সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের দাম পাঁচ গুণ বেশি, ক্ষুব্ধ বাসিন্দা-ব্যবসায়ীরা
পর্যটন মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে সেন্টমার্টিন দ্বীপে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নতুন করে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বাণিজ্যিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম যেখানে ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা, সেখানে দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিনে একই পরিমাণ বিদ্যুতের জন্য দিতে হচ্ছে ৬৬ টাকা।
১ নভেম্বর থেকে নতুন করে ১০ টাকা বাড়িয়ে ইউনিটপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ টাকা। জাতীয় গ্রিডের বাণিজ্যিক বিদ্যুতের তুলনায় এ দাম প্রায় পাঁচ গুণ। চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনেও পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছেন দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। অথচ বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে। এতে আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর করার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ দ্বীপবাসী। তাদের প্রশ্ন, যেখানে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহই নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেখানে পাঁচ গুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ বিল দিতে হবে কেন?
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত শুরু হওয়ার কথা। চলবে আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত। পর্যটন মৌসুম শুরুর দিন থেকেই বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে দ্বীপে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেড।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মূল্যহার অনুযায়ী, সারা দেশে সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের প্রথম ৭৫ ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা। পরবর্তী ধাপগুলোতে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ও অফিসের গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের নির্ধারিত দাম ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা।
তবে সেন্টমার্টিনে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় সেখানে বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যহার প্রযোজ্য নয়। বর্তমানে দ্বীপটিতে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৫৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৬৬ টাকা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ইউনিটপ্রতি আরও ১০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে। এতে আবাসিকে দাম দাঁড়াবে ৬৫ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ৭৬ টাকা।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোয় ক্ষুব্ধ দ্বীপবাসী
বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। এর প্রতিবাদে গত ২১ অক্টোবর সেন্টমার্টিন বাজার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। এ ছাড়া বিদ্যুতের সমস্যা ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ‘বিদ্যুৎ আন্দোলন সেন্টমার্টিন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন স্থানীয়রা।
প্ল্যাটফর্মটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘একই দেশে বাস করে এই বৈষম্য মেনে নেওয়া যায় না। আমরা সারা দিনে দুই-তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই। এর জন্যও মাসে কয়েক হাজার টাকা দিতে হয়। আমরা এখানে সরকারি বিদ্যুৎ চাই।’
জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের বাইরে থাকা সেন্টমার্টিনে একসময় ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে সীমিত সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। দ্বীপবাসী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয়। প্রকল্পের আওতায় ৯২৫টি সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি ৪৬৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটির মাধ্যমে দ্বীপে প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থায়ন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকল্প চালুর পর শুরুর দিকে বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। তখন আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিটের দাম ছিল ৩২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৪২ টাকা। ২০২২ সালের জুনে উভয় শ্রেণির গ্রাহকের জন্য ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এরপর বিদ্যুৎ সরবরাহ কমতে থাকে।
২০২৩ সালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলে আবারও ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানো হয়। কিন্তু তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে তাদের না জানিয়েই কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা জামিল উদ্দিন বলেন, এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ৩৫০ টাকা কেটে নেওয়া হয়। কোন খাতে কত টাকা কাটা হয়, সেটাও স্পষ্ট করা হয় না। যতবার রিচার্জ করি, ততবারই এভাবে টাকা কাটা হয়। বিদ্যুতের দাম এখন কত, সেটিও আমরা বুঝতে পারি না।
প্রকল্প চালুর সময় আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৩২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৪২ টাকা। ২০২২ সালের জুনে উভয় শ্রেণিতে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এরপর ২০২৩ সালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলে আরও ১০ টাকা বাড়ানো হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি, দাম বাড়লেও সরবরাহের মান বাড়েনি। দ্বীপের বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, এক হাজার টাকা রিচার্জ করলে ৩৫০ টাকা কেটে রাখা হয়। কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে জানানো হয় না। প্রতিবার রিচার্জের সময়ই এমন ঘটনা ঘটছে। বিদ্যুতের প্রকৃত মূল্য কত, সেটিও গ্রাহকদের কাছে পরিষ্কার নয়।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ না দিয়েই দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এটি অন্যায়। বিষয়টি নিয়ে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। প্রশাসনকেও জানানো হয়েছে। সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তিনি বলেন, সূর্য ওঠার পর কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। রাতে বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। অথচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ডিজেলের দাম বাড়ার যুক্তি দেখিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। তাহলে সূর্যের দামও কি বেড়েছে? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরেজমিন এসে স্থানীয়দের কথা শুনেছেন। কয়েক দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্লু মেরিন এনার্জি লিমিটেডের সেন্টমার্টিন কার্যালয়ের সুপারভাইজার আলী হায়দার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার রফিকুল ইসলাম বলেন, কর্তৃপক্ষ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। প্রকল্পের ব্যাটারি বিকল হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে ডিজেলচালিত জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমানে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের সুনির্দিষ্ট মূল্য কত, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।