মায়ের কিডনি নিয়েও বাঁচানো গেল না ছেলেকে, প্রতিস্থাপনের ৩২ দিন পর মৃত্যু
সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে, তাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনতে নিজের শরীরের একটি কিডনিও দিতে দ্বিধা করেননি মা। ভেবেছিলেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ছেলে আবার সুস্থ হয়ে উঠবে, ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু মায়ের সেই আত্মত্যাগও শেষ পর্যন্ত ছেলেকে বাঁচাতে পারল না। কিডনি প্রতিস্থাপনের ৩২ দিন পর মারা গেলেন জিসান তালুকদার জনি (৩৫)।
গতকাল রোববার (৮ নভেম্বর) সকালে ঢাকার একটি কিডনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মায়ের কিডনি নিয়েও ছেলেকে বাঁচাতে না পারার এই বেদনায় শোকাহত পরিবার ও স্বজনেরা।
জনি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার রানীশিমূল ইউনিয়নের ভায়াডাঙ্গা এলাকার বাঘা গ্রামের তালুকদার বাড়ির মৃত জাহাঙ্গীর তালুকদারের ছোট ছেলে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ১৪ বছর বয়সী এক ছেলে ও ছয় বছর বয়সী এক মেয়ে রেখে গেছেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে জনির কিডনির জটিলতা ধরা পড়ে। এরপর শুরু হয় চিকিৎসার দীর্ঘ সংগ্রাম। বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়েও তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। ধীরে ধীরে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। পোলট্রি ব্যবসায়ী জনির চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমিজমা বিক্রি করে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করে পরিবার। কিন্তু এত অর্থ ব্যয় করেও সুস্থতা ফেরেনি। চলতি বছর চিকিৎসকরা জানান, তাঁর দুটি কিডনিই কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। এরপর নিয়মিত ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে বেঁচে ছিলেন তিনি।
প্রায় চার মাস আগে চিকিৎসকরা জনিকে বাঁচাতে কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। ছেলের জীবন রক্ষায় নিজের একটি কিডনি দিতে এগিয়ে আসেন মা রওশন আরা বেগম। গত ৬ অক্টোবর মায়ের একটি কিডনি জনির শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। সন্তান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে, আবার পরিবারের সঙ্গে হাসি-আনন্দে দিন কাটাবে—এমন স্বপ্নই দেখেছিলেন মা। কিন্তু প্রতিস্থাপনের ৩২ দিনের মাথায় সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।
প্রতিবেশী ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান বলেন, জনির চিকিৎসার জন্য পরিবার জমিজমা বিক্রি করে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে। এরপরও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মায়ের আত্মত্যাগের পরও সন্তানের এমন বিদায় সত্যিই হৃদয়বিদারক।
জনির আত্মীয় মোস্তাক আহমেদ বলেন, সন্তানের জীবন বাঁচাতে মা নিজের কিডনি পর্যন্ত দিয়েছেন। ছেলের সুস্থতার আশায় পরিবারের সদস্যরা কত চেষ্টা, আকুতি, দোয়া আর নির্ঘুম রাত পার করেছেন। কিন্তু মায়ের আত্মত্যাগ ও পরিবারের নিরন্তর প্রচেষ্টার পরও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো গেল না।
এ বিষয়ে রানীশিমূল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সোহাগ বলেন, জনির মাকে দেখলে কষ্টে বুক ফেটে যায়। রোববার রাত সাড়ে ১০টায় বাড়ির আঙিনায় জানাজা শেষে জনিকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।