১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬

ভিক্ষাবৃত্তির জন্য সেই শিশুর ‘পা কাটা ও কিডনি চুরির’ প্রমাণ পায়নি পুলিশ, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো যে তথ্য

বাঁয়ে গুরুতর আহত শিশুটির হাসপাতালে থাকা ছবি ডানে বাড়ী ফেরার পরের ছবি  © সংগৃহীত

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার সাতগড় গ্রামের শিশু মো. রায়হানের একটি পা ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজধানীর একটি চক্র কেটে দিয়েছে সম্প্রতি এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে রায়হানের একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার পরিচর্যার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে একজন আয়াকেও প্রায় দেড় মাস দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর উদ্দেশ্যে কেউ তার পা কেটে দিয়েছে এমন তথ্যের সঙ্গে পাওয়া ঘটনার মিল নেই।

ঢাকা রেলওয়ে পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, শিশুটি ও তার পরিবারের ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং রায়হানের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। গত ১১ জুন ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রায়হানের ডান পা কেটে ফেলা হয়। তার কিডনি অপসারণের অভিযোগেরও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রায় ৭/৮ মাস আগে পারিবারিক অভিমানের কারণে চট্টগ্রামের লোহাগড়া থানাধীন নিজ বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে আসে রায়হান। পরে সে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে অবস্থান শুরু করে। স্টেশনের শহরতলী প্ল্যাটফর্ম এলাকায় এলইইডিও এনজিও পরিচালিত পথশিশু স্কুলে নিয়মিত পড়াশোনা করত এবং সেখানে দুপুরের খাবার খেত।

ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত

গত ১১ জুন তারিখে ঢাকা থেকে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় রায়হান। দুর্ঘটনায় তার ডান পা ও মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। দুর্ঘটনার পর ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের টহল দল আহত রায়হানকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা গুরুতর বিবেচনা করে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।

বিষয়টি জানতে পেরে বিমানবন্দর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের নির্দেশনায় রেলওয়ে পুলিশের সদস্য কনস্টেবল/৭৭২ রিয়াজুল করিম হাসপাতালে উপস্থিত হন। পরে তিনি অ্যাম্বুলেন্সযোগে রায়হানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য রায়হানকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এ পাঠান। একই দিন ১১ জুন ২০২৬ তারিখ বিকেল ৩টা ৪৪ মিনিটে তাকে নিটোরের এক্সট্রা-১৩ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়।

নিটোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ২ জুলাই ২০২৬ তারিখে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রায়হানের ডান পা কর্তন করা হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসা শেষে সে আবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের শহরতলী প্ল্যাটফর্ম এলাকায় অবস্থান করতে থাকে বলে জানা যায়।

পা কেটে ভিক্ষাবৃত্তি ও কিডনি অপসারণের অভিযোগ

রায়হানের পা কেটে জোরপূর্বক তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করা এবং তার কিডনি অপসারণ করা হয়েছে—এমন তথ্য আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। তবে প্রাপ্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং রায়হানের চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে এ ধরনের অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ।

বিশেষ করে কিডনি অপসারণের অভিযোগের বিষয়ে রায়হানের আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রিপোর্ট অনুযায়ী রায়হানের উভয় কিডনি বিদ্যমান ও স্বাভাবিক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আরও পড়ুন: ট্রেন দুর্ঘটনার কারণে পা কাটতে হয়েছিল সেই শিশুর, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্রেও দেখা যায়, ১১ জুন তারিখে ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর রায়হান প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং সর্বশেষ জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর)-এ চিকিৎসা নেয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত তার ডান পা কেটে ফেলা হয়। ফলে রায়হানের পা কেটে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করা এবং কিডনি অপসারণের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় আগে প্রকাশিত বা প্রচারিত তথ্যের সঙ্গে পাওয়া চিকিৎসা নথিপত্র ও যাচাইকৃত তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পরিবারের কাছে ফেরানোর উদ্যোগ

চিকিৎসা শেষে রায়হান আবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের শহরতলী প্ল্যাটফর্ম এলাকায় অবস্থান করছিল। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সে জরিনা ‘মালির মা’ নামীয় এক নারীর টিনের ঘরে খাবার খেত এবং সেখানে একটি প্লাস্টিকের ব্যাংকে টাকা জমা রাখত। প্ল্যাটফর্মের পানির লাইনে কর্মরত আলামিন ও ইয়াসিনও এ বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন।

তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায়হানের পা কর্তনের আগে সে মিনা ও রাজু নামের এক ভিডিও ধারণকারী দম্পতির কাছে অবস্থান করত। পরে গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জাকির নামের এক ব্যক্তি রায়হানকে পরিবারের কাছে পাঠানোর উদ্দেশ্যে যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি বাসে তুলে দেয় বলে জানা যায়।

রায়হানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং তাকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ঢাকা রেলওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। রায়হানের চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্ট তথ্যের স্বচ্ছতা ও সঠিকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে ট্রেন দুর্ঘটনায় রায়হান আহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে হাসপাতালের মেঝেতে বসে রায়হানকে বলতে শোনা যায়, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে সে আহত হয়েছে। একই সময়ে সে জানায়, তার মা-বাবা নেই। ভিডিওতে তার মাথা ও পেটে আঘাতের চিহ্নও দেখা যায়। রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার নাজিম উদ্দীনের ছেলে। ১২ বছর বয়সী রায়হান একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত। প্রায় সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চুনতি এলাকার ওই মাহফিলে শিশুটিকে দেখতে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেন। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে শিশুটিকে শনাক্ত করেন তার বাবা। শিশুটির বাবা পেশায় দিনমজুর। শিশুটির মায়ের সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদ হয়েছে। বর্তমানে মা-বাবার আলাদা সংসার রয়েছে। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার আগে শিশুটি তার সৎমায়ের সঙ্গে থাকত। তখন তার ডান পা ছিল না। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের চিহ্ন দেখা যায়। এরপরই তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করতে রাজধানীর একটি চক্র পা কেটে দিয়েছে এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। 

তবে এসব তথ্যের বিষয়ে জানতে রায়হান ও তার পবিরারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবেদক। তারা ওই প্রতিবেদকের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি। তারা এখন হাসপাতালে আছে বলেও নিশ্চিত করেন।