দিনে বিদ্যুৎ মেলে ৪ ঘণ্টা, ইউনিট ৪২ টাকা—আরও ১০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
পর্যটননির্ভর দ্বীপ সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের সংকট যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। চড়া দাম দিয়েও দিনে বিদ্যুৎ মেলে মাত্র চার ঘণ্টা। বাসাবাড়ির গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য গুনতে হচ্ছে ৪২ টাকা, আর বাণিজ্যিক গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে ৫২ টাকা। এর মধ্যে আগামী নভেম্বর থেকে ইউনিটপ্রতি আরও ১০ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণায় ক্ষোভে ফুঁসছেন দ্বীপবাসী। বিদ্যুতের সীমিত সরবরাহ, অস্বাভাবিক মূল্য এবং সেবা নিয়ে অসন্তোষের জেরে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে দ্বীপের বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
দ্বীপবাসীর অভিযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করা হলেও প্রত্যাশিত সেবা মিলছে না। চড়া মূল্য পরিশোধ করেও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী, সাধারণ পরিবার ও ব্যবসায়ীরা। নতুন করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বিদ্যুৎ ব্যবহার তাদের জন্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। এতে দ্বীপের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঠিক হিসাব এবং বিলের রসিদ পাওয়া নিয়েও অস্পষ্টতা রয়েছে। সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে বিকল্প জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বিদ্যুৎ না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করার সুযোগও সীমিত। একদিকে উচ্চমূল্য, অন্যদিকে অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ পাওয়া সব মিলিয়ে দ্বীপবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নতুন করে দাম বাড়ানোর ঘোষণায় সেই ক্ষোভ প্রকাশ্যে এসেছে।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দ্বীপের বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা নুরুল আলম বলেন, ‘শুরু থেকেই বেসরকারি বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানটি দ্বীপবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। পর্যটন মৌসুমে বিদ্যুৎ দিলেও বছরের বাকি সময় ঠিকমতো সরবরাহ করে না। এর মধ্যে ইউনিটপ্রতি আরও ১০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দ্বীপবাসীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। আমরা দ্বীপে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর দাবি জানাই। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে।’
দ্বীপের আরেক বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দাম বাড়লে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ৬৬ টাকা। এমন বিদ্যুৎ আমাদের প্রয়োজন নেই। বাসার মিটার খুলে নিয়ে যাক, খুঁটিও নিয়ে যাক তারা। পাঁচ টাকা ইউনিট দিলেও আর নেব না। ব্লু-মেরিনের বিদ্যুৎ বয়কট করলাম। আমরা ন্যায্য মূল্যে বিদ্যুৎ চাই।’
দ্বীপবাসীর দাবি, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, প্রকল্পের কার্যক্রম তদন্ত এবং যৌক্তিক দামে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। পর্যটননির্ভর সেন্টমার্টিনে বিদ্যুৎ সংকট শুধু গৃহস্থালি জীবনেই নয়, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উচ্চমূল্য দিয়েও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও সমস্যায় পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্লু-মেরিন এনার্জি লিমিটেড বিদ্যুতের জন্য অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য নিচ্ছে। বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিটে ৪২ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৫২ টাকা দিতে হচ্ছে। নতুন করে আরও ১০ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণা কার্যকর হলে প্রতি ইউনিটের মূল্য সর্বোচ্চ ৬২ টাকা পর্যন্ত দাঁড়াবে। এ নিয়ে দ্বীপে তীব্র জনঅসন্তোষ ও বিক্ষোভ চলছে।
সেন্টমার্টিনে বিদ্যুতের দাম দেশের মূল ভূখণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ার পেছনে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, জাতীয় গ্রিডের অনুপস্থিতি এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়গুলো সামনে আসছে। দ্বীপটিতে সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় গ্রাহকদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
জাতীয় গ্রিডের অনুপস্থিতি: সেন্টমার্টিন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। সেখানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কোনো সাবস্টেশন বা জাতীয় গ্রিড লাইন পৌঁছায়নি। ফলে মূল ভূখণ্ডের মতো সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ নেই। মূল ভূখণ্ডে সাধারণত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৭ থেকে ১২ টাকার মধ্যে থাকলেও দ্বীপে গ্রাহকদের অনেক বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একক সরবরাহব্যবস্থা
দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে ব্লু-মেরিন এনার্জি পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের অভিযোগ বিকল্প সরবরাহকারী না থাকায় গ্রাহকদের এই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। প্রতিযোগিতার অভাব ও কার্যকর তদারকি নিয়ে প্রশ্নও তুলছেন তারা। বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহব্যবস্থায় সরকারি নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়
প্রতিষ্ঠানটি মূলত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং বিকল্প হিসেবে ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সৌর প্যানেল, ভারী ব্যাটারি ও জেনারেটরের জ্বালানি ডিজেল মূল ভূখণ্ড থেকে ট্রলারে করে দ্বীপে নিতে হয়। এতে পরিবহন, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বেড়ে যায়। তবে এই ব্যয়ের প্রকৃত পরিমাণ এবং বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পর্যটন মৌসুমনির্ভর চাহিদা
সেন্টমার্টিনে সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটকের আনাগোনা বেশি থাকে। এ সময় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। বছরের অন্য সময় পর্যটক কম থাকায় অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত হয়ে আসে। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা ও বিক্রিতে মৌসুমভিত্তিক পার্থক্য তৈরি হয়। এই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া এবং বিনিয়োগের অর্থ দ্রুত তুলে আনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি ইউনিটপ্রতি বেশি দাম নিচ্ছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, ‘দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে স্থানীয় লোকজন বিক্ষোভ করেছেন। বিষয়টি সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
এ বিষয়ে ব্লু-মেরিন এনার্জি লিমিটেডের প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি জেনেছি। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে এটি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’