নেই শিক্ষক, সংকট কম্পিউটারের, এক যুগেও পূরণ হয়নি আইসিটি শিক্ষার ঘাটতি
একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়টি বাধ্যতামূলক হওয়ার এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশের সব কলেজে এখনো নিশ্চিত হয়নি আইসিটি শিক্ষার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষক। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৪) অনুযায়ী, দেশে বিভিন্ন পর্যায়ের মোট চার হাজার ৮৭৬টি কলেজে আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন পাঁচ হাজার পাঁচজন। তবে এখনো ২০৭টি কলেজে কম্পিউটার সুবিধাই নেই।
ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের চার হাজার ৮৭৬টি কলেজের মধ্যে মহিলা কলেজ ৭৯২টি। সরকারি কলেজের সংখ্যা ৭০৫টি এবং বেসরকারি কলেজ চার হাজার ১৭১টি। এসবের মধ্যে স্কুল ও কলেজ (কলেজ পর্যায়) এক হাজার ৫১৪টি, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ এক হাজার ৪২২টি, ডিগ্রি (পাসকোর্স) কলেজ এক হাজার ৪৭টি, ডিগ্রি (অনার্স) কলেজ ৬৯৫টি এবং মাস্টার্স কলেজ রয়েছে ১৯৮টি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের কলেজে মোট শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৭৮৯ জন, যার মধ্যে নারী শিক্ষক ৩৭ হাজার ২৫২ জন। এর মধ্যে আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পাঁচ হাজার পাঁচজন।
আইসিটি শিক্ষকদের বণ্টন বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্কুল ও কলেজ (কলেজ পর্যায়) মিলিয়ে এক হাজার ৮৬৩ জন আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন, যার মধ্যে এক হাজার ৮০০ জন বেসরকারি এবং মাত্র ৬৩ জন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে এক হাজার ৪৭৯ জন, ডিগ্রি (পাসকোর্স) কলেজে এক হাজার ১৯৯ জন, ডিগ্রি (অনার্স) কলেজে ৭৬৩ জন এবং মাস্টার্স কলেজে ২০১ জন আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন।
২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) পরিসংখ্যান কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘ব্যানবেইসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রতিবেদন ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত হয়নি। এটি শিগগিরই প্রকাশিত হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত দেশের কতটি কলেজে আইসিটি শিক্ষক রয়েছে, কতটিতে নেই এবং কোথায় আইসিটি ল্যাব সুবিধা আছে, এসব তথ্য ব্যানবেইসের কাছে থাকতে পারে। তবে যেহেতু সর্বশেষ প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত হয়নি।’
অন্যদিকে, চার হাজার ৮৭৬টি কলেজের মধ্যে ২০৭ টিতে কম্পিউটার সুবিধা নেই। এর মধ্যে স্কুল ও কলেজ (কলেজ পর্যায়) ২৯টি, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ ১৬৪টি, ডিগ্রি (পাসকোর্স) কলেজ ১০টি, ডিগ্রি (অনার্স) কলেজ দুটি এবং একটি মাস্টার্স কলেজে কম্পিউটার সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
‘আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করে তা বাস্তবায়ন করায় শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছে না। আইসিটি এমন একটি বিষয়, যা শুধু বই পড়ে বা বোর্ডে লিখে শেখানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক, কম্পিউটার ল্যাব ও ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ প্রয়োজন।’—অধ্যাপক ড. বিএম মাইনুল হোসাইন, পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বিএম মাইনুল হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করে তা বাস্তবায়ন করায় শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছে না। আইসিটি এমন একটি বিষয়, যা শুধু বই পড়ে বা বোর্ডে লিখে শেখানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক, কম্পিউটার ল্যাব ও ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. অনিন্দ্য ইকবাল বলেন, ‘একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে আইসিটি বিষয়টি বাধ্যতামূলক হওয়ার এক দশকের বেশি সময় পরও অনেক কলেজে আইসিটি শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি থাকা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করলেই হবে না, এটি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।’
জানা গেছে, ২০১৩ সালে কলেজ পর্যায়ে আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হলেও সরকারি কলেজে আইসিটি বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে প্রভাষক পদে মাত্র ১৭০ জন নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছিল।
নতুন শিক্ষক নিয়ােগের বিষয়ে অধ্যাপক ড. বিএম মাইনুল হোসাইন বলেন, ‘শুধু শিক্ষক নিয়োগ দিলেই হবে না, আইসিটি একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিষয় হওয়ায় শিক্ষকদেরও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থাকতে হবে। একই সঙ্গে কারিকুলাম প্রণয়নের সময় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বর্তমানে শিক্ষক সংকট, দক্ষতার ঘাটতি এবং বাস্তবসম্মত কারিকুলামের অভাব— সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা আইসিটি বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে।’
‘শিক্ষক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা উদ্যোগগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে কলেজ পর্যায়ে ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।’—অধ্যাপক ড. অনিন্দ্য ইকবাল, সিএসই বিভাগ, বুয়েট
আইসিটি শিক্ষাকে আরও কার্যকর করতে অধ্যাপক ড. অনিন্দ্য ইকবাল বলেন, ‘শিক্ষক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা উদ্যোগগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে কলেজ পর্যায়ে ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইসিটির শিক্ষক সংকটে অনেক কলেজে আইসিটি বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছেন বাংলা, ইংরেজি, দর্শন এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিক্ষকেরা। কিছু কলেজে আবার অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা, রসায়ন, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান বা গণিতের শিক্ষকেরা আইসিটি পড়াচ্ছেন। এই শিক্ষকরা কয়েক মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
আরও পড়ুন : জুলাই শহীদ ছেলের অনুদানের টাকায় বাবা আনলেন নতুন বউ
আইসিটি শিক্ষক সংকটে অন্য বিষয়ের শিক্ষকের ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে অধ্যাপক ড. বিএম মাইনুল হোসাইন বলেন, ‘এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইসিটির প্রতি আগ্রহ তৈরির পরিবর্তে এক ধরনের ভীতি ও অনাগ্রহ সৃষ্টি করেছে। সরকারের উদ্দেশ্য ভালো হলেও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে এর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসেও শিক্ষার্থীদের অনেক মৌলিক বিষয় নতুন করে শেখাতে হচ্ছে। তাই আইসিটি শিক্ষাকে কার্যকর করতে শিক্ষক নিয়োগ, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাস্তবভিত্তিক কারিকুলাম প্রণয়নের দিকে এখনই গুরুত্ব দিতে হবে।’
অধ্যাপক ড. অনিন্দ্য ইকবাল বলেন, ‘এই সংকটের সমাধানে সবচেয়ে জরুরি হলো বাস্তবায়নযোগ্য কারিকুলাম প্রণয়ন, ডিজিটাল শিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিক্ষক স্বল্পতা মোকাবিলায় বিকল্প ও উদ্ভাবনী শিক্ষণ পদ্ধতি চালু করা। এটি স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান কারিকুলামে মুখস্থনির্ভরতার প্রবণতা বেশি। বিশেষ করে প্রোগ্রামিং শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের দিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অথচ ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও কম্পিউটার বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হলে প্রোগ্রামিং ও হাতে-কলমে শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। সে কারণে কারিকুলাম এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে বাস্তব দক্ষতা অর্জনই প্রধান লক্ষ্য হয়।’