১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৩৪

অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা, স্বপ্ন এক লাখ গাছ লাগানোর

গাছের চারা হাতে নাজমুল হাসান শান্ত  © টিডিসি

সকাল হলেই অটোরিকশার স্টিয়ারিং হাতে জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন নাজমুল হাসান শান্ত। সারা দিন যাত্রী পরিবহন করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে স্ত্রী-সন্তান ও বাবা-মায়ের সংসার। ভাড়া বাসার খরচ, পরিবারের ভরণপোষণ—সব মিলিয়ে প্রতিদিনের আয়ের টাকায় হিসাব মেলানোই কঠিন। তবু সেই সীমিত আয় থেকেই কিছু টাকা সরিয়ে রাখেন তিনি। নিজের কোনো শখ পূরণে নয়, সেই টাকা খরচ হয় গাছের চারা কিনতে।

অটোরিকশার পেছনে থাকে কয়েকটি গাছের চারা। সঙ্গে থাকে কোদাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। যাত্রী পরিবহনের ফাঁকে রাস্তার পাশে কিংবা কোনো উপযুক্ত স্থান চোখে পড়লেই থামিয়ে দেন অটোরিকশা। এরপর নিজের হাতে মাটি খুঁড়ে রোপণ করেন একটি চারা। এভাবেই জীবিকাযুদ্ধের পাশাপাশি সবুজ পৃথিবী গড়ার লড়াইয়ে রয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ।

নাজমুল হাসান শান্তর বাড়ি যশোরের কেশবপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুরে। গত দুই বছরে যশোরের বিভিন্ন এলাকায় নিজের উপার্জনের টাকায় কেনা প্রায় দেড় হাজার গাছ রোপণ করেছেন তিনি। তবে, এতেও তৃপ্ত নন তিনি। তার স্বপ্ন, একদিন এক লাখ গাছ রোপণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাবেন সবুজে ঘেরা একটি বাংলাদেশ।

শান্তর জীবনের গল্পটা খুব সাধারণ, কিন্তু তার স্বপ্ন অসাধারণ। বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এসএসসি পরীক্ষার আগেই থেমে যায় তার শিক্ষাজীবন। এরপর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জীবিকার তাগিদে বেছে নেন অটোরিকশা চালানোর পেশা।

বর্তমানে যশোর শহরের নাজির শংকরপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় স্ত্রী, দুই বছরের কন্যাসন্তান, ছোট ভাই ও বাবা-মাকে নিয়ে বসবাস করেন তিনি।

চারদিকে গাছ কাটা, বাড়তে থাকা গরম, কমে আসা সবুজ আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শান্তকে ভাবিয়ে তোলে। বসে না থেকে নিজের জায়গা থেকে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০২৪ সালে শুরু করেন বৃক্ষরোপণ। কোনো সরকারি প্রকল্প কিংবা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চারা কিনে রোপণ করতে থাকেন।

প্রথমে অল্প কয়েকটি গাছ দিয়ে শুরু। এরপর বাড়তে থাকে সেই সংখ্যা। এখন তার রোপণ করা গাছের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।

শান্ত অটোরিকশার যাত্রী নামিয়ে বা যাত্রাবিরতিতে চারা রোপণ করেন। আবার সুযোগ পেলে দেখে আসেন সেগুলোর অবস্থা।

নাজমুল হাসান শান্ত বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই গাছ ভালোবাসি। কিন্তু গত কয়েক বছরে যেভাবে গাছ কাটা বেড়েছে, তাতে শুধু আফসোস নয়, কিছু করতে হবে। একটি গাছ লাগানো মানে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ নিশ্বাস নিশ্চিত করার চেষ্টা।’

সংসারের খরচ মেটানোর পর গাছ কেনার জন্য টাকা আলাদা করে রাখেন তিনি। ‘আমি মনে করি, এটা খরচ নয়, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।’

নিজের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও কাজে লাগাচ্ছেন শান্ত। ‘বিডি ট্রি ম্যান’ নামে একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে তার। সেখানে গাছ লাগানোর ভিডিও, পরিচর্যার কৌশল ও বৃক্ষরোপণে মানুষকে উৎসাহ দিতে নানা বার্তা প্রকাশ করেন তিনি।

এসব ভিডিও দেখে দেশের বিভিন্ন এলাকার কয়েক ডজন কনটেন্ট নির্মাতা নিয়মিত বৃক্ষরোপণে যুক্ত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কাজ ছড়িয়ে পড়ায় অনেক শুভানুধ্যায়ীও আর্থিক সহযোগিতা করছেন।

শান্তর স্বপ্ন—এক লাখ গাছ রোপণ। প্রতিদিনের আয়, সংসারের দায়িত্ব ও সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে তাকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে ধীরে ধীরে। একদিন তার লাগানো গাছগুলো বড় হবে, ছায়া দেবে পথচারীদের, পাখির আশ্রয় হবে, আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রাখবে ভূমিকা।