৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৯

কক্সবাজারের ইনানীতে গ্যাসের আগুন: ১৪৪ ধারা জারি, বিদ্যুৎহীন ৮-৯ হাজার গ্রাহক

কক্সবাজারের ইনানীতে নলকূপ থেকে গ্যাসের আগুন  © সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পর্যটন এলাকা ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নলকূপের গর্তে সৃষ্ট আগুন দেড় দিনের বেশি সময় ধরে অবিরাম জ্বলছে। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট কাজ করলেও উচ্চচাপে গ্যাস নির্গমনের কারণে প্রচলিত পদ্ধতিতে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। 

পরিস্থিতি পরিদর্শন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল জানিয়েছে, আপাতত গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না করে জোরপূর্বক আগুন নেভানোর চেষ্টা বিপজ্জনক হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ধারণা, ভূগর্ভের গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত থাকলে আগুন আরও সাত থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত জ্বলতে পারে। তবে ঠিক কত দিন আগুন জ্বলবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। গ্যাসের চাপ, নির্গমনের পরিমাণ এবং ভূগর্ভস্থ গ্যাসের স্তরের প্রকৃত অবস্থা পরীক্ষার পরই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। আগুন কখন নিভবে, কীভাবে নিরাপদে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করা যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। একই সঙ্গে বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার কিংবা প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইনানীর ছোট খাল সেতুসংলগ্ন এলাকায় একটি আবাসিক জায়গায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজ চলছিল। প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খননের পর ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তেই ঘটনাটি আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় গত মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে সেই তৎপরতা বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে।

বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুর আরহামের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভূগর্ভের যে স্তর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে, সেই স্তরের গ্যাসের মজুত শেষ হলে আগুন স্বাভাবিকভাবেই নিভে যেতে পারে। কিন্তু গ্যাসের প্রবাহ চলমান থাকা অবস্থায় জোর করে আগুন নেভানো হলে ভূগর্ভের অন্য কোনো ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে নতুন স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা আপাতত আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিরাপদ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সাধারণ কোনো অগ্নিকাণ্ড নয়। এখানে মূল সমস্যা ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া দাহ্য গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। তাই শুধু আগুনের শিখা নিভিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; গ্যাসের নির্গমন নিরাপদে নিয়ন্ত্রণ করাই মূল চ্যালেঞ্জ।

স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া হবে কি না। বিশেষ করে আগুন দীর্ঘদিন জ্বলতে থাকলে বিকল্প পরিকল্পনা কী হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তবে বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি আপাতত স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ ও আলোচনার মধ্যেই রয়েছে।

১৪৪ ধারা জারি, ২০০ মিটারের বেশি এলাকায় নিরাপত্তাবেষ্টনী
আগুনের ঝুঁকি বিবেচনায় ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকা নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছে বাপেক্স। অন্তত ২০০ থেকে ২৫০ মিটার এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনায় রেখে জনসাধারণের চলাচল ও জনসমাগম বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে নির্ধারিত এলাকায় জনসমাগম ও চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ, দুর্ভোগে ৮-৯ হাজার গ্রাহক
আগুনের তাপ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে বৈদ্যুতিক লাইন সুরক্ষিত রাখতে মেরিন ড্রাইভের মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের সরবরাহ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।

উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) কায়সার নূর বলেন, আগুন বৈদ্যুতিক খুঁটির তারে লেগে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ৪৫টির বেশি রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁসহ কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার গ্রাহক দুর্ভোগে পড়েছেন। বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা চলছে।

এদিকে আগুনের কারণে মেরিন ড্রাইভ থেকে উখিয়ার ইনানী ও কোটবাজারে যাতায়াতের সড়কে যান চলাচলও সীমিত রাখা হয়েছে। এতে পর্যটন ব্যবসা ও স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব পড়ছে।