২৬ আগস্ট ২০২৬, ২২:২৭

২৭ লাখ টাকায় নির্মিত টয়লেট, ব্যবহার করা যায়নি এক দিনও

টিডিসি সম্পাদিত  © টিডিসি

খুলনা বিভাগের একমাত্র সরকারি ক্যানসার ইউনিটে চিকিৎসা নিতে প্রতিদিন শত শত রোগী ও স্বজনের সমাগম হলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় টয়লেট সুবিধা সীমিত। এর মধ্যেই প্রায় ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ভবনে পাঁচটি পুরুষ ও পাঁচটি নারী টয়লেট থাকলেও নির্মাণের পর থেকে এক দিনের জন্যও সেগুলো ব্যবহার করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকায় সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার ইউনিটের পেছনে নির্মিত একতলা ভবনটিতে আধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর (রেডিওথেরাপি) মেশিন স্থাপনের জন্য একটি বাঙ্কার বা সুরক্ষিত কক্ষের পাশাপাশি পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক পাঁচটি করে টয়লেট নির্মাণ করা হয়। তবে ভবনটি ব্যবহারের আগেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দেওয়ায় সেটি আর চালু করা হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের দেয়ালে লম্বালম্বি বড় বড় ফাটল রয়েছে। ছাদের বিভিন্ন স্থানেও চিড় দেখা গেছে। কোথাও কোথাও খসে পড়েছে প্লাস্টার। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনের চারপাশে জন্মেছে আগাছা। টয়লেটগুলোর দরজায় ঝুলছে তালা। ভেতরে কমোড, ওয়াশবেসিনসহ বিভিন্ন স্যানিটারি সরঞ্জাম স্থাপন করা হলেও দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় সেগুলোর অনেকটাই নষ্ট হওয়ার পথে। হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে টয়লেটের কল, বেসিনের কলসহ বেশ কিছু সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে।

হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভবনটির নির্মাণকাজ ২০১৭ সালের দিকে শুরু হয়। নির্মাণ শেষে ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল গণপূর্ত বিভাগ লিখিতভাবে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু এর পরপরই ভবনটির পাশেই নতুন বিভাগীয় ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও নির্মাণকাজের সময় পুরোনো ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেয়। পরে নিরাপত্তার কারণে ভবনটি ব্যবহার বন্ধ রাখা হয়।

ওয়ার্ডবয় আল আমিন শেখ খোকন বলেন, ‘ভবনটি নির্মাণ করা হলেও কখনো ব্যবহার করা হয়নি। নির্মাণের পর থেকেই এটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।’

সাকিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, নতুন ক্যানসার ইউনিটের ভবন নির্মাণের কারণে পুরোনো ভবনে ফাটল দেখা দেয়। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় রোগী বা হাসপাতালের কেউই এটি ব্যবহার করতে পারেননি।

মনিরুল ইসলাম বলেন, রোগীদের সুবিধার জন্যই টয়লেটগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু পাশের বড় ভবনের নির্মাণকাজের সময় ফাটল দেখা দেওয়ায় তা ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

ক্যানসার ইউনিটের প্রধান ডা. মো. মুকিতুল হুদা বলেন, ‘এখানে যে টয়লেট করা হয়েছিল, সেই টয়লেটের প্রায় সব কটি কল, বেসিনের কলসহ বিভিন্ন জিনিস চোরেরা চুরি করে নিয়ে গেছে।’

এদিকে টয়লেট সংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। রোগীর স্বজন ওলিয়ার রহমান বলেন, ‘এতগুলো নতুন টয়লেট তৈরি করা হয়েছে, অথচ আমরা ব্যবহার করতে পারি না। রোগীদের নিয়ে অনেক দূরে যেতে হয়। এটি খুবই দুর্ভোগের।’

রোগী শেখ শামছুল হাসান বলেন, চিকিৎসা নিতে এসে টয়লেট খুঁজে পাওয়া বড় সমস্যার একটি। চোখের সামনে একটি ভবন তালাবদ্ধ পড়ে থাকলেও সেটি ব্যবহার করতে না পারায় রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

প্রকৌশল সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো নতুন স্থাপনা নির্মাণের সময় পাশের ভবনে ফাটল দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে কারিগরি তদন্ত করা প্রয়োজন। নির্মাণ ত্রুটি, মাটির বৈশিষ্ট্য কিংবা ভারী নির্মাণকাজ—যেকোনো কারণেই ভবনে ফাটল সৃষ্টি হতে পারে। তাই ভবনটির বর্তমান অবস্থা নির্ধারণে প্রকৌশলগত মূল্যায়ন জরুরি।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো কাগজপত্র আমি আগের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও পাইনি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। কারণ, ঘটনাটি আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগের।’

গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে ভবনের বর্তমান অবস্থা নির্ণয় করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ক্যানসারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও সহজলভ্য টয়লেট কোনো বিলাসিতা নয়; এটি চিকিৎসাসেবারই একটি মৌলিক অংশ। অথচ রোগীদের প্রয়োজনের সময় ব্যবহারযোগ্য টয়লেট বন্ধ রেখে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনা নষ্ট হতে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি ভবন যদি ব্যবহারের আগেই অচল হয়ে পড়ে, তাহলে এর দায় নেবে কে? নির্মাণের পরপরই ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার প্রকৃত কারণ কী, কেন এত দিনেও কারিগরি তদন্ত হয়নি এবং সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি কেন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে—এসব প্রশ্নের জবাব চান তারা।

তাদের দাবি, দ্রুত কারিগরি তদন্তের মাধ্যমে ভবনটির বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ করে সম্ভব হলে এটি ব্যবহার উপযোগী করা হোক। আর নির্মাণে অনিয়ম, ত্রুটি কিংবা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক।