২৭ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩১

ছাত্রদল নেতা হত্যা, বিএনপির এমপির ছেলে ৩ দিনের রিমান্ডে 

আটক নাটোর-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টু  © সংগৃহীত

নাটোরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার নাটোর-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নূরুজ্জামান মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে জেলার গুরুদাসপুর আমলি আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এর আগে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।

আদালত পুলিশের পরিদর্শক আসমাউল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘হত্যা মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আসামির বিরুদ্ধে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়।’

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নাটোর জজ আদালতের আইনজীবী মুক্তার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আদালতে মিন্টুর পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। তবে তিনি নিজেই শুনানিতে অংশ নেওয়ার অনুমতি চান। আদালত অনুমতি দিলে মিন্টু দাবি করেন, তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। পুলিশ কোনো কিছু যাচাই না করেই তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। তিনি সঠিক তদন্ত চান।

এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, হত্যাকাণ্ডটি চাঞ্চল্যকর। আসামি প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দিতে সাহস পাচ্ছেন না। হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনে তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে গুরুদাসপুর বাজারসংলগ্ন একটি ভাড়া বাড়ি থেকে মিন্টুকে আটক করে পুলিশ। পরে তাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে তোলা হয়। তিনি গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোমবার দিবাগত রাতে থানা মিন্টুকে আটক করে রাত ১২টার দিকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে রিমান্ড মঞ্জুর করার পর তাকে আবারও ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’

তবে আদালত থেকে বের করার সময় মিন্টুর হাতে হাতকড়া পরানো হয়নি বলে জানা গেছে।

নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌরসভার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। তিনি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। গত ১৪ অক্টোবর রাতে স্থানীয় চাঁচকৈড় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

শাকিলের বাবা রবিউল করিম ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলাতেই মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

শাকিলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকার হাসপাতালে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে অবরুদ্ধ করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাদের নেতৃত্ব দেন সংগঠনটির সভাপতি। এ সময় তারা মিন্টুকে গ্রেপ্তার এবং শাকিলের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। এরপর সোমবার রাতে মিন্টুকে আটক করে পুলিশ। তাকে প্রথমে গুরুদাসপুর থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে রাতে নাটোর জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।

মঙ্গলবার সকালে শাকিলের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানাতে যান সংসদ সদস্য আবদুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন, অপ্রত্যাশিত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সন্তান জড়িত থাকলে তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।

সংসদ সদস্য ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে শাকিলের বাবা রবিউল করিম অভিযোগ করেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অবহেলা ছিল। ঘটনার পর থেকে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলে দাবি করেন তিনি। স্থানীয় নেতাকর্মীরাও এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাননি বলে অভিযোগ করেন রবিউল করিম। তার ভাষ্য, মামলার এজাহারে তিনি নাম উল্লেখ করলেও সেটি অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন শাকিল। হামলাকারীরা তাকে কুপিয়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাকিল জানিয়েছিলেন, রাত ৯টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। বাজারপাড়া এলাকার নুর একাডেমির কাছে পৌঁছালে হেলমেট পরা দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে এসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলি না লাগায় তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দুলাল সরকারের বাড়ির সামনে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। তার চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসার আগেই হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী সুমন রহমান জানান, বাজারপাড়ার শহীদা জলিল স্কুলের কাছে পরপর দুটি গুলির শব্দ শুনেছিলেন তারা। এগিয়ে গিয়ে শাকিলকে দৌড়ে যেতে দেখেন। পেছনে মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তি তাকে ধাওয়া করছিলেন। কিছুক্ষণ পর রক্তমাখা অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীদের ফিরে যেতে দেখেন তিনি। পরে শহীদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে শাকিলের চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

গুরুতর আহত শাকিলকে প্রথমে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক নওশিন জাহান তখন বলেছিলেন, ‘গুরুতর অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত করা হয়। শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসা শেষে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’

যুবদল নেতা ইসরাফিল শেখ জানান, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর শাকিলকে অন্তত পাঁচ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার কিডনি কাজ করছিল না। পরে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে নেওয়া হয়, আইসিইউতে রাখা হয় এবং লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড তদন্ত করতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। অপরাধী যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন পুলিশ ছাড় দেবে না।’

শাকিলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এশার নামাজের পর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে চাঁচকৈড় পুড়ানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।