নিখোঁজের ৪ দিন পর ঢাবি ছাত্রের বড় ভাইয়ের লাশ উদ্ধার— বউকে বেশ্যা বলায় ‘বন্ধুর হাতে খুন’, বলছে পুলিশ
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে নিখোঁজের চার দিন পর পরিত্যক্ত টয়লেটের ট্যাংকি থেকে মফিদুল ইসলাম (৪০) নামে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়েরের পর মো. মাসুদ মিয়া (২৯) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, আসামির সাবেক স্ত্রীকে বেশ্যা বলাকে কেন্দ্র করে মফিদুলকে হত্যা করা হয়। নিহত মফিদুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. সুমন রানার বড় ভাই।
নিহত মফিদুল ইসলাম পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন। তিনি নবাবগঞ্জ উপজেলার মালদহ গ্রামের বাসিন্দা। গ্রেফতার মো. মাসুদ মিয়াও একই গ্রামের বাসিন্দা। তিনি মফিদুলের প্রতিবেশী এবং তাদের মধ্যে পূর্বপরিচয় ও সুসম্পর্ক ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। বিষয়টি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল কুদ্দস।
পুলিশ জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটে মফিদুল ইসলাম বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে পরদিন ৫ সেপ্টেম্বর নবাবগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
নিখোঁজ মফিদুলের সন্ধানে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তাসহ বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান চালায় নবাবগঞ্জ থানা পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৮ সেপ্টেম্বর বিকেল আনুমানিক ৪টা ৪৫ মিনিটে আসামি মো. মাসুদ মিয়ার বাড়ির পূর্ব পাশে সেচ পাম্পের টিনশেড ঘরের কাছে একটি পরিত্যক্ত টয়লেট থেকে পচা দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। পরে পরিত্যক্ত টয়লেটের স্লাব (ঢাকনা) খুলে মফিদুল ইসলামের মরদেহ দেখতে পান তারা।
এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই মো. লিটন মিয়া বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় এজাহার দায়ের করলে হত্যা মামলা করা হয়। মামলার তদন্ত ও আসামি গ্রেফতারে অভিযান চালিয়ে মো. মাসুদ মিয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ জানান, প্রায় ছয় মাস আগে তার স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে তিনি মানসিকভাবে হতাশ ছিলেন এবং প্রায়ই রাতে হাঁটাহাঁটি করতেন। সাপ-পোকামাকড় থেকে বাঁচতে সঙ্গে বাঁশের লাঠি রাখতেন তিনি।
পুলিশ জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টার দিকে বাড়ি থেকে ২০০ থেকে ৩০০ গজ দূরে মফিদুল ইসলামকে ভিটায় গান গাইতে দেখেন মাসুদ। মফিদুল প্রায়ই রাতে গান গাইতেন। তার গানের সুরও ভালো ছিল। মাসুদ সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে মফিদুল তার সাবেক স্ত্রীর খোঁজ জানতে চান।
জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ পুলিশকে জানান, সাবেক স্ত্রীর বিষয়ে কথা বলার সময় মফিদুল হেসে তাকে বলেন, ‘তোর শাশুড়ীও বেশ্যা, তোর বউও বেশ্যা।’ সাবেক স্ত্রীকে নিয়ে এমন মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে মাসুদ তার হাতে থাকা বাঁশের লাঠি দিয়ে মফিদুলের মাথায় সজোরে আঘাত করেন। এতে মফিদুল মাটিতে পড়ে যান। পরে তিনি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে মাসুদ তার গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে পুলিশকে জানান।
এরপর মফিদুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি মাটিতে আছাড় দিয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করেন মাসুদ। পরে ফোনটি কুড়িয়ে নিয়ে মফিদুলের মরদেহ কাঁধে করে তার বাড়ির দিকে রওনা হন। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে মফিদুলের বাড়ির দরজায় পৌঁছে মরদেহ সেখানে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও পরে তা পরিবর্তন করে পাশের জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে একটি পরিত্যক্ত টয়লেট দেখতে পেয়ে সেটির স্লাব সরিয়ে মরদেহ ভেতরে রেখে দেন। পরে স্লাবটি পুনরায় লাগিয়ে বাড়িতে চলে যান।
পুলিশ আরও জানায়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বাঁশের লাঠিটি মাসুদ তার বসতবাড়ির আঙিনায় ফেলে রাখেন। আর মফিদুলের মোবাইল ফোনটি পাশের প্রতিবেশী ফুল মিয়ার বাড়ির বাইরের আঙিনায় থাকা খড়ের পালায় লুকিয়ে রাখেন।
মাসুদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বাঁশের লাঠি ও নিহত মফিদুল ইসলামের ব্যবহৃত একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। গত ৯ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা জব্দতালিকা মূলে আলামত দুটি জব্দ করেন।
পরে নিহতের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হলে গত ৯ সেপ্টেম্বর বিকেলে নবাবগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
মফিদুলের ছোট ভাই ও ঢাবি শিক্ষার্থী মো. সুমন রানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আসামি মাসুদ ও আমার বড় ভাই মফিদুল ইসলাম ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আমার ভাইয়ের গানের গলা (কণ্ঠ) ভালো ছিল। তারা নিয়মিতই আমাদের বাড়ির বাশঝাঁড়ের নিচে বসে আড্ডা-গান করত। সবসময় একসাথে থাকত। কিন্তু নিখোঁজের দিন রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তার লাশ আসামির বাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে পাই। মাসুদ অনলাইন জোয়া ও নেশাগ্রস্থ ছিল। আমার ভাইয়ের কাছে টাকা চেয়ে না পাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
এ বিষয়ে নবাবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল কুদ্দস দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত আছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।’