তিন মাস পর সুন্দরবন খুললেও স্বস্তি নেই জেলেদের
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) জেলেদের জন্য সুন্দরবনের দুয়ার খুললেও স্বস্তি ফিরছে না উপকূলের বনজীবীদের। মাছ ও কাঁকড়া ধরতে বনে যাওয়ার আগেই তিনটি দস্যু বাহিনীকে নৌকাপ্রতি ৭৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলেরা। চাঁদা না দিলে বনের ভেতরে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের আতঙ্কে রয়েছেন তারা।
বনজীবীদের অভিযোগ, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ‘বড় জাহাঙ্গীর’, ‘দয়াল-নানা ভাই ওরফে ডন আনারুল’ এবং ‘মঞ্জু ও দুলাভাই বাহিনী’ নামে তিনটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। নিজেদের মধ্যে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে এসব বাহিনী তাণ্ডব চালাচ্ছে। তাদের দাবি, তিন বাহিনীতে বর্তমানে প্রায় ১২০ থেকে ১৪০ জন সশস্ত্র সদস্য রয়েছে।
সরেজমিনে সাতক্ষীরা রেঞ্জের এলাকায় দেখা যায়, সুন্দরবনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেরা। কেউ নৌকা মেরামত করছেন, কেউ জাল গোছাচ্ছেন, আবার কেউ সংগ্রহ করছেন খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। তবে দীর্ঘ তিন মাস পর জীবিকার প্রধান উৎস সুন্দরবনে ফিরতে পারলেও দস্যু আতঙ্ক তাদের পিছু ছাড়ছে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে জানান, সুন্দরবনে যাওয়ার আগে প্রতিটি দস্যু বাহিনীকে দিতে হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। তিন বাহিনী মিলিয়ে একটি নৌকাকে দিতে হচ্ছে প্রায় ৭৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা। চাঁদা পরিশোধের পরই নিরাপদে বনে প্রবেশের সুযোগ মেলে বলে তাদের অভিযোগ।
এক জেলে বলেন, বনে মাছ ধরতে গিয়ে কত টাকা আয় হবে জানি না। কিন্তু যাওয়ার আগেই দস্যুদের টাকা দিতে হচ্ছে। টাকা না দিলে বনের ভেতরে ধরে নিয়ে যাবেএই ভয় আছে। পরিবার আছে, জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে টাকা দিতে হয়।
আরেক জেলে বলেন, চাঁদা না দিয়ে বনে গেলে জিম্মি করে আরও বেশি টাকা দাবি করে। তখন পরিবারের কাছ থেকে টাকা এনে মুক্ত হতে হয়। তাই আগে থেকেই চাঁদা দিয়ে যাওয়াই নিরাপদ মনে হয়।
বনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে তিন দস্যু বাহিনী। নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশকারী জেলেদের কাছ থেকে তারা চাঁদা আদায় করে। কেউ নির্ধারিত টাকা না দিলে তাঁর নৌকা ও জেলেদের ওপর হামলা, জিম্মি কিংবা মুক্তিপণ দাবির আশঙ্কা থাকে।
জেলেদের দাবি, দস্যুদের এই চাঁদাবাজি নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবিকার সঙ্গে এই আতঙ্ক জড়িয়ে আছে। তবে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক জেলে বনে ফেরায় দস্যুদের চাঁদাবাজি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বনজীবীরা ভয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কেউ কথা বললেও নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। তাদের আশঙ্কা, পরিচয় প্রকাশ পেলে বনে প্রবেশের পর দস্যুদের প্রতিশোধের শিকার হতে পারেন তারা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জে মাছ ও কাঁকড়া ধরার জন্য বৈধ ২ হাজার ৯০০টি বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) রয়েছে। প্রতিটি নৌকায় দুই থেকে তিনজন করে জেলে বনে প্রবেশ করবেন। সব মিলিয়ে ধাপে ধাপে প্রায় ৯ হাজার জেলে সুন্দরবনে যাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ সম্পদ আহরণ বন্ধ ছিল। তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ থেকে জেলে ও পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন উন্মুক্ত হয়েছে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনে জেলেদের নিরাপত্তায় কোস্টগার্ড তৎপর থাকবে। পাশাপাশি বন বিভাগের স্মার্ট প্যাট্রলিং টিম ও বনকর্মীরা নিয়মিত টহল দেবেন। পর্যটকদের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মশিউর রহমান বলেন, বন বিভাগ থেকে অনুমতিপত্র নিয়ে জেলেরা সুন্দরবনে প্রবেশ করছেন। সুন্দরবনে জেলেদের মাধ্যমে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করার জন্য তাদের সতর্ক করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিষ দিয়ে মাছ শিকার, হরিণ শিকারসহ নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে বনজীবীদের অভিযোগ, বন বিভাগের বৈধ অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ মিললেও তাদের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে দস্যুদের চাঁদাবাজি। মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবিকা চালাতে সুন্দরবনে যাওয়া ছাড়া তাঁদের সামনে বিকল্পও কম।
তাই তিন মাস পর সুন্দরবন উন্মুক্ত হলেও উপকূলের জেলেদের কাছে সুন্দরবনের পথ যেন এখনও আতঙ্কের। বনে যেতে হলে আগে দিতে হবে দস্যুদের চাঁদা, আর না দিলে অপেক্ষা করছে জিম্মি ও মুক্তিপণের ভয়।