০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:২৯

গ্রামের শিশুদের স্বপ্ন দেখাতেন লাকী স্যার, বিদায়ে পেলেন রাজকীয় সংবর্ধনা

মিজানুর রহমান লাকী   © সংগৃহীত

খুলনা বিভাগের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা। জেলার সীমান্তঘেঁষা উপজেলা জীবননগর। আর এই উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর একটি ধোপাখালী। এই ধোপাখালী গ্রামেই ‘লাকী’ হয়ে এসেছিলেন মিজানুর রহমান লাকী। একটানা ২৩ বছর শিক্ষকতা করেছেন ধোপাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আর তাঁর কল্যাণেই এই গ্রাম পুরো জেলায় পরিচিত লাভ করেছে শিক্ষিত গ্রাম হিসেবে।

কোনো মানুষ একটি প্রতিষ্ঠানে শুধু চাকরি করতে আসেন না। ধীরে ধীরে সেই মানুষটি প্রতিষ্ঠানেরই একটি অংশ হয়ে ওঠেন। সময়ের সঙ্গে তাঁদের পরিচয় পদবি কিংবা পেশায় সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের স্মৃতিতে তাঁরা জায়গা করে নেন আপনজনের মতো। মিজানুর রহমান লাকী তেমনই একজন মানুষ যিনি ধোপাখালির মানুষের কাছে শুধু একজন শিক্ষক নন বরং দীর্ঘদিনের পরিচিত এক মুখ ও আপনজন হিসেবে।

২৩ বছরের এক অধ্যায়

২০০৩ সালে ধোপাখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন মিজানুর রহমান লাকী। তখন হয়তো তিনি জানতেন না, এই বিদ্যালয় আর এই গ্রামই একসময় তাঁর জীবনের দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ২৩ বছর। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থী তাঁর কাছে পড়েছে, শিখেছে। কারও হাতেখড়ি হয়েছে তাঁর কাছে, কেউ তাঁর কাছ থেকে শিখেছে শুধু বইয়ের পাঠ নয়, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ আর ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও।

একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর মূল দায়িত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের পড়ানো। কিন্তু দীর্ঘদিন একই এলাকায় কাজ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খোঁজ নিতেন, অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং প্রয়োজন হলে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কাজেও তাঁকে দেখা যেত। এভাবেই ধীরে ধীরে ধোপাখালির মানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।

যে শিশুরা একসময় ছোট্ট হাত ধরে বিদ্যালয়ে আসত, তাদের অনেকেই আজ বড় হয়েছে। কেউ উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে, কেউ চাকরি করছে, কেউ ব্যবসা করছে, আবার কেউ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করছে। তবে পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লে তাদের চোখে ভেসে ওঠে সেই বিদ্যালয়, মাঠ, শ্রেণিকক্ষ আর প্রিয় শিক্ষক লাকী স্যারের মুখ।

সাবেক শিক্ষার্থীদের চোখে

সাবেক শিক্ষার্থী রাওফিলের কাছে লাকী স্যারের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিল তাঁর আধুনিক ও বাস্তবভিত্তিক পড়ানোর পদ্ধতি। তাঁর ভাষায়, গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও লাকী স্যার পড়ানোর ক্ষেত্রে ছিলেন আধুনিক ও ব্যতিক্রমী। তিনি শুধু প্রচলিত নোট বা বইয়ের ওপর নির্ভর করতেন না। পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন উৎস থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতেন। এসব ব্যবহার করে পড়াশোনাকে আরও সহজ, বাস্তব ও কার্যকর করে তুলতেন।

রাওফিল বলেন, ‘আমার পুরো লেখাপড়া জীবনের মূল শিখন প্রক্রিয়া লাকী স্যারের কাছ থেকে গ্রহণ করা। বাংলা ভাষায় লিখতে গেলে এখনো পর্যন্ত সেই ধারাবাহিকতায় লিখি, যা লাকী স্যার পঞ্চম শ্রেণিতে শিখিয়েছিলেন।’

রাওফিলের মতে, সময় মেনে চলা, নিয়ম মেনে কাজ করা, সততা, পরিশ্রম এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা ছিল লাকী স্যারের অন্যতম গুণ। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থারও খোঁজ রাখতেন। রাওফিল আরও বলেন, ‘তিনি শুধু পড়াতেন না, শিক্ষার্থীরা পড়ছে কি না, মনোযোগ দিচ্ছে কি না, কিংবা কোনো কারণে তারা ভালো করতে পারছে না কি না, সেটিও খেয়াল করতেন।’ কোনো শিক্ষার্থী সমস্যায় পড়লে তার মূল কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন লাকী স্যার। এরপর সেই সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়েও তিনি উদ্যোগ নিতেন।

সাবেক শিক্ষার্থী রাজেদুলের স্মৃতিতে লাকী স্যারের আন্তরিকতার একটি বিশেষ দিক উঠে আসে। সমাপনী পরীক্ষার আগে শীতের ভোরে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় লাকী স্যার তাঁকে ফোন করতেন। ফোনে পড়াশোনার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি দিতেন উৎসাহ ও স্বপ্ন দেখার সাহস। রাজেদুল বলেন, ‘জানি, হয়তো আমাকে আজ ফোন নাও দিতে পারেন। কিন্তু উনাকে মিথ্যা বলতে পারব না। কিংবা স্বপ্ন থেকে পিছু হটতে পারব না। তাই শীতের রাতেও উঠে বই নিয়ে বসেছি।’

রাজেদুলের মতে, শিক্ষক হিসেবে লাকী স্যারের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা। তিনি বলেন, ‘তিনি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য অনেক বেশি আন্তরিক ছিলেন। শিক্ষার্থীদের তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। যেন শিক্ষার্থীদের সমস্যা তাঁর নিজের সমস্যা ছিল।” রাজেদুল আরও বলেন, লাকী স্যার শুধু বইয়ের পড়া শেখাননি, শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতেও শিখিয়েছেন। সেই স্বপ্ন পূরণে পরিশ্রমী হতে এবং নিজের লক্ষ্যের প্রতি যত্নশীল থাকতে উৎসাহ দিতেন। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ও বাইরে তাঁর আচরণ, কথা বলা এবং পড়ানোর ধরন শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে অনুপ্রাণিত করত।

শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন

একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু সনদ, পদোন্নতি বা পুরস্কার দিয়ে মাপা যায় না। তাঁর বড় অর্জন হলো শিক্ষার্থীরা তাঁকে কতটা মনে রাখে। সেই দিক থেকে মিজানুর রহমান লাকীর ২৩ বছরের শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরির সময় নয়, এটি একটি গ্রামের মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা দীর্ঘ সম্পর্কের গল্প।

ধোপাখালির মানুষের কাছে লাকী স্যারের পরিচয় শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে নয়। তিনি এই এলাকার অনেক পরিবারের পরিচিত মানুষ। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য শিক্ষার্থীর শৈশব, বিদ্যালয়ের নানা স্মৃতি এবং ধোপাখালির শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের গল্প। ২০০৩ থেকে ২০২৬, দীর্ঘ ২৩ বছরে বদলেছে বিদ্যালয়, বদলেছে শিক্ষার্থীদের প্রজন্ম, এসেছে নতুন প্রযুক্তি ও শিক্ষার নানা পরিবর্তন। তবে বদলায়নি শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে গড়ে তোলার প্রতি লাকী স্যারের দায়িত্ববোধ।

‘লাকী’ তাঁর নাম। ধোপাখালির মানুষের কাছে তিনি যেন সত্যিই লাকী হয়ে এসেছিলেন। দীর্ঘদিন একজন দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষককে পাশে পাওয়াকে গ্রামের মানুষ নিজেদের সৌভাগ্য বলেই মনে করেন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা ও প্রচেষ্টার সঙ্গে ধোপাখালির শিক্ষার অগ্রগতির গল্পও জড়িয়ে আছে।

রাজকীয় বিদায়

২০২৬-এর ১লা এপ্রিল ধোপাখালি গ্রামবাসী এক আনন্দের মুখোমুখি হয়েছিল। সেদিন লাকী স্যারকে বিদায় দেওয়া হয়েছিল রাজকীয় সংবর্ধনায়। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী মিলে তৈরি করেন অন্যরকম আবহ। স্যারের বিদায়কে রাঙিয়ে তোলার জন্য এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়। সেখানে সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করে। সমস্ত গ্রাম থেকে উপজেলা ঘুরিয়ে স্যারের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসা হয়।
একজন শিক্ষকের বিদায়ে এমন আয়োজন বিরল। তবে যিনি ২৩ বছর ধরে গ্রামের শিশুদের হাতে বই তুলে দিয়েছেন, তাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, তাঁর প্রতি শিক্ষার্থীদের এ ভালোবাসা যেন দীর্ঘদিনের ঋণের ছোট্ট প্রতিদান।
গ্রামের ইতিহাসে এক নাম

কখনো কখনো একটি গ্রামের পরিবর্তনের গল্প বড় কোনো ঘটনা দিয়ে লেখা হয় না। সেই গল্প তৈরি হয় কিছু মানুষের দীর্ঘদিনের কাজ ও অবদানে। মিজানুর রহমান লাকী তেমনই একজন। ২৩ বছর ধরে ধোপাখালির শিশুদের পড়িয়েছেন, তাদের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন।
চাকরি শেষ হলেও ধোপাখালির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি। কারণ একজন শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষে সময় কাটান না, তাঁর শেখানো শিক্ষার্থীদের জীবনেও রেখে যান নিজের ছাপ। লাকী স্যারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা আজ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছেন। তাঁদের শৈশবের স্মৃতি, শিক্ষা ও সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই শিক্ষকের নাম।

হয়তো এখন আর প্রতিদিন বিদ্যালয়ের ঘণ্টা শুনে শ্রেণিকক্ষে ঢুকবেন না লাকী স্যার। নতুন শিক্ষার্থীদের খাতা দেখবেন না, ক্লাস নেবেন না। কিন্তু পুরোনো শিক্ষার্থীরা যখন নিজেদের শৈশবের কথা বলবে, তখন সেই গল্পে ফিরে আসবেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষক।

১ এপ্রিল ঘোড়ার গাড়িতে করে দেওয়া বিদায় ছিল তাঁর ২৩ বছরের শিক্ষকতার শেষ আনুষ্ঠানিক অধ্যায়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় লাকী স্যারের নতুন এক পরিচয় তৈরি হয়েছে। সেই পরিচয় একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং ধোপাখালির একটি প্রজন্মের প্রিয় শিক্ষক হিসেবে।

২০০৩ সালে তিনি ধোপাখালিতে এসেছিলেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। ২৩ বছর পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদায় নিলেন একটি গ্রামের মানুষের ভালোবাসা নিয়ে। ধোপাখালির মানুষের কাছে তাই মিজানুর রহমান লাকী শুধু একজন শিক্ষক নন। তিনি একটি প্রজন্মের শৈশবের স্মৃতি এবং বিদ্যালয়ের দীর্ঘ পথচলার অংশ। নামে তিনি লাকী, আর ২৩ বছর পর ধোপাখালির মানুষের ভালোবাসা যেন প্রমাণ করে, সত্যিই তিনি এই গ্রামের জন্য লাকী হয়ে এসেছিলেন।