স্কুলশিক্ষককে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতের অভিযোগ
‘তুই আমাদের একটা ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিস কেন?’—এমন প্রশ্ন করেই নজরুল ইসলাম মানিক (৩৬) নামের এক স্কুলশিক্ষককে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিনের অনুসারী মেহেজাদ হোসেন জিহাদ প্রকাশ ডেভিড জিহাদ ও তার দলবলের বিরুদ্ধে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের শহীদ মেজর নাজমুল হক সড়কে এ ঘটনা ঘটে।
আহত নজরুল ইসলাম লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উকিলের পাড়ার আবদুল গণির ছেলে এবং উপজেলার ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
ওই স্কুলশিক্ষকের ওপর অতর্কিত হামলার সময় স্থানীয়রা এগিয়ে গেলে হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার মুহূর্তের একটি সিসিটিভি ফুটেজ এসেছে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের হাতে। সেখানে দেখা যায়, ডেভিড জিহাদসহ অন্তত ৫-৬ জন দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য র্যালিতে ডেভিড জিহাদকে দলবল নিয়ে মুসলিমের ছবি-সংবলিত ফটোকার্ড নিয়ে হাঁটতে দেখা গেছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ঘটনায় শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) মধ্য রাতে আহত স্কুলশিক্ষক নজরুল ইসলাম মানিক বাদী হয়ে আরিয়ান মো. আয়ান, মেহেজাদ হোসেন জিহাদ, সাজিম, মফিদুল কবির সুইন, হামজা, আকতার হোসেন ও শাহেদসহ ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা বিবাদী করে লোহাগাড়া থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন
ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দীন ভূঁইয়া সুমন বলেন, ‘গত (২২ আগস্ট) আমাদের বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিপড়ুয়া আব্দুল্লাহ নামে এক শিক্ষার্থীকে স্কুলের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর আমি সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যালোচনা করে সহকর্মী নাজিম উদ্দিনকে (আহত শিক্ষকের ছোট ভাই) সঙ্গে নিয়ে বটতলী স্টেশনের একটি রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তাকে উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আয়ানকে আটক করে লোহাগাড়া থানা পুলিশের নিকট সোপর্দ করেছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক ইদিন সন্ধ্যায় ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মোবাইলে ডেভিড জিহাদ পরিচয়ে আমাকে হুমকি প্রদান করা হয়। পরে আমি বিষয়টি আমার পার্শ্ববর্তী এক যুবদল নেতা ইসফাক উদ্দিন চৌধুরী ইভুকে জানালে তিনি আমাকে ওই মোবাইল নম্বর শনাক্তে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন এবং ডেভিড জিহাদ ছেলেটা মুসলিম উদ্দিনের অনুসারী বলে জানান। আবার ওই দিন রাতে ইভু আমাকে থানায় আসার জন্য বললে আমি গিয়ে দেখি যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিন সেখানে ডেভিড জিহাদ নামের ওই ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। পরে মুসলিম ছেলেটাকে মারধর করে আমার কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়েছিল। এরপরই জানতে পারলাম ডেভিড জিহাদ মূলত যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের অনুসারী।’
স্কুলশিক্ষক নজরুল ইসলাম মানিকের উপর হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নজরুল ইসলাম মানিক ও তার ছোট ভাই নাজিম উদ্দিন আমাদের বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। আমি যেদিন আয়ানকে আটক করে থানায় সোপর্দ করেছিলাম সেদিন আমার সঙ্গে নাজিম উদ্দিনও ছিলেন। নাজিম উদ্দিনের চেহারার সঙ্গে মিল থাকায় হামলাকারীরা নজরুল ইসলাম মানিকের ওপর হামলা করেছে।’
আহত স্কুলশিক্ষক নজরুল ইসলাম মানিক বলেন, “আমি এবং আমার বন্ধু মারওয়ান মিলে মা ও শিশু হাসপাতালের পেছনে চা খেয়ে শহীদ মেজর নাজমুল হক সড়ক হয়ে যাওয়ার সময় ৪-৫ জন ছেলে ‘তুই আমাদের একটা ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিস কেন?’ প্রশ্ন তুলে ছুরি ও ক্ষুর নিয়ে আমাদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা আমার শরীরের বিভিন্ন অংশ আঘাত করেছে। এরপর আমরা দৌড়ে কিছুদূর সামনে গেলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসায় হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।”
লোহাগড়া উপজেলা যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইসফাক উদ্দিন চৌধুরী ইভু বলেন, ‘ডেভিড জিহাদ নামের এক ছেলে প্রধান শিক্ষককে হুমকি দিয়েছিল, সেটা তিনি রেকর্ড করেছিলেন। পরের তিনি আমাকে ওই রেকর্ডটি দেন। তখন আমি সেটি পর্যালোচনা করে জানতে পারি, হুমকিদাতা ডেভিড জিহাদ যুবদল নেতা মুসলিম উদ্দিনের সঙ্গে রাজনীতি করেন এবং তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আছেন। পরে আমি রেকর্ডটি মুসলিমকে পাঠালে তিনি আমাকে ওই প্রধান শিক্ষককে নিয়ে থানায় আসার জন্য বলেন। পরে মুসলিমও ডেভিড জিহাদকে নিয়ে থানায় আসেন। সেখানে একটি বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান হয়। এমনকি মুসলিম ওই জিহাদকে জুতা দিয়ে মারধরও করেছেন। পরবর্তীতে এমন অপরাধ করলে মুসলিম নিজেই তাকে থানায় সোপর্দ করার কথা জানান।’
আহত স্কুলশিক্ষক নজরুল ইসলাম মানিকের ফুফু আয়েশা বেগম বলেন, ছেলেকে ছুরিকাঘাতের খবর শুনে মা জাহানারা বেগম জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাকে লোহাগাড়া সদরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. হোসাইন আল ইমরান বলেন, ওই শিক্ষককে আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তার শরীরের বিভিন্ন অংশের ক্ষত স্থানগুলোতে ড্রেসিং ও সেলাই করা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে লোহাগাড়া উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিনের ফোনে যোগাযোগ করা হলে ডেভিড জিহাদ তার অনুসারী না দাবি করে তিনি বলেন, ‘ওই দিন ইসফাক উদ্দিন চৌধুরী ইভু ও বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির একজন সদস্য আমাকে কল দিয়ে থানায় ডেকেছিল। আমি সেখানে গিয়ে এলাকার ছেলে হিসেবে জিহাদকে মেরেছি। এমনকি আমিই ওই শিক্ষককে থানায় অভিযোগ করার জন্য বলেছিলাম। আর আমার মিছিলে প্রায় ১০ হাজার মানুষ হয়েছে। সেখানে অনেক মানুষ অংশ নিয়েছে। এখন জিহাদ সেখানে কিভাবে আসলো সেটা আমার জানা নেই। এমনকি সে ছাত্রলীগ করত কি না, এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাতকানিয়া সার্কেল) মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, খবর পেয়ে থানা পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ ছাড়া আহত শিক্ষক বাদী হয়ে একটি অভিযোগ করেছেন। পুরো বিষয়টি তদন্তপূর্বক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রসঙ্গত, স্থানীয় সূত্রের মতে মেহেজাদ হোসেন জিহাদ প্রকাশ ডেভিড জিহাদ িআগে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিনের অনুসারী পরিচয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন।