১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪৭

মেরিন ড্রাইভে ৫ শতাধিক রিসোর্ট-হোটেলের ফায়ার লাইসেন্সের আবেদন মাত্র ৫২টির

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ  © ফাইল ফটো

সারা বছর পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ। পাহাড়, সমুদ্র আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই ছুটে আসেন দেশি-বিদেশি পর্যটক। তাদের সেবা দিতে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের আশপাশে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ। কিন্তু পর্যটন অবকাঠামোর এই বিস্তারের বিপরীতে অগ্নিনিরাপত্তার চিত্র উদ্বেগজনক। পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স পেতে আবেদন করেছে মাত্র ৫২টি। একই সঙ্গে পুরো মেরিন ড্রাইভ এলাকায় নেই কোনো স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।

সম্প্রতি ইনানীর পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু এবং ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনা এই নিরাপত্তাহীনতাকে সামনে এনেছে। পর্যটনকেন্দ্রের এত বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।

পর্যটন ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়েনি অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভের পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে মাত্র ৫২টি প্রতিষ্ঠান।

টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

এই পরিসংখ্যান থেকে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্সের অবস্থা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের যাচাই ও প্রশাসনিক তদারকির মাধ্যমে কোন প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কোনটির লাইসেন্স নেই এবং কোথায় নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা। তাঁদের মতে, শুধু পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

মেরিন ড্রাইভের অন্যতম বড় সমস্যা হলো জরুরি অগ্নিনির্বাপণ সেবার সীমাবদ্ধতা। দীর্ঘ এই পর্যটন সড়কের বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগলে উখিয়া কিংবা কক্সবাজারের ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ওপর নির্ভর করতে হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে কোর্টবাজার হয়ে মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে উল্লেখযোগ্য সময় লেগে যায়। কোনো কোনো স্থানে দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। ফলে আগুন লাগার পর খবর দেওয়া হলেও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুবিনের দাবি, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগেছিল। তাঁর মতে, এত দেরিতে পৌঁছানোর কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর কাজ কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইব্রাহিম আহমেদ বলেন, ইনানীর পাটুয়ারটেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হলেও সেখানে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। আগুন লাগলে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। দূরত্ব বেশি হওয়ায় জরুরি সেবা পেতেও দেরি হয়। তিনি আরও বলেন, এলাকায় আগে বিভিন্ন বাড়িঘরে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। অনেক সময় ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই বাড়িঘর পুড়ে যায়। অথচ সেখানে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য জায়গা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদুল ইসলামও দ্রুত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এ দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয়রা।

টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর

পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিষ্ঠানটির অগ্নিনিরাপত্তা ও লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এদিকে শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরিন জানান, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। এ বিষয়ে আগে সতর্ক করা হলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বৈধতা নেয়নি বলে জানান তিনি। ঘটনাটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি নয়, বরং পর্যটন এলাকায় অগ্নিনিরাপত্তা তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

পর্যটক সিরাজুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের পাশাপাশি হোটেল কর্তৃপক্ষেরও। প্রতিষ্ঠান চালুর আগে এবং পরিচালনার সময় নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা উচিত।

তার মতে, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, নিরাপদ বের হওয়ার পথ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে কার্যকর প্রস্তুতি থাকলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

পর্যটক মোবারক হোসেন বলেন, মেরিন ড্রাইভের হোটেলগুলোর আশপাশে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেবা পাওয়া কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি কোন প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে, তা জানার সুযোগও পর্যটকদের থাকা প্রয়োজন।

হোটেল-রিসোর্টের বৈধতা এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাইয়ে অভিযান জোরদার করার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে হোটেল ও রিসোর্টে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর এসব অভিযান আরও জোরদার করা হবে।

তিনি জানান, কিছুদিন আগেও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির কয়েকজন সদস্য ও জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকটি হোটেল-রিসোর্টে অভিযান চালিয়েছেন। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনগত বৈধতা, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হবে বলেও জানান তিনি।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অনিয়ম শনাক্ত হলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি।

মেরিন ড্রাইভ

অগ্নিনির্বাপণ সেবার ঘাটতি দূর করতে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, বর্তমানে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে হয়। মেরিন ড্রাইভে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা হলে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম আরও দ্রুত ও সহজ হবে।

তিনি জানান, সেখানে একটি স্থল ও ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়বে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মেরিন ড্রাইভ ঘিরে পর্যটন ব্যবসার প্রসার স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এই বিকাশই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্সের জন্য মাত্র ৫২টি আবেদন, স্থায়ী ফায়ার স্টেশনের অনুপস্থিতি এবং জরুরি সেবা পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগার অভিযোগ সব মিলিয়ে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন, হোটেল-রিসোর্টের লাইসেন্স ও অনুমোদন যাচাই, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া পরিচালনা জরুরি।