নিয়মের তোয়াক্কা না করেই মাসিক আড়াই লাখ টাকা বেতনে চুক্তিভিত্তিক অধ্যক্ষ নিয়োগ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দেশের বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলি রেগুলেশন বিধি অনুযায়ী, অধ্যক্ষ পদ শূন্য হলে প্রতিষ্ঠানটির উপধ্যক্ষ বা জ্যেষ্ঠতম ৫ জন শিক্ষকের মধ্য থেকে একজনকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিতে হবে। পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে বিধি মোতাবেক অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে হবে। তাছাড়া পরবর্তী এক বছরের মধ্যে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে বিধিতে।
কিন্তু রাজধানী ঢাকার শান্তিনগরে অবস্থিত বেসরকারি হাবিবুল্লাহ্ বাহার কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব বিধির কোনো তোয়াক্কা না করেই দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক অধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বাইরের একজনকে। যার মাসিক বেতন ধরা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা, যা অস্বাভাবিক বলছে সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে কলেজের এক শিক্ষার্থী হাইকোর্টে রিট করলে টনক নড়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুইবার চিঠি দিয়ে বিধি অনুযায়ী কলেজ অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বললেও তা মানছে না কলেজ কর্তৃপক্ষ।
সর্বশেষ গত মাসে দেওয়া এক চিঠিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে সরিয়ে বিধি অনুযায়ী নতুন আরেকজনকে দায়িত্ব দিতে বলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। যদি সেটি না করা হয় কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্তি কেন বাতিল করা হবে না বলে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
এদিকে, অধ্যক্ষকে অপসারণ ও তার আর্থিক দুর্নীতির বিচারের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল ১১টায় কলেজের সামনে এক মানববন্ধনের ডাক দেওয়া হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এ মানববন্ধনটি পালন করা হবে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. তৌফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শোকজের পর হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়েছে। রিটে আবার এটাকে স্টে অর্ডার দিয়েছেন আদালত।
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে পরবর্তীতে কথা বলতে অনুরোধ করেন এই প্রতিবেদককে। এছাড়া বিস্তারিত জানতে তিনি অভিযুক্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
জানা যায়, গত বছরের ১৫ মে কলেজের গভর্নিং বডির এক সভায় কর্নেল (অব.) ইমরুল কায়েসকে অধ্যক্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। পরে ২০ মে তাকে নিয়োগপত্র প্রদান করা হলে পরবর্তীতে তিনি যোগদান করে। নিয়োগপত্রে মাসিক ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেতনসহ সরকারি অন্যান্য অনুদান ও ভাতা প্রদানের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এই নিয়োগের কপি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, অধ্যক্ষ ইমরুল কায়েস ওই প্রতিষ্ঠানে আগে থেকে কর্মরত কোনো শিক্ষক নন। তার সেনাবাহিনী পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরির অভিজ্ঞতা রয়েছে। এক্ষেত্রে মানা হয়নি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি। তাছাড়া চুক্তিভিত্তিক এমন নিয়োগ বিধিবর্হিভূত। যদিও বিশেষ প্রয়োজনে নিয়োগ দিতে গেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি আগে নিতে হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনোটিই মানেনি।
গত বছরের নভেম্বরে এ নিয়োগের চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হাইকোর্টে রিট করেন কলেজটির এক শিক্ষার্থী। পরে গত ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একটি চিঠি দিয়ে কলেজের সভাপতিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, অধ্যক্ষ নিয়োগে অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলি রেগুলেশন (সংশোধিত) ২০১৯-এর বিধি ৫ (ক), ৫(গ) ও ৫(ঙ) উপেক্ষা করা হয়েছে। তাই নিয়োগটি বাতিল করে বিধি অনুযায়ী একজন ভারপ্রাপ্তকে এই দায়িত্ব দিতে বলা হয়েছে। এজন্য কলেজের জেষ্ঠ্যতম ১০ শিক্ষকের মধ্যে ৩ জনের একটি তালিকাও চেয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
একইসঙ্গে গত বছর ২৪ নভেম্বর কলেজের শিক্ষার্থী মো. জাকির মাহমুদ কর্তৃক হাইকোর্টের রিট পিটিশনও নিষ্পত্তি করা হলো বলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠিতে বলা হয়। তবে চিঠি মোতাবেক কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় গত মাসে ফের চিঠি দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে সরিয়ে বিধি অনুযায়ী নতুন আরেকজনকে দায়িত্ব দিতে বলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। যদি সেটি না করা হয় কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্তি কেন বাতিল করা হবে না বলে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
এদিকে, কলেজের অধ্যক্ষ কর্নেল (অব:) ইমরুল কায়েসকে অপসারণ ও তার ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির বিচারের দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় কলেজের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এক মানববন্ধন ডাক দেওয়া হয়েছে।
যা আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত দেশের বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলি রেগুলেশন বিধির ৫(ঘ)-তে বলা আছে, অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচনি কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত এবং গভর্নিং বডি কর্তৃক অনুমোদিত প্রার্থীকে নিয়োগ প্রদানের পূর্বে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। তবে হাবিবুল্লাহ্ বাহার কলেজে এ ধরনের অনুমতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
এছাড়া বিধির ৪ ২(i)-তে বলা আছে, কলেজে অধ্যক্ষ পদ শূন্য হলে/অধ্যক্ষের অবর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে উপাধ্যক্ষ/জ্যেষ্ঠতম ৫ জন শিক্ষকের মধ্য থেকে যে কোনো একজনকে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে এবং সেইসঙ্গে পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে বিধি মোতাবেক অধ্যক্ষ নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদানের ১ বছরের মধ্যে নিয়মিত অধ্যক্ষ নিয়োগদান করতে ব্যর্থ হলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের স্বাক্ষরকৃত কাগজপত্র ও কার্যবিবরণী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্বীকৃত অথবা গৃহীত হবে না বলে এতে বলা হয়।
এ ছাড়া ৪ ২(ii)-তে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অধিভুক্ত/স্বীকৃত বিষয়সমূহের শিক্ষকদের মধ্যে থেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করতে হবে।