২২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:১১

প্রসূতির রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে ভুল রিপোর্ট, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসতে হাসতে বললেন—‘ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক’

কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইনসেটে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা  © টিডিসি রিপোর্ট

রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তঃসত্ত্বা নারীর রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে ভুল রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল প্রশাসন বলছে, মাত্র একজন জনবল দিয়ে চলছে হাসপাতালের পরীক্ষাগার। ফলে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে এমন ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে জীবনঘাতী এমন গাফিলতির ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) হাস্যোজ্জ্বল বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি নিয়মিত পরীক্ষার অংশ হিসেবে কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান সাফিয়া খাতুন নামের ওই অন্তঃসত্ত্বা নারী। এ সময় ল্যাব পরীক্ষার তার রক্তের গ্রুপ ‘এ পজিটিভ’ (A+) বলে রিপোর্ট দেওয়া হয়। রক্ত সংগ্রহও করে রোগীর পরিবার। তবে এরই মধ্যে তিনি প্রথমে রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল ও পরে বালিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে যান।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বালিয়াকান্দিতে রক্তদানের আগে ক্রস ম্যাচিংয়ের সময় অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়ে। পরবর্তীতে উপজেলার দুটি পৃথক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকে পুনরায় রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। উভয় ল্যাবরেটরি রিপোর্টেই তার রক্তের গ্রুপ ‘ও পজিটিভ’ (O+) নিশ্চিত করা হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, কালুখালী হাসপাতালে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষায় ভুল রিপোর্ট পাওয়ায় সে অনুযায়ী প্রসূতিকে রক্ত দেওয়া হলে মারাত্মক পরিণতি হতে পারত। এ ধরনের ঘটনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় অ্যাকিউট হিমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন বলা হয়। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার আক্রমণ ও রক্তকণিকা ধ্বংস হওয়া এবং মারাত্মক শারীরিক উপসর্গ দেখা দেওয়া থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তার ও গর্ভস্থ সন্তানের অঙ্গহানি অথবা মৃত্যুও ঘটতে পারত।

রোগীর স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তাদের এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসায় অবহেলিত হয়ে আসছেন তারা। বলছেন, হাসপাতালে সাধারণ মানুষ বিশ্বাসের সাথে চিকিৎসা নিতে যান। কিন্তু সেখানে ল্যাবরেটরির এমন অসাবধানতা ও চরম গাফিলতি মানুষের জীবনকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

এদিকে কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দাবি, অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও জনবল সংকটের কারণেই অনাকাঙ্ক্ষিত এই অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে। অভিযুক্ত ল্যাব অ্যাটেন্ডেন্ট মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সঠিক কাজ করার চেষ্টা করি। তবে রোগীর চাপ বেশি থাকলে কাজের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটতে পারে।

তবে জীবনঘাতী হতে পারে এমন ভুল রিপোর্টের মতো সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইসরাত জাহান উম্মনের মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘এ ধরনের ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক, মানুষের তো ভুল হতেই পারে।’

তিনি আরও বলেন, বিপুল সংখ্যক রোগীর চাপের বিপরীতে হাসপাতালে মাত্র একজন ল্যাব কর্মী নিয়োজিত থাকায় এ ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, এর আগেও রাজবাড়ীতে ভুল চিকিৎসায় তিন নারীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় জেলা জুড়ে চিকিৎসাসেবার মান ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তবে অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার না পাওয়া এবং হাসপাতালের জনবল সংকট ও অব্যবস্থাপনার সমাধান না হওয়ায় জেলাবাসীর চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তি চরম অনিশ্চয়তা ও জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।