‘যার থাকার ঘর নাই, তার পুরস্কার দিয়া কী অইব’
‘যার থাকার ঘর নাই, তার পুরস্কার দিয়া কী অইব’—কথাটি বলতে গিয়ে যেন ১৩ বছরের জমে থাকা কষ্টই প্রকাশ পেল সুমী বেগমের কণ্ঠে। জীবনসংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ পুরস্কার। হাতে উঠেছে ক্রেস্ট ও সনদ। অথচ নিজের ও একমাত্র ছেলের মাথা গোঁজার মতো একটি স্থায়ী ঘর আজও নেই তার।
আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস-২০২৫ উপলক্ষে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে দেশব্যাপী পরিচালিত ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ কার্যক্রমে ‘নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবনসংগ্রামে’ ক্যাটাগরিতে নকলা উপজেলায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী নির্বাচিত হন সুমী।
শেরপুরের নকলা পৌর শহরের জালালপুর এলাকার বাসিন্দা সুমী প্রায় ১৩ বছর আগে নেশাগ্রস্ত স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মাত্র তিন মাস বয়সী ছেলে সৌরভকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। পরে স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য হন তিনি। স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করলেও সুমীর জীবনে যেন শেষ হয়নি সংগ্রাম।
ছেলেকে মানুষ করার প্রত্যয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেননি সুমী। সেই তিন মাসের শিশু সৌরভ এখন ১৩ বছরের কিশোর। সে নকলা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছেলের ভবিষ্যৎ গড়তেই গত ১৩ বছর ধরে নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন মা।
সুমীর বাবা ফারুক মিয়া পেশায় অটোচালক। নিজের সংসার চালাতেই তাকে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে মেয়ে ও নাতির দায়িত্বও তার ওপর। বর্তমানে ফারুক মিয়ার সংসারে স্ত্রী, ছেলে, ছেলের স্ত্রী, সুমী ও তার ছেলে—সব মিলিয়ে ছয়জনের বসবাস। কিন্তু সদস্য অনুযায়ী নেই পর্যাপ্ত থাকার ব্যবস্থা।
সংসারের আয় বাড়ানো এবং ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে কয়েক বছর আগে সেলাই মেশিনে কাপড় তৈরির কাজ শুরু করেন সুমী। এতে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় হয়। এই সামান্য আয় দিয়ে নিজের ও ছেলের খরচের পাশাপাশি সৌরভের পড়াশোনার ব্যয় চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আলাদা ঘর নির্মাণের কথা চিন্তা করার সুযোগও হয় না।
বাবার সামর্থ্য না থাকায় বাধ্য হয়ে বাবার ঘরেই ছেলেকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন সুমী। একদিকে ১৩ বছরের সংগ্রামের স্বীকৃতি, অন্যদিকে স্থায়ী আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা—এই দুই বাস্তবতার মাঝেই চলছে তার জীবন।
নিজের পাওয়া ক্রেস্ট ও সনদপত্র হাতে নিয়ে সুমী বেগম বলেন, ‘যার থাকার ঘর নাই, তার পুরস্কার দিয়া কী অইব। সেলাই মেশিন চালাইয়া যে টেহা পাই, তা দিয়ে পোলার খরচই চলে না। ওর বাপে ডিভোর্সের পর থাইকা আজ পর্যন্ত ছেলের লাইগা পাঁচ পয়সাও খরচ দেয় নাই। ১৩টা বছর ধরে কষ্ট করতাছি। পুলা বড় হইছে, আমার বুড়া বাপের ঘরে আর কতদিন থাকমু। সরকার থাইকা যদি একটা ঘর পাইতাম, খুবই উপকৃত হতাম।’
তবে সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া পুরস্কার ও সনদকে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন মনে করেন সুমী। তিনি বলেন, ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী পুরস্কারের এই ক্রেস্ট আর সনদ আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। এটাই আমার ১৩ বছরের জীবনসংগ্রামের স্বীকৃতি। কষ্টের দিনগুলোতে এই স্বীকৃতিই আমাকে নতুন করে সাহস জোগায়, ছেলের স্বপ্ন পূরণের লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।’
সুমীর জীবনসংগ্রামের কথা জানতে পেরে স্থানীয়দের মধ্যে সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা সুমী ও তার ছেলের জন্য সরকারি উদ্যোগে একটি স্থায়ী ঘর নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘অদম্য পুরস্কার পাওয়া নারীর ঘর না থাকার বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
১৩ বছরের নির্যাতন, একাকিত্ব ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে সুমী আজ ‘অদম্য নারী’। কিন্তু তার সেই অদম্যতার গল্প যেন পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন ক্রেস্ট-সনদের পাশাপাশি নিজের ও ছেলের জন্য মিলবে একটি নিরাপদ স্থায়ী ঠিকানা।