৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৪৪

দালাল ছাড়া পাসপোর্ট মেলে না, টাকা দিলেই সমাধান—ঝালকাঠি পাসপোর্ট অফিসে অনিয়মের অভিযোগ

ঝালকাঠি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস।  © টিডিসি ফটো

সরকারি নির্ধারিত ফি দিয়ে পাসপোর্ট করতে আবেদন করেন সাধারণ মানুষ। নিয়ম অনুযায়ী অনলাইনে আবেদন, নির্ধারিত ফি পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে সেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু ঝালকাঠি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঘিরে উঠছে উল্টো অভিযোগ। 

ভুক্তভোগীদের দাবি, দালালের মাধ্যমে গেলে কাজ সহজ, অথচ সরাসরি সেবা নিতে গেলে পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত টাকা না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয় গ্রাহকদের। এমনকি দালালদের সঙ্গে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অনুসন্ধানে নামে এই প্রতিবেদক। পাসপোর্ট অফিসে সরাসরি গেলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আর দালাল ধরলে সহজে কাজ সম্পন্ন করা যায়, এমন অভিযোগ গ্রাহকদের।

ঝালকাঠির কৃষ্ণকাঠী, বিশ্বরোড সংলগ্ন আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ পাসপোর্ট করতে আসেন। সরকারি নিয়মে ই-পাসপোর্টের জন্য প্রথমে অনলাইনে আবেদন, নির্ধারিত ফি পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দেওয়া হয়। সরকারি সেবায় প্রথমে আবেদন গ্রহণ, বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট, যাচাই, প্রিন্টিং এবং পাসপোর্ট বিতরণ করা হয়। 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অফিসের সামনে থাকা কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে ঘিরে দালালচক্র গড়ে উঠেছে । তাদের সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আনসার সদস্যদের যোগসাজশ রয়েছে। সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও ব্যাংকের ট্রেজারি চালানের রশিদ জমা দেওয়ার পর অতিরিক্ত এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা না দিলে নানা অজুহাতে ঘুরতে হয়। আর দালালের মাধ্যমে গেলে একই কাজ তুলনামূলক সহজে হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, যাদের সব কাগজপত্র সঠিক থাকে, তাদের কাছ থেকেও দালালরা পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার নামে অতিরিক্ত এক থেকে দেড় হাজার টাকা আদায় করে। আর নাম, বয়স, বাবা-মায়ের নাম কিংবা অন্য কোনো তথ্যের ভুল থাকলে অঙ্কটা বেড়ে যায় আরও বহুগুণ। এ ধরনের ভুল সংশোধনসহ বিভিন্ন কাজের জন্য দালালরা ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চুক্তি করে কাজ করে দেয়।

প্রতিবেদকের অনুসন্ধান
দালালদের সঙ্গে আনসার সদস্যদের যোগসাজশের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পরিচয় গোপন রেখে অনুসন্ধানে নামে এই প্রতিবেদক। পাসপোর্ট করতে আসা সাধারণ গ্রাহকের পরিচয়ে জেলার পাসপোর্ট অফিসে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়। গেট দিয়ে প্রবেশের পরই আনসার সদস্যরা আটকে দেন প্রতিবেদকসহ অন্যদেরকে। গেটে থাকা আনসার সদস্য জাহিদুল আরেক আনসার সদস্য শাকিলের কাছে নিয়ে যান। 

পরে শাকিল পাসপোর্ট অফিসের সামনে থাকা একটি কম্পিউটার দোকানের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের কাছ থেকে অনলাইন আবেদন করার পরামর্শ দেন ওই আনসার সদস্য। আনসার সদস্য পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘অফিসের ভেতরে না গিয়ে নির্দিষ্ট ওই দোকান থেকে আবেদন করে পাসপোর্ট অফিসে জমা দিলে কাজ সহজে হয়ে যাবে।’

এরপর ১ দিন পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আনসার সদস্যদের সঙ্গে কম্পিউটার দোকানের লোকজনের এমন যোগাযোগের বিষয়ে জানতে পাসপোর্ট অফিসে যাওয়া হয়। তখন আনসার সদস্যরা অভিযোগের বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন এবং ঘুষের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি ওই আনসার সদস্যরা।
 
নানা অভিযোগ সাধারণ মানুষের
সরেজমিনে পাসপোর্ট করতে আসা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। রাজাপুর উপজেলা থেকে পাসপোর্ট করতে আসা ভুক্তভোগী আমির হোসেন বলেন, ‘সৌদি আরব থাকি অনেক বছর ধরে, আবার যাব। তবে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নামে ভুল ছিল, যার জন্য দালালকে ধরে ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে পাসপোর্ট করতে হয়েছে। দালালকে না ধরে কোনদিন পাসপোর্ট করতে পারবো না। প্রথমে আমি চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু পারি নাই। যখন দালাল ধরিলাম, তখনই পারছি। পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাহিরের আবেদন করার দোকানদের যোগাযোগ আছে। তাদের মাধ্যমে কর্মকর্তারা টাকা নেয়।’

আরেক ভুক্তভোগী জয়দেব হালদার বলেন, ‘ভারতে চিকিৎসার জন্য যাব, তাই পাসপোর্ট করতে আসছি। আবেদন করেছি, সকল কাগজপত্র ঠিক আছে। গ্রামের নাম ভুলে দুইবার হইছে। আবেদনপত্রে ছাত্র লেখায় এখন স্কুলের সার্টিফিকেট, মার্কশিট, সনদপত্র লাগবে। তবে দালাল আমার কাছে বাড়তি ১ হাজার ৫০০ টাকা চাইছিল। আমি না দেওয়াতে এই ভুল ধরে আটকে দিছে। বের হলাম, পর দালাল বলছে কোনো কিছু লাগবে না, আপনি শুধু টাকা দেন, সব কিছু ঠিক করে দিবো। আমি রাজি না হওয়াতে এখন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’

দুদকের অভিযানেও অনিয়মের অভিযোগ
২০১৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর গ্রাহক হয়রানি ও নানা অনিয়মের অভিযোগে ঝালকাঠি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক। অভিযানে অফিসের এক কর্মচারীর কক্ষ থেকে ২ লাখ ১২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। এরপর অভিযোগের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আবারও ঝালকাঠি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অভিযান চালায় দুদক। এবার ছদ্মবেশে পাসপোর্ট করতে আসা গ্রাহক সেজে তথ্য সংগ্রহ করেন দুদক কর্মকর্তারা। 

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, পাসপোর্ট করে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা দাবি করেন কাওসার সিকদার নামে একজন দালাল। পরে তাকে হাতেনাতে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ২০০ টাকা জরিমানা করেন। অন্য দুজনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা ও আনসার সদস্যদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট আনসার সদস্যরা এবং পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক শফিউল্লাহ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার অফিসের কেউ দালালদের সঙ্গে জড়িত নন। কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি। তবে অফিসের বাইরে থাকা দালালদের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার তার নেই বলেও জানান। তার মতে, ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন যদি পাসপোর্ট অফিসের বাইরে থাকা দালালদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেয়, তাহলে দালালদের দৌরাত্ম্য কমতে পারে।

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মমিন উদ্দিন বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ মানুষ যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন এবং দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিতে না হয়, সে বিষয়ে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। পাসপোর্ট অফিসের বাইরে যদি কোনো দালালচক্র সক্রিয় থাকে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি অফিসের ভেতরের কেউ যদি এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’