০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯:০২

মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রীকে ৩ মাস পর খোঁজে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন স্বামী, ভিডিও ভাইরাল 

স্ত্রী আলেয়ার সঙ্গে স্বামী আলী হোসেন   © সংগৃহীত

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রং বদলালেও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জায়গাটি অটুট থাকে স্বমহিমায়। যে কারণে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে অপার্থিবও বলা হয়। সেই কথারই যেন প্রমাণ দেখল নেটাগরিকরা। শুক্রবার (২ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল এক ভিডিওতে দেখা যায়, মানসিক ভারসাম্যহীন ভারসাম্যহীন স্ত্রীকে ৩ মাস পর খোঁজে পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদলেন বয়োবৃদ্ধ স্বামী । আর সেই ভিডিও ভাইরাল হতেই চোখ ভিজছে সবার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনাটি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার। তিন মাস ধরে স্ত্রী আলেয়া বেগমের (৪৩) কোনো সন্ধান পাচ্ছিলেন না সাটুরিয়া উপজেলার ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামের দর্জি আলী হোসেন। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে রেলস্টেশন, মাজার, হাসপাতাল ও পথঘাট—কোথাও খোঁজা বাদ রাখেননি তিনি। একপর্যায়ে নিখোঁজ স্ত্রীর সন্ধানে পোস্টারও ছাপান। শেষ পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মাত্র দুই মিনিটের একটি ভিডিওর সূত্র ধরে স্ত্রীকে ফিরে পেয়েছেন তিনি।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর পাশের সিংগাইর উপজেলার গোবিন্দল এলাকায় রাস্তার পাশে এক অসহায় নারীকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন স্থানীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রবিউল হক। পরে তিনি তার পেজে ওই নারীর একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরদিন ২৮ সেপ্টেম্বর সেটি আলী হোসেনের চোখে পড়ে।

ভিডিও দেখে তিনি বুঝতে পারেন, রাস্তার পাশে ঘুরে বেড়ানো ওই নারী তার স্ত্রী আলেয়া। এরপর এক মুহূর্তও দেরি না করে সিংগাইরে ছুটে যান তিনি।

তিন মাস পর স্ত্রীকে সামনে পেয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আলী হোসেন। স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। আলেয়াও স্বামীকে চিনতে পারেন। স্বামী-স্ত্রীর এই আবেগঘন মুহূর্তে উপস্থিত লোকজনও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

পরিবার সুত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে আলেয়া বেগমকে বিয়ে করেন আলী হোসেন। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। প্রায় ছয় বছর আগে আলেয়া প্রথম মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে ঢাকার একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। তবে তিন বছর আগেও একবার নিখোঁজ হয়েছিলেন তিনি। সেবার নয় দিন পর তার সন্ধান পাওয়া যায়। সর্বশেষ প্রায় তিন মাস আগে আবারও বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন আলেয়া।

আলী হোসেন বলেন, ‘প্রায় তিন মাস ধরে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ডসহ সব জায়গায় খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পাইনি। বাধ্য হয়ে পোস্টারিং করে নিখোঁজের খবরও প্রচার করি। স্ত্রীকে না পেয়ে খুব দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল।’

স্থানীয়রা জানান, আলেয়া নিজের নাম-ঠিকানাও ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না। গোবিন্দল এলাকার মানুষ তাকে কয়েক দিন ধরে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে দেখেছেন। কখনো মানুষের কাছে খাবার চেয়ে খেতেন, আবার রাত কাটাতেন রাস্তার পাশেই।

আলী হোসেন আরও বলেন, ‘ফেসবুকে ভিডিওটি দেখার পর এক মুহূর্তও দেরি করিনি, পরদিনই সেখানে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি সত্যিই আমার স্ত্রী! আমাকে দেখেই সে চিনতে পারে। তিন মাসের সব কষ্ট এক নিমেষেই দূর হয়ে যায়। স্ত্রীকে উদ্ধার করে সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ।’

আলেয়াকে সাটুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের ভাষ্য, তিনি এখন মানসিকভাবে অনেকটাই সুস্থ এবং পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারছেন। চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, আলেয়ার প্রাথমিক চিকিৎসা চলছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ দেখানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আলেয়ার ছেলে মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মাকে হারিয়ে এই তিন মাসে আমাদের পরিবারের সুখ-শান্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সামাজিক মাধ্যমের একটি ভিডিও আজ মাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।’

শুক্রবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আলেয়া বেগম বলেন, ‘স্বামী ও সন্তানদের কাছে পেয়ে আমি এখন অনেকটাই সুস্থ বোধ করছি।’  

ভিডিও নির্মাতা রবিউল হক বলেন, ‘রাস্তার পাশে অসহায় নারীটিকে দেখে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা মনে হয়েছিল। সেই ভাবনা থেকে ভিডিওটি বানিয়ে ফেসবুকে প্রকাশ করি। শেষ পর্যন্ত ওই নারীর স্বামী এসে তাকে নিয়ে যাওয়ায় আমি নিজেও আবেগাপ্লুত। পরিবারের কাছে এটিই সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়, আর আমার ভিডিও করাটাও সার্থক হয়েছে।’