ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণার পর পদত্যাগ এক নেতার, অন্তঃকোন্দল প্রকাশ্যে!
রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার পরপরই সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। কমিটি ঘোষণার একদিনের মধ্যেই নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি মো. সামিউল ইসলাম (শিমুল) পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে কমিটির পদ বণ্টন নিয়ে ত্যাগী কর্মীদের বঞ্চিত করা, প্রভাব খাটিয়ে পদ পাওয়া এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৮ জুন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ রাজশাহী কলেজ শাখার আংশিক কমিটি অনুমোদন দেয়। কমিটিতে সভাপতি হিসেবে মো. আমিনুল ইসলাম, সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে জুবায়ের রশীদ, সহ-সভাপতি হিসেবে সামিউল ইসলাম শিমুল, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাশেকুজ্জামান প্রীতম, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ নূর মোহাম্মদ ইমন, সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে নেহাল আহমেদ রায়হান এবং প্রচার সম্পাদক হিসেবে মো. জুবাইদ হাসান (যতন) দায়িত্ব পান।
একই সঙ্গে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন এবং ৬০ দিনের মধ্যে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
কমিটি ঘোষণার পরপরই কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশে পাঠানো পদত্যাগপত্রে সামিউল ইসলাম শিমুল দাবি করেন, দীর্ঘ ৬-৭ বছর ধরে রাজশাহী কলেজ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি।
তিনি বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থেকে কাজ করেছি। কিন্তু কমিটি গঠনের সময় এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বরং অনেক অনিয়মিত, নিষ্ক্রিয় এবং নতুন সদস্যকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে।
শিমুল আরও বলেন, সম্মুখ সারিতে যারা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। আবার ৫ আগস্টের পর রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া অনেককেই বড় পদ দেওয়া হয়েছে। এই অবমূল্যায়নের কারণেই আমি পদত্যাগপত্র কেন্দ্রে পাঠিয়েছি।
কমিটি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে সিনিয়র সহ-সভাপতি জুবায়ের রশীদের বিরুদ্ধে পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে পদ পাওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।
পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, তিনি রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদের ছেলে এবং অতীতে ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা না থাকলেও পারিবারিক প্রভাবের কারণে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জুবায়ের রশীদ। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। আমি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে এবং পরেও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। পারিবারিক আধিপত্যের মাধ্যমে পদ নেওয়ার অভিযোগও ভিত্তিহীন।
ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি কট্টর ছাত্রদল কর্মী হিসেবেই পরিচিত ছিলাম। একটি সামাজিক কমিউনিটির দায়িত্বে থাকায় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে ছবি ছিল। এখন সেসব ছবি ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
ছাত্রদলের একাধিক নেতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন কমিটি ঘোষণার পর কলেজ শাখার ভেতরে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এক পক্ষ কমিটিকে স্বাগত জানালেও অন্য পক্ষ নিজেদের বঞ্চিত মনে করছে।
তাদের মতে, কমিটি ঘোষণার মাত্র একদিনের মাথায় পদত্যাগ, প্রকাশ্য অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ।
নবগঠিত কমিটিতে পদ না পাওয়া মো. রুহুল আমীন অভিযোগ করেন, কমিটিতে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি।
তিনি বলেন, যারা আন্দোলন-সংগ্রামে বুক চিতিয়ে সামনে থেকেছে তাদের অনেকেই উপেক্ষিত হয়েছে। অন্যদিকে হাইব্রিড ও সুসময়ের রাজনীতিকদের বড় পদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কমিটিতে এমন ব্যক্তিকেও গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে যিনি কখনো ব্যানার পর্যন্ত ধরেননি। পারিবারিক প্রভাব ও লবিংয়ের মাধ্যমে নেতৃত্বে আসার সংস্কৃতি এখনো বন্ধ হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন ইউনিটের কমিটি অনুমোদনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তোলেন তিনি।
নবঘোষিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাশেকুজ্জামান প্রীতম বলেন, আংশিক কমিটি হওয়ায় অনেককে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সময় যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে। সবাই কমবেশি সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয় ছিল। যোগ্যতার ভিত্তিতেই পদ দেওয়া হয়েছে।