২৭ জুন ২০২৬, ২১:০৮

ব্যবহারিক না শিখেই এইচএসসি পরীক্ষায় বসবেন শিক্ষার্থীরা!

ব্যবহারিক শেখায় ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা  © এআই জেনারেটেড ছবি

আর কিছুদিন পরই শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা। পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ ব্যবহারিক। তবে ব্যবাহারিক শেখার সুযোগই হয়নি লালমনিরহাট সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজা মেহেলির। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, ‘কলেজে প্রদর্শক নেই, ক্লাস টিচাররাও সেভাবে ব্যবহারিক শেখায়নি। স্যাররা ব্যবহারিক বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমাদের লিখে নিয়ে আসতে বলেন। হাতে কলমে কোনো কিছু শেখানো হয় না। বিষয়টি কলেজ অধ্যক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন সরকার প্রদর্শক নিয়োগ দেয় না। এজন্য এই অবস্থা তৈরি হয়েছে।

একই অবস্থা শেরপুরের শ্রীবরদী সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. সামিনেরও। ব্যবহারিকের নামে কেবল প্র্যাকটিক্যাল খাতাই লিখেছেন তিনি। সামিন বলেন, ‘ব্যবহারিক ল্যাবে যাওয়ারই সুযোগ হয়নি। শ্রেণি শিক্ষকরা কেবল প্র্যাকটিক্যাল খাতা লেখায় গুরুত্ব দিয়েছেন। যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো লিখে নিয়ে আসতে বলেছেন।’

শুধু এই দুই কলেজের পরীক্ষার্থীই নয়; আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা সঠিকভাবে ব্যবহারিক শিখতে পেরেছেন কিনা সে সম্পর্কে জানতে সারা দেশের ২০টি ভিন্ন ভিন্ন কলেজের ২০ জন পরীক্ষার্থীর সাথে কথা বলেছে এ প্রতিবেদক। ব্যবহারিক শিক্ষা নিয়ে অধিকাংশ কলেজের শিক্ষার্থী একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা নিয়ে এমন দৈন্যদশার কারণ দীর্ঘদিন ধরে কলেজগুলোতে প্রদর্শক নিয়োগ না হওয়ার বিষয়টি প্রকটভাবে সামনে এসেছে। প্রদর্শক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ব্যবহারিক ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে তারা পরীক্ষাগারে যন্ত্রপাতি ব্যবহার, পরীক্ষণ পদ্ধতি, পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল বিশ্লেষণের মতো মৌলিক দক্ষতা অর্জন না করেই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এতে পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতার ক্ষেত্রে তারা পিছিয়ে থাকছে, যা শিক্ষার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে।

এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরাই। উচ্চশিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল, প্রকৌশল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক অন্যান্য বিষয়ে ভর্তি হওয়ার পর ব্যবহারিক দক্ষতার অভাব তাদের স্পষ্টভাবে দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে ল্যাবভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা ও হাতে-কলমে কাজের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেখানে মৌলিক ব্যবহারিক জ্ঞান না থাকায় তারা নতুন বিষয় বুঝতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে সহপাঠীদের তুলনায় তারা পিছিয়ে পড়ছে, আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত একাডেমিক সাফল্য অর্জন কঠিন হয়ে উঠছে।

সারা দেশে সরকারি কলেজের সংখ্যা ৭০৮টি। এসব কলেজের রসায়ন, পদার্থ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, কৃষি, জীববিজ্ঞান, গনিত, ভুগোল, মৃত্তিকাবিজ্ঞান এবং গার্হস্থ্য বিষয়ে ব্যবহারিক ক্লাস নেন প্রদর্শকরা। তবে অধিকাংশ কলেজেই প্রদর্শকের পদ ফাঁকা রয়েছে। ব্যবহারিক ক্লাস নিচ্ছেন প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক কিংবা সহযোগী অধ্যাপকরা।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, সারা দেশে সরকারি কলেজের সংখ্যা ৭০৮টি। এসব কলেজের রসায়ন, পদার্থ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, কৃষি, জীববিজ্ঞান, গনিত, ভুগোল, মৃত্তিকাবিজ্ঞান এবং গার্হস্থ্য বিষয়ে ব্যবহারিক ক্লাস নেন প্রদর্শকরা। তবে অধিকাংশ কলেজেই প্রদর্শকের পদ ফাঁকা রয়েছে। ব্যবহারিক ক্লাস নিচ্ছেন প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক কিংবা সহযোগী অধ্যাপকরা। নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি ব্যবহারিক ক্লাস নেওয়ার কারণে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে পরিপূর্ণ ব্যবহারিক শিক্ষা থেকে।

যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের দাবি, কলেজগুলোতে ব্যবহারিক যথাযথভাবেই শেখানো হচ্ছে। সংকট নিরসনে প্রদর্শক নিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও দীর্ঘ ছয় বছর ধরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ৬১০টি পদের নিয়োগ কার্যক্রম ঝুলে রয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ওটা (প্রদর্শকের ফল) আমরা দেখিনি। বিষয়টি নিয়ে পরে কথা বলব।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কলেজগুলোতে প্রায় দুই হাজার প্রদর্শকের পদ ফাঁকা রয়েছে। সর্বশেষ কলেজে প্রদর্শক নিয়োগ হয়েছিল ২০১৭ সালে। ওই সময় যারা নিয়োগ পেয়েছিলে ইতোমধ্যে তাদের পদোন্নতি হয়েছে। তবে পদায়ন হয়নি। পদায়ন হলে ৯৫ শতাংশ কলেজে একজন করে প্রদর্শকও থাকবে না বলে মত সংশ্লিষ্টদের। ফলে সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

শিক্ষাবিদদের মতে, বিজ্ঞান শিক্ষা কেবল তাত্ত্বিক পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; ব্যবহারিক শিক্ষাই এর মূল ভিত্তি। তাই কলেজগুলোতে দ্রুত পর্যাপ্ত প্রদর্শক নিয়োগ, ল্যাব কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা এবং কার্যকর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর ব্যবহারিক দক্ষতাহীন শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করবে, যা শুধু তাদের ব্যক্তিগত শিক্ষাজীবনই নয়, ভবিষ্যতের দক্ষ বিজ্ঞানী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ তৈরির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের যা শেখানো হয় তা অপ্রতুল। এটা বাড়াতে হলে শিক্ষক এবং প্রদর্শক নিয়োগ বাড়াতে হবে। যেখানে ১০ জন প্রদর্শক থাকার কথা, সেখানে দুইজনও নেই। পাশাপাশি লার্নিং গ্যাপও কমাতে হবে। এগুলো না হলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না।’

‘উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের যা শেখানো হয় তা অপ্রতুল। এটা বাড়াতে হলে শিক্ষক এবং প্রদর্শক নিয়োগ বাড়াতে হবে। যেখানে ১০ জন প্রদর্শক থাকার কথা, সেখানে দুইজনও নেই। পাশাপাশি লার্নিং গ্যাপও কমাতে হবে। এগুলো না হলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান হবে না।’-মোহাম্মদ মজিবুর রহমান, ঢাবি অধ্যাপক

ছয় বছর ধরে ঝুলে আছে ৬০০ প্রদর্শক নিয়োগের ফল
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ২০২০ সালের প্রদর্শক পদের নিয়োগ গত ছয় বছরেও পূর্ণাঙ্গ আলোর মুখ দেখেনি। মাউশির এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ২৮টি ক্যাটাগরির মধ্যে অধিকাংশ পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া ২০২৩ সালে শেষ হলেও প্রদর্শক, গবেষণা সহকারী, সহকারী গ্রন্থাগারিক কাম- ক্যাটালগার এবং ল্যাবরেটরি সহকারীর ফলাফল আটকে দেয় কর্তৃপক্ষ। ২০২৪ সালের জুনে মৌখিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরও ফলাফল প্রকাশে গড়িমসি শুরু হলে চাকরিপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন।

প্রার্থীরা জানান, কোটা-সংক্রান্ত জটিলতা নিষ্পত্তি এবং গত বছরের এপ্রিলে বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির (ডিপিসি) সভা হওয়ার পরও যখন চূড়ান্ত ফল আসেনি, তখন তারা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কোনো প্রশাসনিক সুরাহা না পেয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ে ১০ জন প্রার্থীর একটি প্রতিনিধিদল হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মাউশিকে বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশনার জবাবে গত ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মাউশি এক চিঠিতে প্রার্থীদের জানায়, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ থাকায় বর্তমানে দুদকের তদন্ত কার্যক্রম চলছে। দুদকের এই তদন্ত চলায় মাউশি ফলাফল প্রকাশে আইনগতভাবে অপারগতা প্রকাশ করে। মূলত নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার কারণেই বিষয়টি দুদক পর্যন্ত গড়ায়। তবে প্রার্থীরা বলছেন, হাতে গোনা কয়েকজনের অনিয়মের জন্য হাজার হাজার সাধারণ প্রার্থীর ক্যারিয়ার নষ্ট করা হচ্ছে।

পরবর্তীতে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক আদেশে দুদককে ৯০ দিনের সময় বেঁধে দেন তদন্ত প্রতিবেদন মাউশিতে দাখিল করার জন্য। গত ২৮ ডিসেম্বর দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আদেশের কপি গ্রহণ করে। তবে নিয়মিত মহাপরিচালক না থাকায় তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে পারেনি দুদক বলে জানা গেছে।

লিটন নামে এক ফল প্রত্যাশী বলেন, ‘প্রদর্শক পদের ফলপ্রত্যাশীরা নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে কিনা সেটি জানতে দুদকে আবেদন করেছিল। দুদক আমাদের লিখিত দিয়ে জানিয়েছে, দুর্নীতির কোনো আলামত জমা পড়েনি। বিষয়টি থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মাউশি ইচ্ছা করলেই ফল প্রকাশ করতে পারে। তবে তারা ফল প্রকাশে গড়িমসি করছে।’

জাকারিয়া নামে আরেক ফল প্রত্যাশী বলেন, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে যেন আর কোনো যোগ্য প্রার্থীর স্বপ্ন শেষ না হয়। অনিয়ম যারা করেছেন, তাদের শনাক্ত করা হোক; কিন্তু পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া যেন আর একদিনও আটকে না থাকে। দ্রুত ফল প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘প্রদর্শক পদের ফলাফল নিয়ে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। আদালতে মামলা এবং দুদকে তদন্ত চলছে। বিষয়গুলো সমাধান হওয়ার পর এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।’