১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:২৮

বর্জ্য থেকে জৈব সার-বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন, এখন দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ যশোরবাসী

যশোর নগরের হামিদপুরে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টে ময়লার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দরা  © টিডিসি

বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন নিয়ে যশোরে নির্মিত হয়েছিল দেশের প্রথম সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে চালু হওয়া সেই প্রকল্প আট বছর পরও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজে আসেনি; বরং বর্জ্যের পাহাড়, পচা দুর্গন্ধ ও দূষিত পানিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন প্ল্যান্টের আশপাশের বাসিন্দারা।

বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের বদলে হামিদপুর ও আশপাশের এলাকা এখন পচা দুর্গন্ধ, দূষিত পানি আর স্বাস্থ্যঝুঁকির এক নরককুণ্ডে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি প্ল্যান্ট পরিদর্শনে গিয়ে এর অচলাবস্থায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী।

স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা
চারদিকে শুধু আবর্জনার পাহাড়। বাতাসে ভাসছে তীব্র পচা দুর্গন্ধ। পৌরসভার গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুবাতাস আনতে যশোর শহরতলির হামিদপুরে (ঝুমঝুমপুর এলাকাসংলগ্ন) ১৩ দশমিক ২৫ একর জমির ওপর নির্মিত হয় সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টটি। উদ্দেশ্য ছিল, শহরের বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে একদিকে পরিবেশ রক্ষা করা, অন্যদিকে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করে রাজস্ব আয় বাড়ানো। সীমিত পরিসরে জৈব সার উৎপাদন হলেও বন্ধ রয়েছে বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। কিন্তু চালুর পর থেকে আজ পর্যন্ত এই মেগা প্রজেক্ট থেকে পৌরসভার মোট আয় হয়েছে মাত্র ১৫ লাখ টাকা। অথচ সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি হতে পারতো দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার রোল মডেল।

বর্তমানে যশোর পৌরসভা থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ টন ময়লা-আবর্জনা এই প্ল্যান্টে ফেলা হলেও প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ বর্জ্য। বাকি সুবিশাল বর্জ্যের স্তূপ খোলা জায়গায় পড়ে থেকে পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বরং প্লান্টের দুর্গন্ধ ও নোংরা পানি ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন আশপাশের বাসিন্দারা। এ ছাড়া যশোর-নড়াইল মহাসড়কে যাতায়াতকারী মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী এই দুর্গন্ধ আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

বন্ধ বিদ্যুৎ-বায়োগ্যাস
২০২২ সালে সংকট নিরসনে ‘দ্য স্কেট লিমিটেড’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০ বছরের জন্য প্ল্যান্টটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে বেসরকারি খাতে দিয়েও কাজ হয়নি একটুও। আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং বর্জ্য আলাদাকরণে জটিলতা এর প্রধান কারণ।

দ্য স্কেট লিমিটেডের ম্যানেজার সোহেল রেজা বলেন, ‘উপযুক্ত ও আধুনিক সেগ্রিগেশন (বর্জ্য আলাদাকরণ) মেশিন না থাকায় শতভাগ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। মেশিন থাকলে শতভাগ ময়লা সেগ্রিগেশন করে আরও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হতো। যে মেশিনটি রয়েছে, তা এ ময়লার জন্য উপযুক্ত নয়। এর মধ্যেও আমরা প্রতি মাসে প্রায় ১০০ টন উন্নতমানের জৈব সার তৈরি করছি, বাজারে যার বিপুল চাহিদা রয়েছে।’

বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বায়োগ্যাস প্লান্ট চালিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের তুলনায় গ্যাস পাওয়ার হার কম। এই কারণে আমরা এই প্রজেক্টটা বন্ধ রেখেছি। এছাড়া উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় হাইভোল্টেজ ট্রান্সফর্মেশন ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমানে এটি বন্ধ রাখা হয়েছে। স্বল্প গ্যাসে কীভাবে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।’

দুর্বিষহ জনজীবন
প্ল্যান্টের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় এলাকার বাতাস ২৪ ঘণ্টা পচা দুর্গন্ধে ভারী হয়ে থাকে। বর্ষাকালে প্ল্যান্ট থেকে বিষাক্ত ও পচা নোংরা পানি গড়িয়ে মহাসড়ক ও লোকালয়ে চলে আসে, যার কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের শরীরে ঘা-পাঁচড়াসহ নানা চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে।

স্থানীয় দোকানি আব্দুল জব্বার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যশোর পৌরসভার এই ময়লাখানা গড়ে ওঠার কারণে আমরা ঠিকমতো চলাচল করতে পারিনে। প্রচণ্ড দুর্গন্ধে এই এলাকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ। সন্তানদের নিয়ে আমরা খুব বিপদে আছি। তারা বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। বর্ষার সময় পচা ময়লা পানি রাস্তায় চলে আসে। পায়ে লাগলেই ঘা হয়ে যায়। দুর্গন্ধের কারণে এখানে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’

তিনি জানান, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে প্রজেক্টের নামে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ভেতরে নামে প্রজেক্ট আছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যক্রম নেই।

প্ল্যান্টের পাশেই অবস্থিত যশোর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ একাধিক সরকারি কলেজ, স্কুল ও মাদরাসা রয়েছো।

এর একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আমিনুর রহমান বলেন, আগে একদম খোলা রাস্তায় ময়লা ফেলা হতো। বিশেষ করে গরমে মরা প্রাণীর দেহ ফেলা হলে বাতাসে এমন দুর্গন্ধ আসতো যে মাস্ক পরেও ক্লাসে থাকা যেতো না। পরে সীমানা প্রাচীর দিয়ে কিছুটা দূরে ময়লা ফেলায় দুর্গন্ধ সামান্য কমলেও শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও পড়াশোনা মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।

‘ঘনবসতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এই ময়লাখানা দ্রুত অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া উচিত। এর আগে পৌরসভা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমরা জানিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি,’ বলেন শিক্ষক আমিনুর।

সুখবরের আশ্বাস
সম্প্রতি স্থবির হয়ে পড়া এই বর্জ্য প্ল্যান্টটি পরিদর্শনে যান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। প্ল্যান্টের সার্বিক বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর আশ্বাস দেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সেদিন বলেছিলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে ভবিষ্যতে মানুষের জন্য কী করা যায়- এটা দেখব। পরিবেশবান্ধব এমন একটি মেগা প্রজেক্ট কেনো ব্যর্থ হলো, তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রজেক্ট তৈরি ও পরিচালনার দায়িত্বে যারা ছিল, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। মাত্র ১০ থেকে ৫০ শতাংশ বর্জ্য ব্যবহার করে বাকিটা ফেলে রেখে পরিবেশের বারোটা বাজানো হয়েছে। আমরা খুব দ্রুত যশোরবাসীর জন্য একটি ভালো খবর দিতে পারব।’

যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান জানান, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি ইউনিক সিস্টেম। বর্তমানে এই ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে চলছে না। প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে ইতিমধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ টিম ও উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ড্রেন ও প্রাচীর নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু হবে। জমে থাকা ময়লার সঠিক ব্যবস্থাপনায় কাজ চলছে।

তিনি বলেন, ‘আশা করছি শিগগিরই নাগরিকরা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবেন।’