গাইবান্ধায় শিক্ষিকার আপত্তিকর ছবি ছড়ানোর মামলায় ইউপি চেয়ারম্যানসহ ২ জন কারাগারে
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরে এক স্কুলশিক্ষিকার ব্যক্তিগত আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আদালত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। মামলার চার আসামির মধ্যে ইউপি চেয়ারম্যানসহ দুজনের জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত, আর বাকি দুইজন জামিন পেয়েছেন। ভুক্তভোগী শিক্ষিকার অভিযোগ, এর আগে করা ধর্ষণ মামলার প্রতিশোধ নিতেই তার ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে তাকে সমাজে হেয় করার চেষ্টা চলছিল।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে গাইবান্ধার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার আসামি আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক মাহাবুর রহমান দুই আসামির জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং অপর দুজনকে মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখ পর্যন্ত জামিন মঞ্জুর করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেজওয়ান সরকার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
যাদের জামিন নামঞ্জুর হয়েছে তারা হলেন সাদুল্লাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের চক নারায়ণ গ্রামের আলমঙ্গীর আকন্দের ছেলে মো. সালেহীন আকন্দ (২৪) এবং একই ইউনিয়নের বৈষ্ণবদা গ্রামের মফিজ উদ্দিন মাস্টারের ছেলে ও রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রবিউল ইসলাম (৪০)। জামিন পাওয়া অপর দুই আসামি হলেন প্রদীপ কুমার ও রবিউল আকন্দ।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রসুলপুর ইউনিয়নের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষিকাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যেই তার ব্যক্তিগত আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী নিজেই বাদী হয়ে সাদুল্লাপুর থানায় মামলা করেন।
এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, এর আগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলা দায়েরের পর থেকেই তাকে নানা ভাবে ভয়ভীতি দেখানো এবং সামাজিকভাবে ছোট করার চেষ্টা চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম আসামি সালেহীন আকন্দ ওই নারীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেন। দ্বিতীয় আসামি ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলামও এসব ছবি ও ভিডিও প্রচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এতে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর ৮(১), ৮(২) ও ৮(৭) ধারায় সাদুল্লাপুর থানায় মামলাটি করা হয়। মামলায় চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
আদালতের আদেশের পর ভুক্তভোগী নারী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি একজন স্কুলশিক্ষিকা। তার সম্মানহানি করে তাকে সমাজের কাছে ছোট করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাকে অনেক মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। আদালত দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা বেড়েছে। তিনি কারও কাছে প্রতিশোধ চান না, শুধু ন্যায়বিচার এবং নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চান।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেজওয়ান সরকার বলেন, নারীর ব্যক্তিগত আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে সম্মানহানির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। মামলার অভিযোগ ও উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে আদালত আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন এবং ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাবেন বলেই তারা আশা করছেন।
প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক সময়ে নারীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীরা সামাজিক হেনস্তার পাশাপাশি মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হচ্ছেন। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।