মৃত্যুর আগে ডায়েরিতে দায়ীর নাম লিখে গেলেন শিক্ষক, মহাসড়ক অবরোধ শিক্ষার্থীদের
রাজশাহীর পুঠিয়ায় বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সাহাদুল হকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মৃত্যুর প্রায় এক বছর আগে নিজের ডায়েরিতে লিখে যাওয়া একটি ‘হলফনামা’ সদৃশ বক্তব্য সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের শাস্তির দাবিতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সাহাদুল হকের মৃত্যু হয়। স্থানীয়ভাবে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে স্ট্রোক বা স্বাভাবিক শারীরিক অসুস্থতার কথা বলা হলেও, সম্প্রতি প্রকাশিত ডায়েরির পাতার তথ্য ঘটনাটিকে এক নতুন ও রহস্যজনক মোড়ে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।
মৃত্যুর প্রায় এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ডায়েরির পাতায় ‘Subject: হলফনামা’ শিরোনামে সাহাদুল হক নিজের সম্ভাব্য মৃত্যুর বিভিন্ন কারণ ও পরিস্থিতির কথা লিখে যান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়া, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক কিংবা অন্য কোনো কারণে তাঁর মৃত্যু হলেও বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজাদ আলীকে তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী গণ্য করতে হবে।
ডায়েরির এই লেখাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। আজ সকালে তারা বানেশ্বর বাজার এলাকায় ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেয় এবং প্রধান শিক্ষক আজাদ আলীর বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে।
বিক্ষোভকালে বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাব্বির বলেন, সাহাদুল স্যার আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও সদয় একজন মানুষ ছিলেন। আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই শুনছিলাম স্যারকে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। মৃত্যুর আগে ডায়েরিতে প্রধান শিক্ষকের নাম লিখে যাওয়া প্রমাণ করে স্যার কতটা নিরুপায় ছিলেন। আমরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের অবলম্বে অপসারণ চাই।
আরেক শিক্ষার্থী তানভির আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একজন শিক্ষক অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ছুটি দেওয়া হতো না, বন্ধের দিনেও ডেকে এনে আটকে রাখা হতো এটা মানসিক নির্যাতন ছাড়া আর কিছুই নয়। ডায়েরির পাতায় স্যারের আকুতি স্পষ্ট। আমরা বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।
একই দাবি জানিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী রাশেদুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষককে কীভাবে মানসিক চাপে পিষে মারা হয়েছে, তা আজ দেশবাসী জানতে পেরেছে। পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে আমাদের আকুল আবেদন—একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রধান শিক্ষক আজাদ আলীকে আইনের আওতায় আনা হোক।
এর আগে নিহত সাহাদুল হকের স্ত্রী মোছা. শারমিন আক্তার অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামী বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে চাকরি করত। চাকরি অবস্থায় প্রধান শিক্ষক মো. আজাদ আলী তাঁর সঙ্গে অনেক সময় খারাপ আচরণ করেছেন। যখন বাসায় আসত, তখন অনেক কষ্ট ও ভারাক্রান্ত মনে থাকত। প্রধান শিক্ষক তাঁর ওপর যে মেন্টালি প্রেশার দিতেন, সেগুলা থেকেই সে ওই কথাটা লিখছিল। অফিসে ডেকে নিয়ে গালাগালি করা হতো, এমনকি অসুস্থতার সময়েও ছুটি দিতেন না। তাঁর কারণেই আমার স্বামী মারা গেছে।
নিহত সাহাদুল হকের বড় মেয়ে তাসফিয়া তারিন সেফা বলেন, প্রধান শিক্ষক আজাদ আলী বিভিন্নভাবে আমার আব্বুকে মেন্টাল প্রেশার দিতেন। শুক্র-শনিবার ছুটির দিন হলেও রাত ১০টা পর্যন্ত আটকে রাখতেন। এসএসসি পরীক্ষার সময় মিথ্যা চুরির অপবাদও দেওয়া হয়েছিল। আমার আব্বু মুখ বুজে সব সহ্য করেছে। আব্বুর মৃত্যুর পেছনে ওই প্রধান শিক্ষকই দায়ী।
তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বানেশ্বর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আজাদ আলী মুঠোফোনে জানান, আমার বিরুদ্ধে আনীত সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
বিদ্যালয়ের সভাপতি মাহাবুব সরকার জনি বলেন, আমরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলেছি তাদের দাবি গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।