২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৪১

১৭৮ কোটি টাকার সেতু নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখে উধাও ঠিকাদার

১৭৮ কোটি টাকার সেতু নির্মাণ কাজ বন্ধ রেখে উধাও ঠিকাদার  © সংগৃহীত

‎কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামে মেঘনা নদীর উপর নির্মাণাধীন বাঙালপাড়া-চাতলপাড় এক কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এই সেতুর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের বড় একটি অংশ অসম্পূর্ণ রেখে উধাও হয়ে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে হাওর অঞ্চলের অবহেলিত বিপুল জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের দীর্ঘ দিনের আকাঙ্ক্ষা এখন সীমাহীন ভোগান্তি ও হতাশায় রুপ নিয়েছে। 

‎কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙালপাড়া ইউনিয়নের মেঘনা নদীর তীরে নোয়াগাঁও এলাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের দূর্গাপুর পর্যন্ত মেঘনা নদীর উপর এই সেতুটি নির্মিত হওয়ার কথা। হাওর অঞ্চলে বর্ষা ও শুষ্ক দুই রূপের কারনে সারাবছর সুগম যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন। এই সেতুটি বাস্তবায়িত হলে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ঢাকা, সিলেট এবং চট্টগ্রাম সহ সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জেলা গুলোর সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগর দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

‎স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০২২ সালের ১৫ অক্টোবর ১৭৭ কোটি ২৩ লাখ ৫১ হাজার ১০৮ টাকা ব্যয়ে অষ্টগ্রামের বাংগালপাড়া মেঘনা নদীর উপর নির্মিত ১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুর কাজ শুরু করে তমা কনস্ট্রাকশন নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই সেতুর কাজ সম্পন্ন হলে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের বাংগালপাড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের কয়েক গ্রামের মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রে তা হবে একটি মাইলফলক। 

‎জানা যায়, প্রকল্পের কাজ শুরুর দিকে তৎকালীন ইটনা মিঠামইন অষ্টগ্ৰামের সংসদ সদস্য ও তৎকালীন নাসিরনগর এলাকার সংসদ সদস্য প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কাজের উদ্বোধন করেন এবং দ্রুত কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। শুরুর দিকে দ্রুত গতিতে কাজ এগোলেও দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্নধার মানিক মিয়া আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর থেকেই স্থবিরতা নেমে আসে প্রকল্পটিতে এক পর্যায়ে কাজের অগ্ৰগতি থমকে যায়। এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের নিয়োজিত লোকজন তাদের সব যন্ত্রপাতি ও মালামাল গুটিয়ে রাতের আঁধারে গোপনে এলাকা ত্যাগ করেন। 

আজ ‎বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সরেজমিনে অষ্টগ্রামের বাঙ্গালপাড়ার নোয়াগাঁও এলাকা গিয়ে দেখা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোন লোকজন নেই৷ অধিকাংশ মালামালও নেই৷ বর্তমানে নদীর বুকে সেতুর কয়েকটি অসম্পূর্ণ পিলার দাঁড়িয়ে রয়েছে, যা হাওর বাসীর স্বপ্ন ভঙ্গের স্মারক হয়ে আছে। বর্তমানে বর্ষার সময় উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার কিংবা ছোট ছোট নৌকায় একমাত্র ভরসা।‌ শুকনো মৌসুমেও চরম দুর্ভোগ নিয়ে মেঘনা পাড়ি দিতে হয়, সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও সংকটাপন্ন রোগীদের। 

‎এ ব্যাপারে উপস্থিত একজন বীমাকর্মী প্রদীপ দাস জানান, সেতুটি নির্মাণ হলে হাওরের ব্যবসা বাণিজ্য, চিকিৎসা অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনে আশা ছিল। এই সেতু কেবল দুইটি জেলার সংযোগস্থল নয়, এটি পুরো হাওর বাসীর লালিত একটি স্বপ্ন। অপর স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী জানান, আমাদের এই সেতুটি নির্মাণ কাজ শেষ হলে যোগাযোগের ব্যবস্থার উন্নতি হবে। এলাকার উৎপাদিত কৃষিপণ্য সহজে সারাদেশে রপ্তানি করা যাবে। ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি পর্যটন খাতে ও অভাবানীয় পরিবর্তন আসবে।

‎অষ্টগ্রাম উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা শওকত হেসেন বলেন, "এই ব্রিজটি হওয়ার আগে আমরা যদি ঢাকা বা অন্য কোনো জেলায় যাইতে চাই তাহলে ৩ ঘণ্টার জায়গায় ৫ ঘণ্টায় যাইতে হইছে। আগে এখান থেকে বিশ্বরোড যাইতে ৩ ঘণ্টা লাগতো আর এখন ব্রিজটি হলে ৩০-৪০মিনিট সময় লাগবে। এতেকরে আমাদের অনেক সুবিধা হবে।"

‎ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক মানিক মিয়ার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।‌

‎এ ব্যাপারে অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক এ প্রতিনিধিকে জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন চুক্তিভঙ্গ করে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেছে । ঘটনাটি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বর্তমানে অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার জন্য নতুন করে দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দ্রুতই প্রশাসনিক সকল অনুমোদন সম্পন্ন করে পুনরায় সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ।

‎এদিকে হাওর অঞ্চলের সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগীরা টেন্ডার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে সেতু নির্মাণের কাজ চালু করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।