জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্ক যাচ্ছেন সাতক্ষীরার নাঈম
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও সুপেয় পানির সংকট। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে সুন্দরবনঘেঁষা সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনির মানুষের জীবন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বসতভিটা, কৃষিজমি, জীবিকা ও নিরাপদ পানির উৎস। বারবার দুর্যোগে নিঃস্ব হয়ে অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে কেউ কেউ ছাড়ছেন নিজের জন্মভিটা। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের অভিজ্ঞতা, সংকট ও অধিকার আদায়ের দাবি এবার আন্তর্জাতিক বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন শ্যামনগরের তরুণ সমাজকর্মী এস এম জান্নাতুল নাঈম।
জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিসিসিএডির ২০২৬ কোহর্টের ইয়ুথ ফেলো হিসেবে কয়েক ধাপের প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া পেরিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন নাঈম। আগামী ১৩ নভেম্বর তুরস্কের উদ্দেশে দেশ ছাড়বেন তিনি। ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্টালিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের কপ-৩১ সম্মেলন।
২০১৭ সাল থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের যুবসমাজকে সঙ্গে নিয়ে জলবায়ু ন্যায্যতা, নিরাপদ পানির অধিকার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করছেন নাঈম। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শরুব ইয়ুথ টিমের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে যুক্ত রয়েছেন তিনি। নিরাপদ পানির অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎচালিত ভ্রাম্যমাণ পানি সরবরাহব্যবস্থার মতো স্থানীয় অভিযোজন উদ্যোগেও কাজ করছেন।
নাঈমের কাছে কপ-৩১ সম্মেলন উপকূলের মানুষের দীর্ঘদিনের সংকট, অভিজ্ঞতা ও অধিকার আদায়ের দাবি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তার প্রত্যাশা, বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বাস্তবতা যথাযথ গুরুত্ব পাবে।
নাঈম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। অথচ তাদের অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন ও স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা অভিযোজন উদ্যোগগুলো অনেক সময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। আমি কপ-৩১ সম্মেলনে সাতক্ষীরাসহ বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের বাস্তব সংকট ও তাদের অভিযোজনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাই।
উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য নিরাপদ পানির নিশ্চয়তাকে জলবায়ু অভিযোজনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার দাবি জানাতে চান তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়িত অভিযোজন উদ্যোগগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিতে চান।
জলবায়ু ন্যায্যতার প্রশ্নেও নিজের অবস্থান তুলে ধরতে চান নাঈম। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের বৈশ্বিক উষ্ণায়নে অবদান সামান্য হলেও এর ক্ষতির বড় বোঝা তাদের বহন করতে হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে মানুষ হারাচ্ছেন বসতভিটা, কৃষিজমি, জীবিকা ও সুপেয় পানির উৎস। বারবার দুর্যোগে নিঃস্ব হয়ে অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। কেউ কেউ জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
নাঈম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় লস অ্যান্ড ড্যামেজ বা ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের কার্যকর অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগকে অনুদান বা দয়ার বিষয় হিসেবে বিবেচনা না করে তাদের ন্যায্য পাওনা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিকভাবে দায়ী দেশ ও পক্ষগুলোকে তাদের দায়িত্ব অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অর্থ বহন করতে হবে।
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানাতে চান তিনি।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও জীবিকানির্ভর জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় নতুন ঋণের বোঝা না চাপিয়ে কার্যকর অনুদান সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন নাঈম।
এ ছাড়া জলবায়ু সংকট মোকাবিলার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী, যুব, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রান্তিক কৃষক ও জীবিকানির্ভর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে চান তিনি। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি মোকাবিলা করা মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রতিফলিত হলে অভিযোজন কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।
নাঈমের এই আন্তর্জাতিক যাত্রা সাতক্ষীরার উপকূলীয় তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি জনপদের তরুণ প্রতিনিধি হিসেবে তার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্থানীয় মানুষের সংকট, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাবে বলে আশা করছেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা। তাদের প্রত্যাশা, উপকূলের মানুষের জীবনসংগ্রাম ও অভিযোজনের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক আলোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জলবায়ু নীতিনির্ধারণ ও বাস্তব কর্মপরিকল্পনাতেও প্রতিফলিত হবে।