগাযোগের মাধ্যমে অভিভাবকরা তাদের সন্তানের একাডেমিক অগ্রগতি ও আচরণ সম্পর্কে সরাসরি মতামত জানতে ও জানাতে পারেন। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের বিষণ্নতা কাটানো ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের দিকে চালিত করতে অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী দ্বারা নিয়মিত কাউন্সেলিং প্রদান করা হয়।
নেতৃত্ব ও সহ-পাঠ্যক্রমিক জীবনের উন্মুক্ত ক্যানভাস
কঠোর শৃঙ্খলা আর অধ্যয়নই সব নয়। আধুনিক ও যুগোপযোগী পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে চলা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি সৃষ্টির লক্ষ্যে হামদর্দ পাবলিক কলেজে সক্রিয় রয়েছে ১৯টি ক্লাব। শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত একটি সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া ও স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনে যুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক।
শিক্ষাসহায়ক এসব ক্লাবের মধ্যে রয়েছে—বিজ্ঞান ক্লাব, সাহিত্য সংসদ, সাংস্কৃতিক ক্লাব, রোভার স্কাউট, স্পোর্টস অ্যান্ড ফিটনেস ক্লাব বিজনেস ক্লাব, আইটি ক্লাব, ট্যুর ক্লাব, মেডিটেশন সোসাইটি, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব, সমাজ কল্যাণ ক্লাব, আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট ক্লাব, ডিবেট ক্লাব, গার্লস গাইড, ফটোগ্রাফি অ্যান্ড ভিডিওগ্রাফি ক্লাব, অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব, পরিবেশ ক্লাব, ক্যারিয়ার ক্লাব এবং মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন ক্লাব।
আমরা সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম, নেতৃত্বের চর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের সুপ্ত প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করি— মো. নজরুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, হামদর্দ পাবলিক কলেজ
জাতীয় পর্যায়ের নানা অলিম্পিয়াড ও প্রতিযোগিতায় এসব ক্লাবের মেধার প্রমাণ মেলে নিয়মিত। ২০১৫ সালে প্রথমবার জাতীয় বিজ্ঞান উৎসবে অংশ নিয়েই প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানসহ ৩টি পুরস্কার অর্জন করেন ক্লাবের সদস্যরা। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অলিম্পিয়াডের মধ্যে ২০২২ সালে বুয়েট বিজ্ঞান ক্লাব আয়োজিত জাতীয় বিজ্ঞান উৎসবে মেগা পুরস্কারসহ চ্যাম্পিয়ন অব দ্য চ্যাম্পিয়ন অর্জন করেন তারা। এরপর তারা ২০২৩ সালে জাতীয় এনভায়রনমেন্ট কার্নিভালের কুইজ ক্যাটাগরি, ২০২৩ সালে শহিদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট ক্লাবের ন্যাশনাল ক্রিয়েটিভ কার্নিভাল এবং ২০২৪ সালে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ বিজ্ঞান ক্লাব আয়োজিত ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যান্ড কোডিয়েভর ইন্টারন্যাশনালে সায়েন্স ফিকশন বেজড কুইজ ক্যাটাগরিতে চ্যাম্পিয়নশিপ ছিনিয়ে আনেন।
এদিকে পড়াশোনার একঘেয়েমি দূর করতে এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রশান্তির জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও উৎসবের আয়োজন করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী পিঠা উৎসব, বৈশাখী মেলা এবং বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের সংস্কৃতি ও জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিবিড় পরিচয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
আরও পড়ুন: হামদর্দ পাবলিক কলেজে ‘এক্সপোজার ফটোগ্রাফি কনটেস্ট-২০২৫’ অনুষ্ঠিত
হামদর্দ পাবলিক কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষা শুধু ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য নয়; শিক্ষা হলো একজন শিক্ষার্থীকে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাসে সমৃদ্ধ করে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া। তাই নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিবিড় একাডেমিক তদারকি, শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধের প্রতি আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
তিনি বলেন, একই সঙ্গে আমরা সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম, নেতৃত্বের চর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের সুপ্ত প্রতিভা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করি।
অধ্যক্ষ বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক ফলাফল, দেশের স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সাফল্য এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে তাদের কৃতিত্ব—হামদর্দের এই শিক্ষা-দর্শনেরই প্রতিফলন। আমরা চাই, একজন শিক্ষার্থী হামদর্দ থেকে শুধু একটি ভালো ফলাফল নিয়ে নয়, বরং একজন আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ, দায়িত্বশীল ও নেতৃত্বদানে সক্ষম মানুষ হিসেবে তৈরি হোক।