নভেম্বরে খুলতে পারে সেন্টমার্টিনের পর্যটনদ্বার, হোটেল-রিসোর্ট সংস্কারে ব্যস্ত ব্যবসায়ীরা
নভেম্বর মাসে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সম্ভাব্য পর্যটন মৌসুমকে সামনে রেখে হোটেল-রিসোর্ট সংস্কার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন দ্বীপের ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে পর্যটকদের পদচারণায় আবারও প্রাণ ফিরবে—এমন প্রত্যাশায় দিন গুনছেন দ্বীপবাসী। তবে পর্যটন চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় অনিশ্চয়তা কাটেনি। এর মধ্যে জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুনের জরাজীর্ণ অবস্থা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পর্যটন মৌসুম কবে শুরু হবে, কোন স্থান থেকে জাহাজ চলাচল করবে, দৈনিক কতজন পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন এবং রাত্রিযাপনের সুযোগ থাকবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে প্রস্তুতি চললেও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছেন না পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীরা।
পর্যটন চালুর আশায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
দীর্ঘদিন পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধ এবং রাত্রিযাপনের সুযোগ সীমিত থাকায় সেন্টমার্টিনের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, নৌপরিবহন ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের জীবিকা পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন মৌসুম শুরু হলে এসব খাতে আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্বীপের একটি ইকো রিসোর্টের পরিচালক ও পর্যটন ব্যবসায়ী খায়রুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রিসোর্টের কাঠের কাঠামো ও ছাউনি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন সরঞ্জামও। এসব মেরামত করে পর্যটকদের বরণ করার উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বছরে মাত্র দুই-তিন মাসের পর্যটন মৌসুমের আয় দিয়ে আমাদের সারা বছর চলতে হয়। কিন্তু দুই বছর ধরে রাত্রিযাপন বন্ধসহ পর্যটক চলাচলে বিধিনিষেধ থাকায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছি। এরই মধ্যে পর্যটকদের বুকিংয়ের সাড়া পাচ্ছি।’
হোটেল-রিসোর্ট সংস্কারে বাড়ছে শ্রমিক নেওয়ার আবেদন
পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলোয় সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। এসব কাজে শ্রমিক নেওয়ার অনুমতি চেয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করছেন ব্যবসায়ীরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা তিন শতাধিক আবেদন করেছেন। যাচাই-বাছাই করে এসব আবেদনের বিষয়ে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। দ্বীপে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই সংস্কার ও প্রস্তুতির কাজ চলছে।
দ্বীপের গলাচিপা এলাকায় অবস্থিত হোটেল সেইলার ইকো-রিসোর্টের সাজসজ্জার কাজের জন্য শ্রমিক নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুমতি চেয়েছেন ঢাকার মিরপুরের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় রিসোর্টের বাঁশের ছাউনি ও বেড়া পরিবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও চলছে। পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তুত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পর্যটকদের বুকিংও পাওয়া যাচ্ছে।
জেটির পন্টুনে মরিচা, দুর্ঘটনার শঙ্কা
পর্যটক বরণের প্রস্তুতির মধ্যেই সেন্টমার্টিন জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুনের জরাজীর্ণ অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, পন্টুনের বিভিন্ন স্থানে মরিচা ধরে গর্ত তৈরি হয়েছে। দ্রুত মেরামত করা না হলে পর্যটকদের ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
দ্বীপের বাসিন্দা মুহাম্মদ আমিন বলেন, দীর্ঘদিন পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জেটির কাজ শেষ হলেও জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুন এখনো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাই পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই এটি মেরামত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জেটি নির্মাণের কাজেও অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির দায়িত্বে থাকা আব্দুর রহমান বলেন, পর্যটকদের আগমন শুরু হলে দ্বীপের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরতে পারে। এ কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মেরামত ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। আগামী মাস থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে তার আগে জেটির পন্টুন মেরামত করা জরুরি। অন্যথায় পর্যটকদের ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে।
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন জেটির কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এখনো কিছু কাজ বাকি আছে। তবে জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই প্ল্যাটফর্মের কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে পর্যটকদের ভোগান্তি না হয়। জেটি নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।
পরিবেশ রক্ষা ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্যের উদ্যোগ
পর্যটন চালুর সম্ভাবনাকে সামনে রেখে পরিবেশ সংরক্ষণেও প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য, প্রবাল ও সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের আগমন সামনে রেখে হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নেওয়ার আবেদন করছেন। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুল হাসান বলেন, পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হবে। পর্যটকেরা যাতে পলিথিনসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য বহন না করেন, সে বিষয়েও নিরুৎসাহিত করা হবে।
পর্যটননীতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
গত বছরের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন ভ্রমণে অনুমোদিত নৌযান, অনলাইন টিকিট, ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী, নভেম্বরে দিনে গিয়ে দিনে ফেরার নিয়ম, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ এবং দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যাওয়ার বিধান ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটন বন্ধ রাখার নিয়মও রয়েছে।
তবে চলতি মৌসুমে পর্যটন চালুর সময়, পর্যটকের সংখ্যা এবং জাহাজ চলাচলের স্থান পুনর্বিবেচনার বিষয়ে সাম্প্রতিক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় আলোচনা হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর সচিবালয়ে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় টেকনাফ থেকে জাহাজ চলাচল, দৈনিক চার হাজার পর্যটক প্রবেশ এবং পাঁচ মাস পর্যটন চালুর প্রস্তাব দেন কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। নভেম্বরের শুরু থেকে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় আসে। তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সব মিলিয়ে পর্যটন মৌসুম ঘিরে সেন্টমার্টিনে প্রস্তুতি ও প্রত্যাশা দুটিই বাড়ছে। একদিকে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে হোটেল-রিসোর্ট সংস্কার করছেন ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে নিরাপদ জেটি ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ। এখন পর্যটন চালুর সরকারি সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুতির দিকেই তাকিয়ে আছেন দ্বীপের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।