চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় যৌথ অভিযানে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘদিন আগে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।
এ সময় বান্দরবান সড়ক বিভাগের জায়গায় নির্মিত একটি যাত্রী ছাউনি ও বিশ্রামাগার উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে চালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাদের একজনের সঙ্গে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কেরানীহাট এলাকায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ, বান্দরবান সড়ক বিভাগ, সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসন ও সাতকানিয়া থানা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়।
উচ্ছেদ অভিযানে উপস্থিত ছিলেন– উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব দাশ পুরকায়স্থ, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সোহেলী নোশীন প্রত্যাশা, সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুল আলীম, দোহাজারী সড়ক উপ বিভাগের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) তৌহিদুল বারী ও বান্দরবান সড়ক উপ বিভাগ-২ এর উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তফা মুন্সীসহ প্রমুখ।
জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন কক্সবাজার ও বান্দরবানে বিপুলসংখ্যক পর্যটক যাতায়াত করেন । এ দুই মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলোর কারণে প্রায়ই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও পর্যটকেরা। বিষয়টি চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসীম উদ্দীন আহমেদের নজরে আনা হলে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের নির্দেশনা দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
আরও জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের একপর্যায়ে বান্দরবান সড়ক বিভাগের জায়গায় বাস মালিক সমিতি ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে নির্মিত যাত্রী ছাউনি ও বিশ্রামাগার উচ্ছেদে বাধা দেন চালক ও শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাদের একজনের সঙ্গে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হাতাহাতি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করে। এরপর বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা দলীয় স্লোগান দেন। তবে চালক ও শ্রমিকদের বাধা সত্ত্বেও স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
চালক ও শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই এখানে যাত্রী ছাউনি ও বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হয়েছিল। চালক ও শ্রমিকদের পাশাপাশি যাত্রীরাও এখানে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পেতেন। হঠাৎ করে স্থাপনাটি উচ্ছেদ করায় আমরা হতাশ। উচ্ছেদের আগে চালক, শ্রমিক ও যাত্রীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত ছিল।
এদিকে, উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে বিশৃঙ্খলা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ লাইন্স থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। ফলে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তেমন বেগ পেতে হয়নি।
রফিকুল আলম ও জসিম উদ্দিনসহ কয়েকজন হকার ও ব্যবসায়ী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থানে ছোটখাটো ব্যবসা করে পরিবার চালিয়ে আসছি। উচ্ছেদের কারণে এখন আমাদের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমরা সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসা করতে চাই না। তবে আমাদের পুনর্বাসনের জন্য বিকল্প জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হলে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকতে পারব।
কেরানীহাটে হকার উচ্ছেদের নামে প্রশাসনের দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মো. রাকিব হাসান নামে এক যুবক। তার দাবি, হকারদের অধিকাংশই খেটে খাওয়া মানুষ। অনেকে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন। উচ্ছেদের পর পুনরায় বসার সুযোগ তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং চাঁদাবাজদের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ ছাড়াও হকার উচ্ছেদ করতে হলে তা স্থায়ীভাবে করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি খাসজমি দখল করে বড় বড় ভবন নির্মাণের মাধ্যমে কোটি টাকা আয়কারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাতকানিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল আলীম বলেন, যারা এসেছিলেন, তারা চালক ও শ্রমিক কি না, তা জানি না। তবে কয়েকজন এসে যাত্রী ছাউনি ও বিশ্রামাগারটি না ভাঙার অনুরোধ করেছিলেন। তাদের সঙ্গে পুলিশের কোনো কথা কাটাকাটি হয়নি। তবে তারা নিজেদের মধ্যে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন। এটি সড়ক বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের অভিযান ছিল। আমরা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে ছিলাম।
উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) তৌহিদুল বারী বলেন, মহাসড়কের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনাগুলোর কারণে সড়কের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এসব স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে সড়কের জায়গা দখলমুক্ত করা হচ্ছে। উচ্ছেদের পর যাতে পুনরায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, উচ্ছেদের ২৪ ঘন্টা আগে আমরা মাইকিং করে অবৈধ স্থাপনার সরিয়ে নিতে বলেছি। অনেকের সরিয়ে নিয়েছেন আবার অনেকে রেখে দিয়েছেন। অবৈধ স্থাপনার কারণে মহাসড়কগুলোতে সর্বক্ষণিক যানজট লেগেই থাকে। উচ্ছেদের পর পুনরায় দোকান বসানোর কোন সুযোগ নেই। যারা এমনটা করবে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব দাশ পুরকায়স্থ বলেন, সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগগুলোর বিভিন্ন পরিকল্পনা থাকলেও অবৈধ স্থাপনার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয় সংসদ সদস্য মহোদয়ের নির্দেশনায় এ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। উচ্ছেদের পর যাতে এসব জায়গা পুনরায় দখল না হয়, সে জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।